খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থের আয়না দেখেই চমকে বলে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কৌতুক ও অদ্ভুত রসের ছড়ার সংকলন ‘খাপছাড়া’-র একটি সংহত, শ্লেষাত্মক ও মনোস্তাত্ত্বিক ব্যঙ্গ-কবিতা হলো ‘আয়না দেখেই চমকে বলে’। বার্ধক্যে অহেতুক মৃত্যুভীতি, মানুষের কাল্পনিক রোগচিন্তা এবং তাকে পুঁজি করে চিকিৎসকদের অর্থশোষণকে কবি মাত্র আট চরণের লঘু চালে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ কৌতুকের সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামআয়না দেখেই চমকে বলে (খাপছাড়া ২২ সংখ্যক ছড়া)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থখাপছাড়া
প্রকাশের বছর১৯৩৭ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনব্যঙ্গাত্মক ছড়া-কবিতা / মনস্তাত্ত্বিক কৌতুক (Satirical Limerick / Psychological Wit)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৭ সালে প্রকাশিত ‘খাপছাড়া’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মানুষের অবচেতন মনের অযৌক্তিক ভীতি ও সমাজের বহুমাত্রিক অসঙ্গতিকে ছড়ার ছন্দে বিদ্ধ করেছেন। বহু মানুষ বার্ধক্যের স্বাভাবিক লক্ষণ দেখেই অকারণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং নিজেকে কঠিন ব্যাধিগ্রস্ত ভেবে মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকে। এ কবিতায় এক বৃদ্ধ আয়নায় নিজের ফ্যাকাশে মুখ দেখেই ধরে নেয় তার আয়ু শেষ। এই মানসিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চিকিৎসকেরা ওষুধ ও জোলাপের নামে দেদার অর্থ লুটে নেয়। অবশেষে যখন সেই ব্যক্তি মারা যায়, তখন তার বয়স গিয়ে ঠেকেছে একাশিতে—অর্থাৎ অকালমৃত্যুর ভয়ে সারাজীবন কাঁপা মানুষটি প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘ পরমায়ুই ভোগ করেছিল। এই বৈপরীত্যই কবিতাটির মূল রস।

আয়না দেখেই চমকে বলে কবিতা

আয়না দেখেই-চমকে বলে,

     “মুখ যে দেখি ফ্যাকাশে,

বেশিদিন আর বাঁচব না তো–‘

     ভাবছে বসে একা সে।

ডাক্তারেরা লুটল কড়ি,

খাওয়ায় জোলাপ, খাওয়ায় বড়ি,

     অবশেষে বাঁচল না সেই

       বয়স যখন একাশি।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Ayna dekhei chomke bole,
“Mukh je dekhi phyakashe,
Beshidin ar banchbo na to–‘
Bhabchhe boshe eka she.
Daktarera lutlo kori,
Khaway jolap, khaway bori,
Obosheshe banchlo na shei
Boyosh jokhon ekashi.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • অহেতুক আত্মভীতি ও হাইপোকন্ড্রিয়া:
    “আয়না দেখেই চমকে বলে, / ‘মুখ যে দেখি ফ্যাকাশে, / বেশিদিন আর বাঁচব না তো–‘ / ভাবছে বসে একা সে।”
    — আয়নায় নিজের স্বাভাবিক বার্ধক্যের রূপ দেখেই ব্যক্তিটি আতঙ্কে মুষড়ে পড়ে। বাস্তব কোনো শারীরিক অসুস্থতার চেয়ে মনের কাল্পনিক ভয় কীভাবে মানুষকে একাকী ও বিষাদগ্রস্ত করে তোলে, এখানে তা স্পষ্ট।
  • চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ ও শোষণ:
    “ডাক্তারেরা লুটল কড়ি, / খাওয়ায় জোলাপ, খাওয়ায় বড়ি,”
    — রোগীর কাল্পনিক অসুস্থতাকে ভরসা করে অর্থলোভী চিকিৎসকেরা অনর্থক ওষুধ ও পথ্যের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে পকেট ভরতে থাকে। চিকিৎসকদের এই নীতিহীন ব্যবসার ওপর কবি এখানে এক চাবুক হেনেছেন।
  • কালো কৌতুক ও মোক্ষম সমাপ্তি:
    “অবশেষে বাঁচল না সেই / বয়স যখন একাশি।”
    — ছড়াটির শেষ দুই চরণে চরম ‘পাঞ্চলাইন’ বা চমক সৃষ্টি হয়েছে। যে ব্যক্তি জীবনের শুরুতে বা মাঝপথে মুখ ফ্যাকাশে দেখে অকালমৃত্যুর ভয়ে সারা জীবন চিকিৎসকদের পেছনে টাকা ঢালল, সে শেষ পর্যন্ত একাশি বছর বয়সে স্বাভাবিক বার্ধক্যেই মারা গেল। মানুষের অনর্থক উদ্বেগ ও জীবনের বাস্তবতার এই বিরোধে কবিতাটি অনন্য ব্যঙ্গরসে রূপ নিয়েছে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংকলন ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন