বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কথা ও কাহিনী’ (এবং ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থেও সংকলিত) সংকলনের অন্যতম একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক, সমাজবাস্তবতা ও শিল্প-দর্শনভিত্তিক দীর্ঘ কাব্যকাহিনি হলো ‘গানভঙ্গ’। এই কবিতায় সঙ্গীত ও শিল্পকলার ক্ষেত্রে প্রজন্মগত রুচিভেদ, গতানুগতিকতার মোহ এবং শিল্পী ও শ্রোতার আত্মিক সম্পর্কের ভাঙন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | গানভঙ্গ (Gaanbhanga) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | কথা ও কাহিনী (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থেও প্রকাশিত) |
| কবিতার ধরন | আখ্যানধর্মী ও দার্শনিক লিরিক কবিতা (Narrative / Philosophical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কথা ও কাহিনী’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যে কাহিনিনির্ভর কবিতার এক অতুলনীয় সংকলন, যেখানে ইতিহাস ও অনুভূতির মেলবন্ধন ঘটেছে। ‘গানভঙ্গ’ কবিতায় প্রাচীন ও নবীনের রুচির সংঘাতকে চিত্রিত করা হয়েছে। সভার নবীন যুবা কাশীনাথের গায়কী অত্যন্ত চটজলদি ও বিজুলির মতো ঝিকিমিকে হলেও, বুড়ো রাজা প্রতাপ রায় ও তাঁর আজীবন সঙ্গী বৃদ্ধ গায়ক বরজলালের কাছে তা স্রেফ “শিকারী বিড়ালের খেলা” বলে মনে হয়। প্রতাপ রায়ের অনুরোধে বরজলাল যখন ইমনকল্যাণ সুরে গান ধরতে যান, তখন বর্তমান আধুনিক ও ব্যস্ত সভার লোকজনের কাছে তা চরম অবহেলা ও উপহাসের পাত্র হয়ে ওঠে। বুড়ো বরজলালের গান ভিড়ের কোলাহলে হারিয়ে যায়, তিনি কথা ও সুর ভুলে যান এবং সভার করুণ ভাঙন ঘটে। কবিতাটির শেষ অংশে বরজলালের সেই বিখ্যাত উক্তি ধ্বনিত হয়—”একাকী গায়কের নহে তো গান, মিলিতে হবে দুই জনে / গাহিবে একজন খুলিয়া গলা, আরেক জন গাবে মনে।” যেখানে প্রেম বা প্রকৃত শ্রোতা নেই, সে বোবার সভায় গান জাগতে পারে না।
গানভঙ্গ কবিতা (সম্পূর্ণ)
গাহিছে কাশীনাথ নবীন যুবা, ধ্বনিতে সভাগৃহ ঢাকি,
কণ্ঠে খেলিতেছে সাতটি সুর সাতটি যেন পোষা পাখি।
শানিত তরবারি গলাটি যেন নাচিয়া ফিরে দশ দিকে–
কখন কোথা যায় না পাই দিশা, বিজুলি-হেন ঝিকিমিকে।
আপনি গড়ি তোলে বিপদজাল, আপনি কাটি দেয় তাহা–
সভার লোকে শুনে অবাক মানে, সঘনে বলে “বাহা বাহা’।
কেবল বুড়া রাজা প্রতাপ রায় কাঠের মতো বসি আছে,
বরজলাল ছাড়া কাহারো গান ভালো না লাগে তার কাছে।
বালকবেলা হতে তাহারি গীতে দিল সে এতকাল যাপি–
বাদল-দিনে কত মেঘের গান, হোলির দিনে কত কাফি।
গেয়েছে আগমনী শরৎপ্রাতে, গেয়েছে বিজয়ার গান–
হৃদয় উছসিয়া অশ্রুজলে ভাসিয়া গিয়াছে দুনয়ান।
যখনি মিলিয়াছে বন্ধুজনে সভার গৃহ গেছে পূরে,
গেয়েছে গোকুলের গোয়াল-গাথা ভূপালি মূলতানি সুরে।
ঘরেতে বারবার এসেছে কত বিবাহ-উৎসবরাতি,
পরেছে দাসদাসী লোহিত বাস, জ্বলেছে শত শত বাতি–
বসেছে নব বর সলাজ মুখে পরিয়া মণি-আভরণ,
করিছে পরিহাস কানের কাছে সমবয়সী প্রিয়জন,
সামনে বসি তার বরজলাল ধরেছে শাহানার সুর–
সে-সব দিন আর সে-সব গান হৃদয়ে আছে পরিপূর।
সে ছাড়া কারো গান শুনিলেই তাই মর্মে গিয়ে নাহি লাগে,
অতীত প্রাণ যেন মন্ত্রবলে নিমেষে প্রাণে নাহি জাগে।
প্রতাপ রায় তাই দেখিছে শুধু কাশীর বৃথা মাথা নাড়া
সুরের পরে সুর ফিরিয়া যায়, হৃদয়ে নাহি পায় সাড়া।
থামিল গান যবে, ক্ষণেক-তরে বিরাম মাগে কাশীনাথ–
বরজলাল-পানে প্রতাপ রায় হাসিয়া করে আঁখিপাত।
কানের কাছে তার রাখিয়া মুখ কহিল, “ওস্তাদজি,
গানের মতো গান শুনায়ে দাও, এরে কি গান বলে! ছি!
এ যেন পাখি লয়ে বিবিধ ছলে শিকারী বিড়ালের খেলা।
সেকালে গান ছিল, একালে হায় গানের বড়ো অবহেলা।’
বরজলাল বুড়া শুক্লকেশ, শুভ্র উষ্ণীষ শিরে,
বিনতি করি সবে সভার মাঝে আসন নিল ধীরে ধীরে।
শিরা-বাহির-করা শীর্ণ করে তুলিয়া নিল তানপুর,
ধরিল নতশিরে নয়ন মুদি ইমনকল্যাণ সুর।
কাঁপিয়া ক্ষীণ স্বর মরিয়া যায় বৃহৎ সভাগৃহকোণে,
ক্ষুদ্র পাখি যথা ঝড়ের মাঝে উড়িতে নারে প্রাণপণে।
বসিয়া বাম পাশে প্রতাপ রায় দিতেছে শত উৎসাহ–
“আহাহা, বাহা বাহা!’ কহিছে কানে, “গলা ছাড়িয়া গান গাহ।’
সভার লোকে সবে অন্যমনা–কেহ বা কানাকানি করে,
কেহ বা তোলে হাই, কেহ বা ঢোলে, কেহ বা চলে যায় ঘরে।
“ওরে রে আয় লয়ে তামাকু পান’ ভৃত্যে ডাকি কেহ কয়।
সঘনে পাখা নাড়ি কেহ বা বলে, “গরম আজি অতিশয়।’
করিছে আনাগোনা ব্যস্ত লোক, ক্ষণেক নাহি রহে চুপ।
নীরব ছিল সভা, ক্রমশ সেথা শব্দ ওঠে শতরূপ।
বুড়ার গান তাহে ডুবিয়া যায়, তুফান-মাঝে ক্ষীণ তরী–
কেবল দেখা যায় তানপুরায় আঙুল কাঁপে থরথরি।
হৃদয়ে যেথা হতে গানের সুর উছসি উঠে নিজসুখে
হেলার কলরব শিলার মতো চাপে সে উৎসের মুখে।
কোথায় গান আর কোথায় প্রাণ দু দিকে ধায় দুই জনে,
তবুও রাখিবারে প্রভুর মান বরজ গায় প্রাণপণে।
গানের এক পদ মনের ভ্রমে হারায়ে গেল কী করিয়া–
আবার তাড়াতাড়ি ফিরিয়া গাহে, লইতে চাহে শুধরিয়া।
আবার ভুলে যায় পড়ে না মনে, শরমে মস্তক নাড়ি
আবার শুরু হতে ধরিল গান– আবার ভুলি দিল ছাড়ি।
দ্বিগুণ থরথরি কাঁপিছে হাত, স্মরণ করে গুরুদেবে।
কণ্ঠ কাঁপিতেছে কাতরে, যেন বাতাসে দীপ নেবে-নেবে।
গানের পদ তবে ছাড়িয়া দিয়া রাখিল সুরটুকু ধরি–
সহসা হাহারবে উঠিল কাঁদি গাহিতে গিয়া হা-হা করি।
কোথায় দূরে গেল সুরের খেলা, কোথায় তাল গেল ভাসি,
গানের সুতা ছিঁড়ি পড়িল খসি অশ্রুমুকুতার রাশি।
কোলের সখী তানপুরার ‘পরে রাখিল লজ্জিত মাথা–
ভুলিল শেখা গান, পড়িল মনে বাল্যক্রন্দনগাথা।
নয়ন ছলছল, প্রতাপ রায় কর বুলায় তার দেহে–
“আইস হেথা হতে আমরা যাই’ কহিল সকরুণ স্নেহে।
শতেক-দীপ-জ্বালা নয়ন-ভরা ছাড়ি সে উৎসবঘর
বাহিরে গেল দুটি প্রাচীন সখা ধরিয়া দুঁহু দোঁহা-কর।
বরজ করজোড়ে কহিল, “প্রভু, মোদের সভা হল ভঙ্গ!
এখন আসিয়াছে নূতন লোক, ধরায় নব নব রঙ্গ!
জগতে আমাদের বিজন সভা, কেবল তুমি আর আমি–
সেথায় আনিয়ো না নূতন শ্রোতা মিনতি তব পদে স্বামী!
একাকী গায়কের নহে তো গান, মিলিতে হবে দুই জনে–
গাহিবে একজন খুলিয়া গলা, আরেক জন গাবে মনে।
তটের বুকে লাগে জলের ঢেউ তবে সে কলতান উঠে,
বাতাসে বনসভা শিহরি কাঁপে তবে সে মর্মর ফুটে।
জগতে যেথা যত রয়েছে ধ্বনি যুগল মিলিয়াছে আগে–
যেখানে প্রেম নাই, বোবার সভা, সেখানে গান নাহি জাগে।’

গানভঙ্গ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- শিল্পে পরিবর্তন ও অনুভূতির অভাব: সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে গানের ক্ষেত্রে গভীরতা ও অনুভূতির চেয়ে বাহ্যিক কৌশল ও চমক যখন প্রধান হয়ে ওঠে, তখন শিল্প তার প্রাণ হারায়—এই সত্যটি কবিতার মূল প্রতিপাদ্য।
- শ্রোতা ও শিল্পীর আত্মিক সংযোগ: গান কেবল গায়কের একক গলাবাজি নয়; গায়ক ও শ্রোতার পারস্পরিক হৃদয় সংযোগ এবং গভীর প্রেম ছাড়া প্রকৃত শিল্পকলা বেঁচে থাকতে পারে না।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কথা ও কাহিনী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

![বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি | Borish dhora majhe shantir bari [ পূজা পর্যায়ের গান ] বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি | Borish dhora majhe shantir bari](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/09/বরিষ-ধরা-মাঝে-শান্তির-বারি-1024x576.jpg)


![কথা ও কাহিনী কাব্যগ্রন্থের 'গানভঙ্গ' কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 গানভঙ্গ gaanbhanga | কাহিনী [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/গানভঙ্গ-gaanbhanga-কাহিনী-কবিতা--1024x536.gif)

![পূরবী কাব্যগ্রন্থের ‘পথ’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 3 পথ poth [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/পথ-poth-কবিতা--1024x536.gif)
![বনস্পতি bonospoti [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 4 বনস্পতি bonospoti [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/বনস্পতি-bonospoti-কবিতা--1024x536.gif)



