আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

কল্পনা কাব্যগ্রন্থের ‘পসারিনি’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কল্পনা’ (১৮৯০ / ১৯০০) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম একটি অপরূপ, স্নিগ্ধ ও ভাবুকতাচ্ছন্ন সৃষ্টি হলো ‘পসারিনি’। এই কবিতায় মধ্যদুপুরের তপ্ত ও ক্লান্তিভরা পথে পথচারিণী এক ফেরিওয়ালার (পসারিনীর) প্রতি কবির অপরিসীম সহমর্মিতা, আশ্রয় ও শান্তির সান্ত্বনা এবং প্রাত্যহিক জীবনের কোলাহল ছাড়িয়ে এক একান্ত আশ্রয় খুঁজে পাওয়ার আকুল আবেদন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামপসারিনি
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকল্পনা
প্রকাশের বছর১৮৯৯ (বা ১৯০০)
কবিতার ধরনরোমান্টিক লিরিক ও সহমর্মিতা মূলক কবিতা (Romantic Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যযাত্রার এক বিশেষ ও বর্ণাঢ্য পর্যায় হলো ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থটি, যেখানে ইতিহাস, নিসর্গ এবং রোমান্টিক অনুভূতির অপূর্ব এক মিশ্রণ দেখা যায়। ‘পসারিনি’ কবিতায় কবি এমন এক ক্লান্ত পসারিনীকে কল্পনা করেছেন, যিনি মাথার ওপর ভারী পসরা (পণ্য বা জিনিসপত্রের ভার) নিয়ে কোনো এক অজানা দূরের রাজপুরীতে বা হাটে বিক্রির উদ্দেশ্যে তপ্ত বালু ও রৌদ্রময় পথ বেয়ে চলেছেন। তাঁর এই দুরূহ ও ক্লান্ত পথচলা দেখে কবির কোমল মন ব্যথিত হয়ে ওঠে। কবি তাকে অনুরোধ করেন দীর্ঘ পথ আর না হেঁটে তাঁর এই ছায়াঘেরা গ্রামে, বটতলায় ও দিঘির ধারে একটু জিরিয়ে নিতে। বিকি-কিনি বা লাভ-লোকসানের হিসাব ভুলে তাকে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়ার, জল দিয়ে পা ধুয়ে নেওয়ার এবং শান্তিতে ঘুমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এই কবিতার মধ্য দিয়ে ক্লান্ত মানবাত্মার প্রতি কবির অন্তহীন প্রীতি ও শান্তির নিবিড় বার্তা প্রকাশিত হয়েছে।

পসারিনি কবিতা (সম্পূর্ণ)

       ওগো পসারিনী, দেখি আয়

         কী রয়েছে তব পসরায়।

এত ভার মরি মরি                 কেমনে রয়েছ ধরি

         কোমল করুণ ক্লান্তকায়!

কোথা কোন্‌ রাজপুরে            যাবে আরো কত দূরে

         কিসের দুরূহ দুরাশায়!

সম্মুখে দেখো তো চাহি         পথের যে সীমা নাহি,

         তপ্ত বালু অগ্নিবাণ হানে।

পসারিনী, কথা রাখো–           দূর পথে যেয়ো নাকো

         ক্ষণেক দাঁড়াও এইখানে।

         হেথা দেখো শাখা-ঢাকা বাঁধা বটতল–

         কূলে কূলে ভরা দিঘি, কাকচক্ষু জল।

ঢালু পাড়ি চারি পাশে            কচি কচি কাঁচা ঘাসে

         ঘনশ্যাম চিকনকোমল।

পাষাণের ঘাটখানি,                কেহ নাই জনপ্রাণী,

         আম্রবন নিবিড় শীতল।

থাক্‌ তব বিকি-কিনি–           ওগো শ্রান্ত পসারিনী,

         এইখানে বিছাও অঞ্চল।

         ব্যথিত চরণ দুটি ধুয়ে নিবে জলে,

         বনফুলে মালা গাঁথি পরি নিবে গলে।

আম্রমঞ্জরীর গন্ধ                   বহি আনি মৃদুমন্দ

         বায়ু তব উড়াবে অলক–

ঘুঘু-ডাকে ঝিল্লিরবে              কী মন্ত্র শ্রবণে কবে,

         মুদে যাবে চোখের পলক।

পসরা নামায়ে ভূমে                যদি ঢুলে পড় ঘুমে,

         অঙ্গে লাগে সুখালসঘোর–

যদি ভুলে তন্দ্রাভরে               ঘোমটা খসিয়া পড়ে,

         তাহে কোনো শঙ্কা নাহি তোর।

         যদি সন্ধ্যা হয়ে আসে, সূর্য যায় পাটে,

         পথ নাহি দেখা যায় জনশূন্য মাঠে–

নাই গেলে বহু দূরে,               বিদেশের রাজপুরে,

         নাই গেলে রতনের হাটে।

কিছু না করিয়ো ডর,             কাছে আছে মোর ঘর,

         পথ দেখাইয়া যাব আগে।

শশীহীন অন্ধ রাত,                ধরিয়ো আমার হাত

         যদি মনে বড়ো ভয় লাগে।

শয্যা শুভ্রফেননিভ                 স্বহস্তে পাতিয়া দিব,

         গৃহকোণে দীপ দিব জ্বালি–

দুগ্ধদোহনের রবে                  কোকিল জাগিবে যবে

         আপনি জাগায়ে দিব কালি।

                ওগো পসারিনী,

মধ্যদিনে রুদ্ধ ঘরে                 সবাই বিশ্রাম করে,

         দগ্ধ পথে উড়ে তপ্ত বালি–

দাঁড়াও, যেয়ো না আর,          নামাও পসরাভার,

         মোর হাতে দাও তব ডালি।

পসারিনি কবিতার Romanized Version:

Ogo posarini, dekhi ay
Ki royeche tobo posoray.
Eto bhar mori mori Kemene royecho dhori
Komol korun klantokay!
Kotha kon rajpure Jabe aro koto dure
Kiser duruho durashay!
Shummukhe dekho to chahi Poter je shima nahi,
Topto balu ognibane hane.
Posarini, kotha rakho– Dur pothe jeyo nako
Khonek darao ekhane.
Hetha dekho shakha-dhaka bandha bot-tol–
Kule kule vhora dighi, kakchokkhu jol.
Dhalu pari chari pashe Kochichi kacha ghase
Ghonyoshyam chikonkomol.
Pashaner ghatkhani, Keho nai jonprani,
Amrobon nibiro shitol.
Thak tobo biki-kini– Ogo shranto posarini,
Ekhane bichao onchol.
Byothito choron duiti dhuye nibe jole,
Bonfule mala ganthi pori nibe gole.
Amromonjorir gondho Bohi ani mridumondo
Bayu tobo urabe olok–
Ghugu-dake zhilliribe Ki montro shrobone kobe,
Mude jabe chokher polok.
Posora namaye vhume Jodi dhule poro ghume,
Onge lage shukhaloshghor–
Jodi vhule tondrabhore Ghomta khoshiya pore,
Tahe kono shongka nahi tor.
Jodi shondhya hoye ashe, shurjo jay pate,
Poth nahi dekha jay jonshunyo mathe–
Nai gele bohu dure, Bidesher rajpure,
Nai gele rotoner hate.
Kichu na koriyo dor, Kache ache mor ghor,
Poth dekhaiya jabo age.
Shoshihin ondho rat, Dhoriyo amar hat
Jodi mone boro voy lage.
Shojya shubhrofennibhi Shwohaste patiya dibo,
Grihokone dip dibo zhali–
Dugdhodohoner robe Kokil jagibe jobe
Apni jagaye dibo kali.
Ogo posarini,
Modhyodine ruddho ghore Shobai bishram kore,
Dogdho pothe ure topto bali–
Darao, jeyo na ar, Namao posorabhar,
Mor hate dao tobo dali.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • ক্লান্ত মানবাত্মার প্রতি সহমর্মিতা: মধ্যদুপুরের রৌদ্রোজ্জ্বল ও তপ্ত পথে জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত পসারিনির কষ্টের ছবি কবি গভীর সহানুভূতির সাথে দেখেছেন।
  • শান্তি ও নিসর্গের আশ্রয়: গ্রামীণ পরিবেশের ছায়া, শীতল বাতাস, দিঘির নির্মল জল এবং সহজ-সরল আশ্রয়ের মোহে জীবনের কঠোর ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পাওয়ার এক নান্দনিক আকুতি এই কবিতার মূল সুর।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কল্পনা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত