হৃদয়ের পুঞ্জীভূত অব্যক্ত অনুভূতির ভার যখন ভাষা বা বাচনিক প্রকাশক্ষমতাকে অতিক্রম করে যায়, তখনই জন্ম নেয় এক অসহনীয় অথচ অনুপম আর্তি—যার সুরময় প্রকাশ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেম পর্বের গান “আমি যে আর সইতে পারি নে”। ১৯১৪ সালে রচিত ভৈরবী রাগাশ্রিত এই গানে সুরের আকুলতা, অন্তরের নিভৃত বেদনাবোধ এবং বাহিরের অলৌকিক আহ্বানে গৃহবন্ধনের সমস্ত প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে পড়ার এক ব্যাকুল আত্মহারা রূপ ফুটে উঠেছে। মন যখন অনুভূতির রূপ ও তীব্রতাকে ভাষায় প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়, তখন অবচেতনের সেই আর্তি কীভাবে মানুষকে আত্মবিস্মৃত করে অচিনের পথে নামিয়ে আনে—গানটি তারই এক অনবদ্য কাব্যিক ও সুরেলা দলিল।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | আমি যে আর সইতে পারি নে |
| পর্যায় | প্রেম পর্যায় (গান সংখ্যা: ৪৭) |
| উপ-পর্যায় | প্রেম-বৈচিত্র্য |
| রাগ | ভৈরবী |
| তাল | দাদরা (ছয় মাত্রা: ৩+৩) |
| রচনাকাল (বঙ্গাব্দ) | ৯ ভাদ্র, ১৩২১ বঙ্গাব্দ |
| রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ) | ২৬ আগস্ট, ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ |
| রচনাস্থান | শান্তিনিকেতন |
| আকর গ্রন্থ | গীতবিতান (প্রেম পর্যায়) ও স্বরবিতান |
| মূল উপজীব্য | অব্যক্ত প্রেমবেদনা, অনুভূতির অসহ্য ভার, দূরবর্তী বীণার আহ্বান ও গৃহত্যাগের ব্যাকুলতা |
আমি যে আর সইতে পারি নে (পুরো লিরিক):
আমি যে আর সইতে পারি নে।
সুরে বাজে মনের মাঝে গো, কথা দিয়ে কইতে পারি নে॥
হৃদয়লতা নুয়ে পড়ে ব্যথাভরা ফুলের ভরে গো,
আমি সে আর বইতে পারি নে॥
আজি আমার নিবিড় অন্তরে॥
কী হাওয়াতে কাঁপিয়ে দিল গো পুলক-লাগা আকুল মর্মরে।
কোন্ গুণী আজ উদাস প্রাতে মীড় দিয়েছে কোন্ বীণাতে গো–
ঘরে যে আর রইতে পারি নে॥
Ami je ar soite pari ne — Romanized Version
Ami je ar soite pari ne।
Sure baje moner majhe go, kotha diye koite pari ne॥
Hridoylota nuye pore byathabhora phuler bhore go,
ami se ar boiতে pari ne॥
Aji amar nibiro ontore।
Ki hawate kampiye dilo go pulok-laga akul marmore।
Kon guni aj udas prate mir diyechhe kon binate go—
ghore je ar roite pari ne॥
গানের মূল ভাব
“আমি যে আর সইতে পারি নে” গানটির মূল নির্যাস হলো অন্তরের তীব্র ভাবাবেগ প্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং অনুভূতির অপ্রতিরোধ্য ভার। মানুষের হৃদয় যখন গভীর প্রেম ও বেদনায় আচ্ছন্ন হয়, তখন প্রচলিত ভাষা বা শব্দ তা প্রকাশে অসহায় হয়ে পড়ে। সুর মনের গভীরে অনবরত বেজে চললেও তা কথায় রূপ দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
গানটিতে ভালোবাসাকে তুলনা করা হয়েছে পুষ্পিত এক সুকোমল লতার সাথে, যার ফুলগুলো এত বেশি বেদনা ও অনুরাগে ভরা যে সেই ভারে লতাটি নুয়ে পড়ে। বাইরের বাতাস ও অদৃশ্য কোনো সুরসাধকের মীড়ের পরশে মনের শান্ত গৃহকোণ আলোড়িত হয়ে ওঠে। ফলে ঘরের সমস্ত চেনা সীমানা ও স্থবিরতা ছিন্ন করে অজানার উদ্দেশে ছুটে যাওয়ার এক পরম আত্মহারা আকুলতা তৈরি হয়।
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. অবর্ণনীয় অন্তর্দহন ও কথার অক্ষমতা
- “আমি যে আর সইতে পারি নে / সুরে বাজে মনের মাঝে গো, কথা দিয়ে কইতে পারি নে…”বাণীর চেয়ে সুরের ব্যঞ্জনা এখানে অনেক বেশি শক্তিশালী। অন্তরের নিভৃততম অনুভূতি যখন প্রকাশের ভাষা খুঁজে পায় না, তখন তা সুর হয়ে অন্তরে বাজতে থাকে এবং সেই নীরব দহন সহ্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
২. হৃদয়লতার অবনমন ও বেদনার পুষ্পভার
- “হৃদয়লতা নুয়ে পড়ে ব্যথাভরা ফুলের ভরে গো, আমি সে আর বইতে পারি নে…”এক অপরূপ ও সংবেদনশীল চিত্রকল্প। প্রেম এখানে কোনো হালকা অনুভূতি নয়; তা ব্যথাভরা ফুলের মতো ভারী ও সুবাসিত। সেই অনুরাগের আতিশয্যে হৃদয়ের লতা নমিত হয়ে পড়ে এবং অস্তিত্ব সেই ভার বইতে অপারগ হয়।
৩. নিভৃত চেতনার স্পন্দন ও মর্মরধ্বনি
- “আজি আমার নিবিড় অন্তরে / কী হাওয়াতে কাঁপিয়ে দিল গো পুলক-লাগা আকুল মর্মরে…”বাইরের প্রকৃতির এক অদৃশ্য বাতাস এসে মানুষের অবচেতন মনে তোলপাড় সৃষ্টি করে। রোমাঞ্চ ও আর্তি মিলেমিশে মনের গহীনে এক চিরন্তন চঞ্চলতার জন্ম দেয়।
৪. দূরবর্তী বীণাধ্বনি ও গৃহবন্ধনের অবসান
- “কোন্ গুণী আজ উদাস প্রাতে মীড় দিয়েছে কোন্ বীণাতে গো—ঘরে যে আর রইতে পারি নে…”অজানা কোনো সুরকারের এক অলৌকিক তান। ভোরের শান্ত পরিবেশে বেজে ওঠা সেই মীড় অন্তরের সুপ্ত বৈরাগ্যকে জাগিয়ে তোলে। সেই সুরের ডাকে সাড়া না দিয়ে চেনা ঘরের চারদেয়ালে বন্দি থাকা আর সম্ভব হয় না।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- প্রকৃতি ও অনুভূতির নিখুঁত মেলবন্ধন: হৃদয়কে লতার সাথে এবং ভালোবাসার গভীরতাকে সুগন্ধি অথচ ভারী পুষ্পের সাথে তুলনা কাব্যিক রূপকের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
- ভাষার সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি: কথা যেখানে শেষ হয়, সংগীতের যাত্রা সেখান থেকেই শুরু হয়—এই চিরন্তন সত্যটি চরণের পরতে পরতে স্পষ্ট।
- সুললিত ছন্দ ও অন্ত্যমিল: ‘কইতে-রইতে-সইতে-বইতে’ এবং ‘অন্তরে-মর্মরে’-র মতো অন্ত্যমিলগুলো গানের বাণীর ভেতরের চঞ্চল অস্থিরতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- ভৈরবী রাগের আর্তি: ভোরের স্নিগ্ধ অথচ গভীর বিরহের রাগ ‘ভৈরবী’-র আশ্রয়ে গানটি রচিত। ভৈরবীর কোমল স্বরসমূহ মনের না-বলা কান্নার আবহকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মূর্ত করে তোলে।
- দাদরা তালের দোলাচল: ছয় মাত্রার দাদরা তালের সাবলীল লয় হৃদয়লতার মৃদু দোলন ও বাতাসের কাঁপনটিকে এক অনন্য গীতিময় ছন্দে ধরে রাখে।
- মীড়ের অলংকরণ: গানে বাচনিকভাবেই যেখানে ‘মীড়’-এর উল্লেখ রয়েছে, সুরেও তেমনি স্বরের মসৃণ সংযোগ সুরের ভেতর এক উদাসী ও ধ্যানমগ্ন বাতাবরণ রচনা করে।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৩২১ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে (১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ) শান্তিনিকেতনের শান্ত আশ্রমে কবি এই গানটি রচনা করেন। এই পর্বে তাঁর সৃষ্টিতে মানবীয় প্রেমের সংবেদনশীলতার সাথে অতীন্দ্রিয় অনুভূতির এক গভীর মেলবন্ধন ঘটেছিল।
- গীতবিতানের প্রেম পর্যায়: গীতবিতানের প্রেম পর্বের অন্তর্ভুক্ত এই গানটি বাংলা কাব্যগীতিতে অব্যক্ত ব্যাকুলতার এক চিরন্তন স্মারক হিসেবে স্বীকৃত।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
- স্বরবিতান (রবীন্দ্রসংগীত স্বরলিপি সংকলন), বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
- রবীন্দ্র-জীবনী (দ্বিতীয় খণ্ড), প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।

![গুরুগোবিন্দ guru gobindo [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গুরুগোবিন্দ guru gobindo [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/গুরুগোবিন্দ-guru-gobindo-কবিতা--1024x536.gif)






