বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেম পর্বের এক অনুপম, বিনম্র ও আত্মনিবেদিত বিদায়গীতি “আমি যাব না গো অমনি চলে”। বসন্তের সমাপনলগ্নে প্রিয়তমের সান্নিধ্য ত্যাগ করার মুহূর্তে অপূর্ণতার আর্তি এবং অন্তরের গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ এই গানে মূর্ত হয়ে উঠেছে। জীবনের নানা সুখ ও দুঃখের ভেতর দিয়ে যে বাণী অন্তরে সংগৃহীত হয়েছিল, বিদায়বেলায় নিজের সুরহীন অব্যক্ত আর্তিকে অশ্রুজলে উৎসর্গ করে যাওয়ার যে পরম আত্মবিলোপী আকুতি—গানটি তারই এক অবিস্মরণীয় সুরময় রূপ।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | আমি যাব না গো অমনি চলে |
| পর্যায় | প্রেম পর্যায় (গান সংখ্যা: ১১৩) |
| উপ-পর্যায় | প্রেম-বৈচিত্র্য |
| রাগ | পিলু-বাউল |
| তাল | দাদরা-খেমটা (ছয় মাত্রা: ৩+৩) |
| রচনাকাল (বঙ্গাব্দ) | ১৩২১ বঙ্গাব্দ |
| রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ) | ১৯১৪–১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ |
| রচনাস্থান | শান্তিনিকেতন |
| স্বরলিপিকার | দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| আকর গ্রন্থ | গীতবিতান (প্রেম পর্যায়) ও স্বরবিতান |
| মূল উপজীব্য | বিদায়ের ক্ষণে অপূর্ণতা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, অব্যক্ত বাণী ও অশ্রুসিক্ত সমর্পণ |
আমি যাব না গো অমনি চলে – বাংলা লিরিক
আমি যাব না গো অমনি চলে। মালা তোমার দেব গলে॥
অনেক সুখে অনেক দুখে তোমার বাণী নিলেম বুকে,
ফাগুনশেষে যাবার বেলা আমার বাণী যাব বলে॥
কিছু হল, অনেক বাকি। ক্ষমা আমায় করবে না কি।
গান এসেছে সুর আসে নাই,হল না যে শোনানো তাই–
সে-সুর আমার রইল ঢাকা নয়নজলে॥
আমি যাব না গো অমনি চলে — Romanized Version
Ami jab na go omoni chole। Mala tomar deb gole॥
Onek sukhe onek dukhe tomar bani nilem buke,
Phagunseshe jabar bela amar bani jab bole॥
Kichhu holo, onek baki। Khoma amay korbe na ki।
Gaan eshechhe sur ase nai, holo na je shonano tai—
se-sur amar roilo dhaka noyonjole॥
গানের মূল ভাব
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. রিক্ত না গিয়ে মাল্যদান
- “আমি যাব না গো অমনি চলে। মালা তোমার দেব গলে…”হুট করে চলে যাওয়ার রূঢ়তা বর্জন। প্রেম ও শ্রদ্ধার স্মারক হিসেবে প্রিয়তমের গলায় মালা পরিয়ে বিদায় নেওয়ার মধ্য দিয়ে সম্পর্কের প্রতি গভীর নিষ্ঠা প্রকাশ পেয়েছে।
২. ফাগুনশেষে বাণীর বিনিময়
- “অনেক সুখে অনেক দুখে তোমার বাণী নিলেম বুকে / ফাগুনশেষে যাবার বেলা আমার বাণী যাব বলে…”জীবনের বসন্তকাল (ফাগুন) ফুরিয়ে আসার মুহূর্ত। এতদিন প্রিয়জনের উপদেশ ও ভালোবাসা হৃদয়ে পরম মমতায় ধারণ করা হয়েছে; এবার প্রস্থানের মুহূর্তে নিজের অন্তরের গোপন কথাটি প্রকাশ করার আন্তরিক তাগিদ তৈরি হয়েছে।
৩. অসমাপ্ত সাধনা ও ক্ষমার প্রার্থনা
- “কিছু হল, অনেক বাকি। ক্ষমা আমায় করবে না কি…”চরম বিনয় ও আত্মবিশ্লেষণ। জীবনের সাধনায় সামান্যই অর্জিত হয়েছে, অপূর্ণ রয়ে গেছে সিংহভাগ। এই অক্ষমতার জন্য প্রেমাস্পদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা ভালোবাসাকে পবিত্র করে তোলে।
৪. সুরহীন গানের অশ্রুঞ্জলি
- “গান এসেছে সুর আসে নাই, হল না যে শোনানো তাই / সে-সুর আমার রইল ঢাকা নয়নজলে…”রবীন্দ্র-কাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নান্দনিক প্রকাশ। বাণীর আগমন ঘটলেও সুরের অভাবে গান শোনানো যায়নি; সুরের সেই অপূর্ণতা ও অপ্রাপ্তির আর্তি নীরব অশ্রুজলে ঢাকা পড়ে এক চিরন্তন নিবেদনে পরিণত হয়েছে।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- ঋতু পরিবর্তনের রূপক: ‘ফাগুনশেষ’-এর অনুষঙ্গ এনে যৌবনের বিদায় ও বিষাদময় পরিণতির এক অপরূপ চিত্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছে।
- অপূর্ণতার নান্দনিকতা: নিখুঁত সাফল্যের চেয়ে অপূর্ণতার বেদনা যে শিল্পে আরও বেশি মহিমান্বিত, তা “গান এসেছে সুর আসে নাই”-এর মতো চরণে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
- সাবলীল ও সংক্ষিপ্ত কথনভঙ্গি: জটিল কাব্যালংকার পরিহার করে অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ও আবেগময় ভাষায় বিরহের আর্তি প্রকাশ পেয়েছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- পিলু ও বাউল সুরের সম্মিলন: রাগ পিলুর স্নিগ্ধ বিরহ এবং লোকায়ত বাউলের মেঠো আন্তরিকতার সংমিশ্রণ গানটিকে এক অনুপম আবেদন দিয়েছে। বাউলের সুর থাকায় গানটি কোনো কঠোর শাস্ত্রীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে মাটির কাছাকাছি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছে।
- দাদরা ও খেমটা তালের দোলন: ছয় মাত্রার দ্রুত ও মিষ্টি ছন্দ গানটির ভেতর এক ধরনের চঞ্চল ব্যাকুলতা ও গীতিময়তা তৈরি করে।
- দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বরলিপি: রবীন্দ্রনাথের প্রধান সুর-সংরক্ষক দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বরলিপিতে পিলু রাগের কোমল স্বর ও লোকজ অঙ্গের টান নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৩২১ বঙ্গাব্দে (১৯১৪–১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ) শান্তিনিকেতনের শান্ত আশ্রমে রচিত এই গানটিতে কবির পরিণত আধ্যাত্মিক চেতনা ও মানবিক প্রেমের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল। এই পর্বে তিনি গীতবিতানের অজস্র চিরস্মরণীয় গান রচনা করেন।
- গীতবিতানের বিন্যাস: গীতবিতানের প্রেম পর্যায়ের ‘প্রেম-বৈচিত্র্য’ উপ-পর্যায়ে গানটি স্থান পেয়েছে, যা রবীন্দ্র-প্রেমদর্শনের আত্মবিলোপী রূপকে নির্দেশ করে।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
- স্বরবিতান (রবীন্দ্রসংগীত স্বরলিপি গ্রন্থমালা), বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
- রবীন্দ্র-জীবনী (দ্বিতীয় খণ্ড), প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।

![ভগ্নহৃদয় সপ্তদশ সর্গ bhagno hriday soptodos sorgo[ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভগ্নহৃদয় সপ্তদশ সর্গ bhagno hriday soptodos sorgo[ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভগ্নহৃদয়-সপ্তদশ-সর্গ-bhagno-hriday-soptodos-sorgo-কবিতা--1024x536.gif)








