বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ (১৯০০) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত পিরণদায়ক, গভীর জীবনদর্শন ও হালকা চালের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বিষাদমাখা কবিতা হলো ‘যৌবনবিদায়’। এই কবিতায় জীবনের চল্লিশের কোঠায় পা দিয়ে যৌবনকে বিদায় জানানোর এক অপূর্ব ও কাব্যিক রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | যৌবনবিদায় |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ক্ষণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯০০ (১৩৭ বঙ্গাব্দ / ১৩০৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আত্মকথন ও জীবনদর্শনমূলক গীতি-কবিতা (Reflective and Lyrical Poem) |
ওগো যৌবনতরী,
এবার বোঝাই সাঙ্গ করে দিলেম বিদায় করি।
কতই খেয়া, কতই খেয়াল,
কতই-না দাঁড়-বাওয়া–
তোমার পালে লেগেছিল
কত দখিন হাওয়া!
কত ঢেউয়ের টল্মলানি
কত স্রোতের টান–
পূর্ণিমাতে সাগর হতে
কত পাগল বান!
এ পার হতে ও পার ছেয়ে
ঘন মেঘের সারি,
শ্রাবণ-দিনে ভরা গাঙে
দু-কূল-হারা পাড়ি।
অনেক খেলা, অনেক মেলা
সকলি শেষ ক’রে
চল্লিশেরই ঘাটের থেকে
বিদায় দিনু তোরে।
ওগো তরুণ তরী,
যৌবনেরই শেষ কটি গান দিনু বোঝাই করি।
সে-সব দিনের কান্না হাসি,
সত্য মিথ্যা ফাঁকি,
নিঃশেষিয়ে যাস রে নিয়ে
রাখিস নে আর বাকি।
নোঙর দিয়ে বাঁধিস নে আর
চাহিস নে আর পাছে–
ফিরে ফিরে ঘুরিস নে আর
ঘাটের কাছে কাছে।
এখন হতে ভাঁটার স্রোতে
ছিন্ন পালটি তুলে
ভেসে যা রে স্বপ্ন-সমান
অস্তাচলের কূলে।
সেথায় সোনা-মেঘের ঘাটে
নামিয়ে দিয়ো শেষে
বহুদিনের বোঝা তোমার
চিরনিদ্রার দেশে।
ওরে আমার তরী,
পারে যাবার উঠল হাওয়া, ছোট্ রে ত্বরা করি।
যেদিন খেয়া ধরেছিলেম
ছায়াবটের ধারে,
ভোরের সুরে ডেকেছিলেম
“কে যাবি আয় পারে’।
ভেবেছিলেম ঘাটে ঘাটে
করতে আনাগোনা
এমন চরণ পড়বে নায়ে
নৌকো হবে সোনা।
এতবারের পারাপারে,
এত লোকের ভিড়ে,
সোনা-করা দুটি চরণ
দেয় নি পরশ কি রে?
যদি চরণ পড়ে থাকে
কোনো একটি বারে
যা রে সোনার জন্ম নিয়ে
সোনার মৃত্যু-পারে।

- যৌবনের তরী বিদায়:“ওগো যৌবনতরী, / এবার বোঝাই সাঙ্গ করে দিলেম বিদায় করি।”— যৌবনের উচ্ছ্বাস, দখিন বাতাস, ঢেউয়ের টলমলানি আর শ্রাবণের ভরা গাঙে পাড়ি জমানোর দিনগুলো পার হয়ে কবি এখন জীবনের চল্লিশের কোঠায় এসে উপনীত হয়েছেন। জীবনের সেই উদ্যম ও রোমাঞ্চকর সময়টিকে তিনি একটি তরীর সাথে তুলনা করে সশ্রদ্ধ বিদায় জানাচ্ছেন।
- হিসাব-নিকাশ ও স্মৃতির বোঝা:“সে-সব দিনের কান্না হাসি, / সত্য মিথ্যা ফাঁকি, / নিঃশেষিয়ে যাস রে নিয়ে / রাখিস নে আর বাকি।”— যৌবনের সমস্ত আনন্দ-বেদনা, ভুলত্রুটি, সত্য-মিথ্যা এবং স্মৃতির বোঝাকে এই তরীতে বোঝাই করে কবি তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে নিষেধ করছেন। ঘিনিয়ে আসা ভাঁটার স্রোতে ছিন্ন পাল তুলে তরী যেন জীবনের অস্তাচলের দিকে ভেসে যায়।
- জীবনের সার্থকতা ও চরম প্রাপ্তির আশা:“ভেবেছিলেম ঘাটে ঘাটে / করতে আনাগোনা / এমন চরণ পড়বে নায়ে / নৌকো হবে সোনা।”— জীবনের শুরুতে কবি ভেবেছিলেন তাঁর এই পারাপারের নৌকোয় হয়তো এমন কারও চরণ পড়বে যা তাঁর তরীকে সোনায় পরিণত করবে। জীবনের অন্তিম যাত্রায় এসে তাঁর এই বিশ্বাস যে, এই দীর্ঘ পারাপারের ভিড়ে কোনো না কোনো এক ক্ষণে সেই মহামূল্যবান স্পর্শ ঠিকই লেগেছে। আর যদি সেই চরণ পড়ে থাকে, তবে এই সাধারণ তরী ও জীবনও সোনার জন্ম নিয়ে সোনার মৃত্যু-পারে অর্থাৎ পরম মুক্তির ঠিকানায় পৌঁছে যাবে।





![উদাসীন udasin [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 2 উদাসীন udasin [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/উদাসীন-udasin-কবিতা--1024x536.gif)
![সেদিন আমাদের ছিল খোলা সভা sedin amader chhilo khola sobha [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 3 সেদিন আমাদের ছিল খোলা সভা sedin amader chhilo khola sobha [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/সেদিন-আমাদের-ছিল-খোলা-সভা-sedin-amader-chhilo-khola-sobha-কবিতা--1024x536.gif)


![প্রকৃতি পর্ব ১৬ – মধ্যদিনে যবে গান [ Madhyadine Jobe Gan Gaan ] প্রকৃতি পর্ব ১৬ - মধ্যদিনে যবে গান [ Madhyadine Jobe Gan Gaan ]](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/মধ্যদিনে-যবে-গান-1024x576.gif)
