আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

আমি ফুল তুলিতে এলেম বনে , প্রেম পর্যায়, ৩৪৪ | রবীন্দ্রসঙ্গীত

Table of Content

প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে অবচেতন মনের সুপ্ত বেদনাবোধ হঠাৎ উন্মোচিত হওয়ার এক গভীর ও সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক সৃষ্টি “আমি ফুল তুলিতে এলেম বনে”। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেম পর্বের এই গানটিতে এক আপাত-সহজ প্রাত্যহিক কাজের ভেতর দিয়ে মানুষের গভীরতম অন্তর্বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ফুল তোলার মতো এক আনন্দময় ও নিস্পৃহ উদ্দেশ্যে বনে প্রবেশ করেও মনের অজান্তেই অশ্রুসজল হয়ে ওঠা প্রমাণ করে যে, মানুষের হৃদয় অনেক সময় নিজের ভেতরের না-বলা বিরহ বা অপূর্ণতার খবর নিজেও আগে থেকে জানতে পারে না।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
শিরোনামআমি ফুল তুলিতে এলেম বনে
পর্যায়প্রেম পর্যায় (গান সংখ্যা: ৩৪৪)
উপ-পর্যায়প্রেম-বৈচিত্র্য
রাগমূলতান-ভীমপলশ্রী
তালকাহারবা (আট মাত্রা: ৪+৪)
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ)ভাদ্র, ১৩৪০ বঙ্গাব্দ
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ)আগস্ট–সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ
রচনাস্থানশান্তিনিকেতন
আকর গ্রন্থগীতবিতান (প্রেম পর্যায়) ও স্বরবিতান
মূল উপজীব্যঅবচেতন বিরহবেদনা, আত্মবিস্মৃতি, অকারণ অশ্রুপাত ও অন্তরের অব্যক্ত আকুলতা

আমি ফুল তুলিতে এলেম বনে – পুরো গান

আমি ফুল তুলিতে এলেম বনে–

জানি নে, আমার কী ছিল মনে।

এ তো ফুল তোলা নয়, বুঝি নে কী মনে হয়,

জল ভরে যায় দু নয়নে॥

 

Ami phul tulite elem bone — puro gaan

Ami phul tulite elem bone—

Jani ne, amar ki chhilo mone।

E to phul tola noy, bujhi ne ki mone hoy,

Jol bhore jay du noyone॥

 

গানের মূল ভাব

“আমি ফুল তুলিতে এলেম বনে” গানটির মূল নির্যাস হলো মানবমনের অবচেতন জগতের অতলান্ত রহস্য। মানুষ অনেক সময় মনে করে সে কেবল বাইরের রূপ ও সৌন্দর্যের আকর্ষণে কোনো কাজে লিপ্ত হচ্ছে, কিন্তু অন্তরের গহীনে জমে থাকা বিরহ বা স্মৃতি হঠাৎ কোনো বাহ্যিক স্পর্শে বাঁধ ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসে।

এখানে ফুল তোলা নিছক কোনো উদ্যান-বিলাস নয়; ফুল তুলতে গিয়ে প্রেমিক বা সাধক বুঝতে পারে যে তার ভেতরের শূন্যতা ফুলের রূপ দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়। প্রকৃতির কোমল রূপের মুখোমুখি দাঁড়াতেই অবদমিত আকুলতা অশ্রুর রূপ ধরে দুচোখে নেমে আসে। মনের এই আকস্মিক রূপান্তর যুক্তির অতীত—কেন চোখ জলে ভরে উঠছে, মন নিজেও তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা জানে না।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. উদ্দেশ্যহীন অভিযাত্রা ও আত্মঅজ্ঞতা

  • “আমি ফুল তুলিতে এলেম বনে—জানি নে, আমার কী ছিল মনে…”
    গানটির সূচনাই হয় মনের এক বিভ্রান্ত ও বিস্মৃত অবস্থা দিয়ে। বাহ্যিক উদ্দেশ্য ছিল বনে এসে ফুল চয়ন করা, কিন্তু চেতনার গভীরে কোন গোপন বাসনা বা ক্ষত লুকিয়ে ছিল, তা বক্তার নিজের কাছেও অজ্ঞাত ছিল।

২. ছদ্মবেশের অবসান ও অশ্রুর উন্মোচন

  • “এ তো ফুল তোলা নয়, বুঝি নে কী মনে হয় / জল ভরে যায় দু নয়নে…”
    অনুভূতির চরম নাটকীয় মুহূর্ত। হাত হয়তো ফুলের শাখায় পৌঁছেছে, কিন্তু হৃদয় উপলব্ধি করে যে আসল উদ্দেশ্য ফুল সংগ্রহ নয়; বরং প্রকৃতির নিভৃতে নিজের একাকীত্ব ও না-পাওয়ার বেদনাকেই অবচেতনে খুঁজছিল মন। সেই অনুভূতির তীব্রতায় চোখ বেয়ে নেমে আসে নীরব অশ্রুধারা।

বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন

গানটিতে প্রত্যক্ষ কোনো বিদায়দৃশ্য অঙ্কিত না হলেও, নয়নভরা জলের মাঝে লুকিয়ে আছে এক অনন্ত বিদায়ের প্রচ্ছন্ন আঘাত। যে অশ্রু দুচোখ ভরে তোলে, তা কোনো আশ্বস্ত মিলনের অশ্রু নয়; বরং তা আশাহীন নয়নের মৌন আত্মসমর্পণ। কোনো পরম প্রিয়জনের স্মৃতি অথবা হারিয়ে যাওয়া অতীতের শূন্যতা মনের জানালায় আঘাত হানে বলেই আনন্দের কুঞ্জবনেও দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। আশাহীন চোখ তখন বাইরের সুন্দর বনভূমির দৃশ্য হারিয়ে ফেলে অন্তরের অশ্রুসাগরে নিমজ্জিত হয়।

সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য

  • মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা: আধুনিক কবিতার মতো মানুষের অবচেতন মন ও দ্বৈত অনুভূতির দ্বন্দ্বকে অত্যন্ত সংক্ষেপে ও সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
  • সহজিয়া বাচনভঙ্গি: কোনো ভারী বা জটিল সংস্কৃত শব্দের আশ্রয় না নিয়ে অত্যন্ত প্রাত্যহিক কথ্য ভাষার শব্দে অন্তরের সূক্ষ্মতম আলোড়ন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
  • সংক্ষিপ্ততায় বিরাটত্ব: মাত্র কয়েকটি চরণে একটি সমগ্র মানসিক অবস্থা ও বিরহের আবহ সৃষ্টি করা রবীন্দ্র-কাব্যের অন্যতম সেরা নিদর্শন।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা

  • মূলতান ও ভীমপলশ্রীর বিষাদময় বিস্তার: গানটির সুরে মূলতান এবং ভীমপলশ্রী রাগের ছায়া মিশেছে। অপরাহ্ণের এই দুটি রাগই অন্তরের গভীর উদাসীনতা, আকুলতা ও চাপা হাহাকার প্রকাশে অদ্বিতীয়।
  • কাহারবা তালের সাবলীল লয়: আট মাত্রার কাহারবা তালের সহজ চলন গানের বক্তব্যকে একটি প্রবহমান ও স্বাভাবিক গতি দান করেছে।
  • মীড় ও কোমল স্বরের প্রয়োগ: সুরের কোমল গান্ধার ও মধ্যমের সংবেদনশীল ছোঁয়া বাণীর ভেতরের দ্বিধা ও চোখের জলের আর্দ্রতাকে জীবন্ত করে তোলে।

শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৩৪০ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে (১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) পরিণত বয়সে শান্তিনিকেতনে কবি এই গানটি রচনা করেন। জীবনের এই সায়াহ্নে এসে কবির গানে প্রকৃতির রূপ এবং মানবহৃদয়ের অন্তর্লীন বেদনাবোধ একাকার হয়ে গিয়েছিল।
  • গীতবিতানের প্রেম পর্যায়: গীতবিতানের প্রেম পর্বের অন্তর্ভুক্ত এই গানটি রবীন্দ্রনাথের সংবেদনশীল প্রেমভাবনার এক অনন্য ও সংহত দলিল।

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

“আমি ফুল তুলিতে এলেম বনে” এমন একটি সৃষ্টি যা মানুষের অকারণ বিষাদ ও সংবেদনশীলতাকে নান্দনিক স্বীকৃতি দেয়। জীবনের ব্যস্ততার মাঝে মানুষ যখন হঠাৎ করেই কোনো কারণ ছাড়া বিষণ্ণ বা স্মৃতিভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন এই গানটি সেই অব্যক্ত অনুভূতির এক পরম সান্ত্বনা হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়। রবীন্দ্রসংগীতের আসরে এটি অন্তর্মুখী বিরহভাবের এক কালজয়ী নিদর্শন হিসেবে সমাদৃত।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
  2. স্বরবিতান (রবীন্দ্রসংগীত স্বরলিপি গ্রন্থমালা), বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
  3. রবীন্দ্র-জীবনী (চতুর্থ খণ্ড), প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত