আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছড়ার বই ‘খাপছাড়া’ কাব্যগ্রন্থের অসাধারণ একটি মুখবন্ধ বা সূচনা কবিতা হলো এই ‘উৎসর্গ’। সাধারণত মানুষ রবীন্দ্রনাথকে চেনে একজন গম্ভীর, মহাজ্ঞানী এবং বিশ্বকবি হিসেবে। কিন্তু এই কবিতায় তিনি নিজের সেই গুরুগম্ভীর খোলসটা ভেঙে একদম হালকা-চাল চালের এক অন্য রূপ নিয়ে হাজির হয়েছেন। এখানে তিনি রসিকতা করে মনের এক মস্ত বড় সত্য তুলে ধরেছেন যে—কঠিন বা গুরুগম্ভীর বিষয় লেখা যতটা সহজ, একদম সহজ-সরল বা খাপছাড়া ছড়া লেখা কিন্তু মোটেও ততটা সহজ নয়।

আমরা প্রায়ই শুনি, কবিগুরু এক বিখ্যাত লাইনে লিখেছেন—”সহজ কথায় লিখতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না লেখা সহজে।” এই কবিতাতেই রয়েছে সেই অমোঘ সত্যটি। রবীন্দ্রনাথ এখানে তাঁর সমালোচকদের এক হাত নিয়েছেন। যারা মনে করেন একজন প্রবীণ মানুষের মুখ থেকে সবসময় কেবল গভীর বেদান্ত বা জীবনদর্শনই বের হওয়া উচিত, তাদের কবি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে মানুষের মনে যেমন বুদ্ধি ও দর্শনের দরকার আছে, ঠিক তেমনি জীবনে একটু পাগলামি, হো-হো করে হাসা আর ছেলেমানুষিরও সমান প্রয়োজন।

সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার বা বিধাতার চারটি মুখের চমৎকার উদাহরণ দিয়ে কবি বলেছেন, একটা মুখে যদি দর্শন থাকে, অন্য মুখে যদি বেদ বা ধর্ম থাকে এবং আরেক মুখে যদি সুন্দর রসালো কবিতা থাকে—তবে নিশ্চিতভাবেই চতুর্থ মুখটি রাখা হয়েছে সমস্ত নিয়মকানুনের বেড়া ভেঙে প্রাণখুলে একটু হাসাহাসি আর পাগলামি করার জন্য।

এই ‘উৎসর্গ’ কবিতাটি আমাদের খুব সুন্দর করে মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন মানেই সবসময় গম্ভীর হয়ে থাকা নয়। সব কথার যে গভীর অর্থ থাকতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। মাঝে মাঝে অর্থহীন ‘বাজে কথা’, অদ্ভুত কল্পনা আর অনাসৃষ্টির ভেতরেও লুকিয়ে থাকে আনন্দের এক পঙ্কিলতাহীন আনন্দ। তাই নিজের বয়সের বা সমাজের খোলস ছেড়ে মাঝে মাঝে একটু খ্যাপামি আর ছেলেমানুষিতে মেতে ওঠার মাঝেই জীবনের আসল ভারসাম্য লুকিয়ে থাকে।

উৎসর্গ কবিতা (Utsargo Kobita) – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ

সহজ কথায় লিখতে আমায় কহ যে,

     সহজ কথা যায় না লেখা সহজে।

লেখার কথা মাথায় যদি জোটে

     তখন আমি লিখতে পারি হয়তো।

কঠিন লেখা নয়কো কঠিন মোটে,

     যা-তা লেখা তেমন সহজ নয় তো।

যদি দেখ খোলসটা

                   খসিয়াছে বৃদ্ধের,

         যদি দেখ চপলতা

        প্রলাপেতে সফলতা

   ফলেছে জীবনে সেই ছেলেমিতে-সিদ্ধের,

যদি ধরা পড়ে সে যে নয় ঐকান্তিক

                        ঘোর বৈদান্তিক,

    দেখ গম্ভীরতায় নয় অতলান্তিক,

       যদি দেখ কথা তার

          কোনো মানে-মোদ্দার

     হয়তো ধারে না ধার, মাথা উদ্‌ভ্রান্তিক,

          মনখানা পৌঁছয় খ্যাপামির প্রান্তিক,

            তবে তার শিক্ষার

            দাও যদি ধিক্কার–

               সুধাব, বিধির মুখ চারিটা কী কারণে।

            একটাতে দর্শন

            করে বাণী বর্ষণ,

               একটা ধ্বনিত হয় বেদ-উচ্চারণে।

            একটাতে কবিতা

            রসে হয় দ্রবিতা,

               কাজে লাগে মনটারে উচাটনে মারণে।

            নিশ্চিত জেনো তবে,

            একটাতে হো হো রবে

               পাগলামি বেড়া ভেঙে উঠে উচ্ছ্বাসিয়া।

       তাই তারি ধাক্কায়

       বাজে কথা পাক খায়,

            আওড় পাকাতে থাকে মগজেতে আসিয়া।

     চতুর্মুখের চেলা কবিটিরে বলিলে

     তোমরা যতই হাস, রবে সেটা দলিলে।

            দেখাবে সৃষ্টি নিয়ে খেলে বটে কল্পনা,

            অনাসৃষ্টিতে তবু ঝোঁকটাও অল্প না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Amar Rabindranath Logo

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত