গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ‘একা আমি ফিরব না আর’ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেলজয়ী কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি-র একটি অনন্য আত্মোন্মোচন, অহং-মুক্তি ও বিশ্বাত্মবোধের আধ্যাত্মিক লিরিক কবিতা হলো ‘একা আমি ফিরব না আর’ (গীতাঞ্জলির ৭৩ সংখ্যক পদ, যা পরবর্তীতে ‘গীতবিতান’-এর পূজা পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়)। সংকীর্ণ ব্যক্তিহৃদয়ের কোণে পরমেশ্বরকে একলা বাঁধার ব্যর্থ মোহ কাটিয়ে সমগ্র বিশ্বের মাঝে তাঁকে প্রত্যক্ষ করার এবং নিজের চিত্তকে বিশ্বকমলের প্রস্ফুটিত বৃন্ত হিসেবে সমর্পণ করার ব্যাকুল প্রার্থনা এ কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামএকা আমি ফিরব না আর (গীতাঞ্জলির ৭৩ সংখ্যক পদ)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থগীতাঞ্জলি (পরবর্তীতে ‘গীতবিতান’-এর পূজা পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত)
প্রকাশের বছর১৯১০ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ)
সুর ও রাগরাগ: ভৈরব; তাল: দাদরা
কবিতার আঙ্গিক ও ধরনআধ্যাত্মিক সমর্পণমূলক লিরিক ও বিশ্বাত্মচেতনার পদ (Mystical Devotional Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯১০ সালে প্রকাশিত গীতাঞ্জলি-তে রবীন্দ্রনাথ সাধকের ব্যক্তিগত অহং এবং সংকীর্ণ উপাসনার সীমাবদ্ধতা ভেঙে ফেলার ওপর জোর দিয়েছেন। মানুষ প্রায়শই ঈশ্বরকে কেবল নিজের ব্যক্তিগত আবেগের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বা গৃহকোণে বন্দি করে রাখতে চায়। কবি উপলব্ধি করেছেন, অনন্ত ঈশ্বরকে যখন একলা বাহু দিয়ে ছোট করে বাঁধতে যাওয়া হয়, তখন ঈশ্বর তো বাঁধা পড়েনই না, বরং মানুষ নিজেই নিজের ক্ষুদ্র মোহের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ঈশ্বরের সত্যরূপ কোনো নির্জন গৃহকোণে বা আত্মকেন্দ্রিক মোহের ভেতর একা পাওয়ার বিষয় নয়; তাঁকে পেতে হয় “নিখিলমাঝে”—সমগ্র সৃষ্টির প্রতিটি ধূলিকণা ও মানুষের ভিড়ের মধ্যে। কবি তাঁর নিজের হৃদয়কে কেবল একটি বৃন্ত (ফুলের বোঁটা) হিসেবে দেখতে চান, যার ওপর ফুটে উঠবে ঈশ্বরের অনন্তরূপী বিশ্বকমল।

সম্পূর্ণ কবিতা:

একা আমি ফিরব না আর
এমন করে–
নিজের মনে কোণে কোণে
মোহের ঘোরে।
তোমায় একলা বাহুর বাঁধন দিয়ে
ছোটো করে ঘিরতে গিয়ে
আপনাকে যে বাঁধি কেবল
আপন ডোরে।
যখন আমি পাব তোমায়
নিখিলমাঝে
সেইখনে হৃদয় পাব
হৃদয়রাজে।
এই চিত্ত আমার বৃন্ত কেবল
তারি ‘পরে বিশ্বকমল;
তারি ‘পরে পূর্ণ প্রকাশ
দেখাও মোরে।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Eka ami phirbo na ar
Emon kore–
Nijer mone kone kone
Moher ghore.
Tomay ekla bahur bandhon diye
Chhoto kore ghirte giye
Aponake je bandhi kebol
Apon dore.
Jokhon ami pabo tomay
Nikhilmajhe
Sheikhone hridoy pabo
Hridoyraje.
Ei chitto amar brinto kebol
Tari ‘pore bisshokomol;
Tari ‘pore purno prokash
Dekhao more.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • সংকীর্ণ মোহের বন্ধন ও অহং-সচেতনতা:
    “একা আমি ফিরব না আর / এমন করে– / নিজের মনে কোণে কোণে / মোহের ঘোরে। / তোমায় একলা বাহুর বাঁধন দিয়ে / ছোটো করে ঘিরতে গিয়ে / আপনাকে যে বাঁধি কেবল / আপন ডোরে।”
    — সাধকের প্রথম উপলব্ধি হলো তাঁর নিজ অহংকার ও মোহের অসারতা। ভগবানকে নিজের ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থ বা একাকী ভালোবাসার বৃত্তে আবদ্ধ করতে গিয়ে মানুষ নিজেকেই আরও বড় মোহের বন্ধনে বেঁধে ফেলে।
  • নিখিলমাঝে পরমেশ্বরের উপলব্ধি:
    “যখন আমি পাব তোমায় / নিখিলমাঝে / সেইখনে হৃদয় পাব / হৃদয়রাজে।”
    — ভগবান কোনো ব্যক্তিসর্বস্ব বা নির্জনতার ঈশ্বর নন; তিনি ‘নিখিলমাঝে’ অর্থাৎ সমস্ত বিশ্বের প্রাণস্পন্দনে বিরাজমান। সমগ্র জগতের কল্যাণে যখন ভগবানকে চেনা যায়, তখনই কেবল মানবহৃদয় তাঁর অন্তরের পরম রাজাকে (‘হৃদয়রাজ’) প্রকৃত অর্থে খুঁজে পায়।
  • চিত্ত ও বিশ্বকমল:
    “এই চিত্ত আমার বৃন্ত কেবল / তারি ‘পরে বিশ্বকমল; / তারি ‘পরে পূর্ণ প্রকাশ / দেখাও মোরে।”
    — কবিতার অন্তিমে রবীন্দ্রদর্শনের এক অপূর্ব রূপক ফুটে উঠেছে। কবির ব্যক্তিগত হৃদয় কোনো স্বতন্ত্র ফুল নয়, তা কেবল ঈশ্বরের হাতের একটি পুষ্পবৃন্ত বা বোঁটা। সেই বৃন্তের ওপর যেন সমগ্র বিশ্বের শতদল (বিশ্বকমল) হয়ে স্বয়ং পরমাত্মা পূর্ণ মহিমায় প্রস্ফুটিত হন—এই ঐশ্বরিক পূর্ণ প্রকাশের প্রার্থনাই কবিতাটির শেষ কথা।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন