আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থের ‘সন্ধেবেলায় বন্ধুঘরে’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খাপছাড়া’ (১৯৩৭) কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম হাস্যরসাত্মক, উদ্ভট ও শ্লেষাত্মক কবিতা হলো ‘সন্ধেবেলায় বন্ধুঘরে’। এই কবিতায় সান্ধ্য আড্ডার পর এক মাতাল বা খামখেয়ালী চরিত্রের মানুষের উদ্ভট সাজসজ্জা এবং তার তথাকথিত বিপ্লবী বা অসংলগ্ন দর্শনের প্রচার অত্যন্ত লঘু ও কৌতুকপূর্ণ ছন্দে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামসন্ধেবেলায় বন্ধুঘরে (খাপছাড়া)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থখাপছাড়া
প্রকাশের বছর১৯৩৭ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনব্যঙ্গাত্মক ছড়া-কবিতা / লঘু কৌতুকরস ও সামাজিক শ্লেষ (Satirical Limerick / Humorous Wit)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৭ সালে প্রকাশিত ‘খাপছাড়া’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথ সমাজের নানা খামখেয়ালি চরিত্র ও তাদের অদ্ভুত আচরণগুলোকে ছন্দের জাদুতে জীবন্ত করে তুলেছেন। ‘সন্ধেবেলায় বন্ধুঘরে’ কবিতায় গোপেন্দ্র মুস্তুফি নামের এক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যিনি সন্ধের সময় বন্ধুর বাড়িতে চুপিসারে আড্ডা দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু আড্ডা শেষে রাতে যখন তিনি বাড়ি ফিরলেন, তখন তাঁর অদ্ভুত কাণ্ড দেখে সবাই অবাক! মাতলামি বা খামখেয়ালিপনায় তিনি মাথার পাগড়িতে পরেছেন জুতোজোড়া আর পায়ে গলিয়েছেন রঙিন টুপি। আর সেই অবস্থাতেই তিনি সবাইকে উপদেশ দিতে শুরু করেছেন যে সব কিছু এলোমেলো করা চাই, কারণ মাথা ও পায়ের মধ্যে কোনো ভেদ রাখা উচিত নয়—মানুষের এই অন্ধ ও উদ্ভট তত্ত্ববাজির রূপটি এখানে দারুণভাবে বিদ্রূপ করা হয়েছে।

সন্ধেবেলায় বন্ধুঘরে কবিতা (সম্পূর্ণ)

সন্ধেবেলায়-বন্ধুঘরে

     জুটল চুপিচুপি

       গোপেন্দ্র মুস্তুফি।

রাত্রে যখন ফিরল ঘরে

সবাই দেখে তারিফ করে–

পাগড়িতে তার জুতোজোড়া,

       পায়ে রঙিন টুপি।

এই উপদেশ দিতে এল–

সব করা চাই এলোমেলো,

“মাথায় পায়ে রাখব না ভেদ’

       চেঁচিয়ে বলে গুপি।

সন্ধেবেলায় বন্ধুঘরে কবিতার Romanized Version:

Shondhebelay-bondhughore
Jutlo chupichupi
Gopendra mustufi.
Ratre jokhon phirlo ghore
Shobai dekhe tarif kore–
Pagarite tar juto-jora,
Paye rongin tupi.
Ei upodesh dite elo–
Shob kora chai elomelo,
“Mathay paye rakhbo na bhed’
Chechiye bole gupi.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

গোপেন্দ্র মুস্তুফির সান্ধ্য আড্ডা ও প্রত্যাবর্তন:
“সন্ধেবেলায়-বন্ধুঘরে / জুটল চুপিচুপি / গোপেন্দ্র মুস্তুফি। / রাত্রে যখন ফিরল ঘরে / সবাই দেখে তারিফ করে–“
— গোপেন্দ্র মুস্তুফি নামের এক ব্যক্তি সন্ধের সময় চুপিচুপি বন্ধুর বাড়ি আড্ডায় গিয়েছিলেন। রাতে যখন তিনি বাড়ি ফিরলেন, তাঁর কাণ্ডকারখানা দেখে চারপাশের মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
বিপরীত সাজসজ্জার উদ্ভট দৃশ্য:
“পাগড়িতে তার জুতোজোড়া, / পায়ে রঙিন টুপি।”
— অতিরিক্ত আনন্দ বা খামখেয়ালিপনায় তিনি নিজের সাজপোশাক পুরোটাই উলটপালট করে ফেলেছেন। মাথার পাগড়ির বদলে মাথায় উঠেছে জুতোজোড়া, আর পায়ে পরেছেন রঙিন টুপি—যা এক চরম হাস্যকর দৃশ্যের অবতারণা করে।
এলোমেলো তত্ত্ব ও সাম্যের বিকৃত রূপ:
“এই উপদেশ দিতে এল– / সব করা চাই এলোমেলো, / ‘মাথায় পায়ে রাখব না ভেদ’ / চেঁচিয়ে বলে গুপি।”
— নিজের এই বিকারগ্রস্ত ও উলটো পালটা অবস্থাকেই তিনি আবার এক বড় ‘দর্শন’ বা উপদেশ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করলেন। তাঁর দাবি—সবকিছুই এলোমেলো করা উচিত এবং মাথা ও পায়ের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ রাখা চলবে না! গুপি বা গোপেন্দ্রর এই অজ্ঞতা ও অযৌক্তিক তত্ত্বের প্রচারকে কবি অত্যন্ত শ্লেষের সুরে ফুটিয়ে তুলেছেন।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, প্রাবন্ধিক, চিত্রকর, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় পরিচিত।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়। তাঁর ৯৫টি ছোটগল্প *গল্পগুচ্ছ* এবং ১,৯১৫টি গান *গীতবিতান* সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলি ৩২ খণ্ডে *রবীন্দ্র রচনাবলী* নামে সংকলিত হয়েছে। তাঁর পত্রসাহিত্যও *চিঠিপত্র* নামে ১৯ খণ্ডে এবং চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি চিত্রকলাতেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন; তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে *গীতাঞ্জলি* কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

https://amarrabindranath.com/

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত