আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের ‘যৌবনবিদায়’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ (১৯০০) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত পিরণদায়ক, গভীর জীবনদর্শন ও হালকা চালের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বিষাদমাখা কবিতা হলো ‘যৌবনবিদায়’। এই কবিতায় জীবনের চল্লিশের কোঠায় পা দিয়ে যৌবনকে বিদায় জানানোর এক অপূর্ব ও কাব্যিক রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামযৌবনবিদায়
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থক্ষণিকা
প্রকাশের বছর১৯০০ (১৩৭ বঙ্গাব্দ / ১৩০৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআত্মকথন ও জীবনদর্শনমূলক গীতি-কবিতা (Reflective and Lyrical Poem)
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯০০ সালে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রথাগত গম্ভীর সুর থেকে কিছুটা বেরিয়ে এসে এক লঘু, চটুল অথচ প্রাজ্ঞ জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছেন। ‘ক্ষণিকা’ নামটি যেমন ক্ষণস্থায়ী জীবন ও যৌবনকে নির্দেশ করে, তেমনি ‘যৌবনবিদায়’ কবিতায় কবি চল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছে জীবনের একটি পর্যায় পার করার হিসাব-নিকাশ করছেন। যৌবনের সেই উদ্দাম দিনগুলো, ঢেউয়ের টলমলানি, কান্নাকাটি-হাসি আর ভোরের সুরে শুরু হওয়া পারাপার—সবকিছুকে পেছনে ফেলে তরীকে এবার অন্তাচলের দিকে ভাসিয়ে দেওয়ার এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
যৌবনবিদায় – সম্পূর্ণ কবিতা

 

 ওগো যৌবনতরী,

এবার বোঝাই সাঙ্গ করে দিলেম বিদায় করি।

     কতই খেয়া, কতই খেয়াল,

            কতই-না দাঁড়-বাওয়া–

     তোমার পালে লেগেছিল

            কত দখিন হাওয়া!

     কত ঢেউয়ের টল্‌মলানি

            কত স্রোতের টান–

     পূর্ণিমাতে সাগর হতে

            কত পাগল বান!

     এ পার হতে ও পার ছেয়ে

            ঘন মেঘের সারি,

     শ্রাবণ-দিনে ভরা গাঙে

            দু-কূল-হারা পাড়ি।

     অনেক খেলা, অনেক মেলা

            সকলি শেষ ক’রে

     চল্লিশেরই ঘাটের থেকে

            বিদায় দিনু তোরে।

            ওগো তরুণ তরী,

যৌবনেরই শেষ কটি গান দিনু বোঝাই করি।

     সে-সব দিনের কান্না হাসি,

            সত্য মিথ্যা ফাঁকি,

     নিঃশেষিয়ে যাস রে নিয়ে

            রাখিস নে আর বাকি।

     নোঙর দিয়ে বাঁধিস নে আর

            চাহিস নে আর পাছে–

     ফিরে ফিরে ঘুরিস নে আর

            ঘাটের কাছে কাছে।

     এখন হতে ভাঁটার স্রোতে

            ছিন্ন পালটি তুলে

     ভেসে যা রে স্বপ্ন-সমান

            অস্তাচলের কূলে।

     সেথায় সোনা-মেঘের ঘাটে

            নামিয়ে দিয়ো শেষে

     বহুদিনের বোঝা তোমার

             চিরনিদ্রার দেশে।

            ওরে আমার তরী,

পারে যাবার উঠল হাওয়া, ছোট্‌ রে ত্বরা করি।

     যেদিন খেয়া ধরেছিলেম

            ছায়াবটের ধারে,

     ভোরের সুরে ডেকেছিলেম

            “কে যাবি আয় পারে’।

     ভেবেছিলেম ঘাটে ঘাটে

            করতে আনাগোনা

     এমন চরণ পড়বে নায়ে

            নৌকো হবে সোনা।

     এতবারের পারাপারে,

            এত লোকের ভিড়ে,

     সোনা-করা দুটি চরণ

            দেয় নি পরশ কি রে?

     যদি চরণ পড়ে থাকে

            কোনো একটি বারে

     যা রে সোনার জন্ম নিয়ে

            সোনার মৃত্যু-পারে।

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version
Ogo jobontori,
Ebar bohai shanggo kore dilem biday kori.
Kotoi kheya, kotoi kheyal,
Kotoi-na dar-bawa–
Tomar pale legechhilo
Koto dokhin hawa!
Koto dheuer tolmolani
Koto sroter tan–
Purnimate shagor hote
Koto pagol ban!
E par hote o par cheye
Ghono megher shari,
Shrabon-dine bhora gange
Du-kul-hara pari.
Onek khela, onek mela
Shokoli shesh k’re
Chalisheroi ghater theke
Biday dinu tore.
Ogo torun tori,
Joboner-i shesh koti gan dinu bohai kori.
She-shob diner kanna hashi,
Sotto mithya phaki,
Nisheskiye jash re niye
Rakhis ne ar baki.
Nongor diye bandhis ne ar
Chahis ne ar pashe–
Phire phire ghuris ne ar
Ghater kachhe kachhe.
Ekhon hote bhatar srote
Chhinno paltuli tule
Bhese ja re shopno-shoman
Ostocholer kule.
Sethay shona-megher ghate
Namiye diyo sheshe
Bohudiner bojha tomar
Chironidrar deshe.
Ore amar tori,
Pare jabar uthlo hawa, chhot re twora kori.
Jedin kheya dhorechhilem
Chhayaboter dhare,
Vorer shure dekechhilem
“Ke jabi ay pare’.
Bhebechhilem ghate ghate
Korte anagona
Emon choron porbe naye
Nouko hobe shona.
Etabarer parapare,
Eto loker bhire,
Shona-kora duti choron
Dey ni porosh ki re?
Jodi choron pore thake
Kono ekti bare
Ja re shonar jonmo niye
Shonar mrittu-pare.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
  • যৌবনের তরী বিদায়:
    “ওগো যৌবনতরী, / এবার বোঝাই সাঙ্গ করে দিলেম বিদায় করি।”
    — যৌবনের উচ্ছ্বাস, দখিন বাতাস, ঢেউয়ের টলমলানি আর শ্রাবণের ভরা গাঙে পাড়ি জমানোর দিনগুলো পার হয়ে কবি এখন জীবনের চল্লিশের কোঠায় এসে উপনীত হয়েছেন। জীবনের সেই উদ্যম ও রোমাঞ্চকর সময়টিকে তিনি একটি তরীর সাথে তুলনা করে সশ্রদ্ধ বিদায় জানাচ্ছেন।
  • হিসাব-নিকাশ ও স্মৃতির বোঝা:
    “সে-সব দিনের কান্না হাসি, / সত্য মিথ্যা ফাঁকি, / নিঃশেষিয়ে যাস রে নিয়ে / রাখিস নে আর বাকি।”
    — যৌবনের সমস্ত আনন্দ-বেদনা, ভুলত্রুটি, সত্য-মিথ্যা এবং স্মৃতির বোঝাকে এই তরীতে বোঝাই করে কবি তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে নিষেধ করছেন। ঘিনিয়ে আসা ভাঁটার স্রোতে ছিন্ন পাল তুলে তরী যেন জীবনের অস্তাচলের দিকে ভেসে যায়।
  • জীবনের সার্থকতা ও চরম প্রাপ্তির আশা:
    “ভেবেছিলেম ঘাটে ঘাটে / করতে আনাগোনা / এমন চরণ পড়বে নায়ে / নৌকো হবে সোনা।”
    — জীবনের শুরুতে কবি ভেবেছিলেন তাঁর এই পারাপারের নৌকোয় হয়তো এমন কারও চরণ পড়বে যা তাঁর তরীকে সোনায় পরিণত করবে। জীবনের অন্তিম যাত্রায় এসে তাঁর এই বিশ্বাস যে, এই দীর্ঘ পারাপারের ভিড়ে কোনো না কোনো এক ক্ষণে সেই মহামূল্যবান স্পর্শ ঠিকই লেগেছে। আর যদি সেই চরণ পড়ে থাকে, তবে এই সাধারণ তরী ও জীবনও সোনার জন্ম নিয়ে সোনার মৃত্যু-পারে অর্থাৎ পরম মুক্তির ঠিকানায় পৌঁছে যাবে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী কোনো অংশ বাদ না দিয়ে সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত