বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ, মনস্তাত্ত্বিক ও যুগান্তকারী চতুর্দশপদী (সনেটধর্মী) কবিতা হলো ‘স্নেহগ্রাস’। স্নেহের অন্ধ আতিশয্য কীভাবে সন্তানের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও মনুষ্যত্বকে পঙ্গু করে দিতে পারে, সে বিষয়ে জননীকে সতর্ক করে সন্তানকে বিশ্বদেবতার মুক্ত প্রাঙ্গণে সমর্পণ করার এক উদাত্ত দার্শনিক আহ্বান এ কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | স্নেহগ্রাস |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | চৈতালী (চিত্রা-চৈতালি পর্ব) |
| রচনাকাল/প্রকাশের বছর | আশ্বিন, ১৩০৩ বঙ্গাব্দ (১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দ) |
| কবিতার আঙ্গিক ও ধরন | চতুর্দশপদী বা সনেটধর্মী মনস্তাত্ত্বিক ও হিতোপদেশমূলক লিরিক (Philosophical Sonnet) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৮৯৬ সালে শিলাইদহের পদ্মাবক্ষে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ ‘চৈতালী’ কাব্যের স্তব্ধ, সংযত ও অনুধ্যানমূলক সনেটগুলো রচনা করেন। প্রাচীন ভারতীয় তপোবনের আদর্শ ও মুক্ত মানবচেতনায় বিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথ প্রত্যক্ষ করেছিলেন যে, সমাজের অন্ধ মোহগ্রস্ত মাতৃত্ব অনেক সময় স্নেহের নামে সন্তানকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করে। অতিলালন ও অতিসংরক্ষণে সন্তানের স্বাধীন বিকাশ রুদ্ধ হয়। কবি মাতৃত্বকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু মাতৃস্নেহের সেই ক্ষতিকর দিকটিকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন যা সন্তানকে সংসারের বৃহত্তর কর্মক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। কবি স্মরণ করিয়ে দেন—শারীরিক গর্ভবাস থেকে জন্ম নিয়ে সন্তান পৃথিবীর আলো দেখেছে, তাকে পুনরায় স্নেহের আত্মকেন্দ্রিক গর্ভে গ্রাস করে রাখা অন্যায়। সন্তান কেবল জননীর ক্ষুদ্র অংশের বিস্তার নয়, সে সমগ্র বিশ্বের এবং বিশ্বদেবতার।
সম্পূর্ণ কবিতা:
অন্ধ মোহবন্ধ তব দাও মুক্ত করি–
রেখো না বসায়ে দ্বারে জাগ্রত প্রহরী
হে জননী, আপনার স্নেহ-কারাগারে
সন্তানেরে চিরজন্ম বন্দী রাখিবারে।
বেষ্টন করিয়া তারে আগ্রহ-পরশে,
জীর্ণ করি দিয়া তারে লালনের রসে,
মনুষ্যত্ব-স্বাধীনতা করিয়া শোষণ
আপন ক্ষুধিত চিত্ত করিবে পোষণ?
দীর্ঘ গর্ভবাস হতে জন্ম দিলে যার
স্নেহগর্ভে গ্রাসিয়া কি রাখিবে আবার?
চলিবে সে এ সংসারে তব পিছু-পিছু?
সে কি শুধু অংশ তব, আর নহে কিছু?
নিজের সে, বিশ্বের সে, বিশ্বদেবতার–
সন্তান নহে, গো মাতঃ, সম্পত্তি তোমার।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Ondho mohobondho tobo dao mukto kori–
Rekho na bosaye dware jagroto prohori
He jononi, aponar sneho-karagare
Shontanere chirojonmo bondi rakhibare.
Beshton koriya tare agroho-poroshe,
Jirno kori diya tare laloner roshe,
Monushotto-shadhinota koriya shoshon
Apon khudhitô chitẗo koribe poshon?
Dirgho gorbhobash hote jonmo dile jar
Snehogorbhe grasiya ki rakhibe abar?
Cholibe she e shongshare tobo pichhu-pichhu?
She ki shudhu ongsho tobo, ar nohe kichhu?
Nijer she, bissher she, bisshodebotar–
Shontan nohe, go matoh, shompotti tomar.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- স্নেহ-কারাগার ও অতিলালনের কুফল:“হে জননী, আপনার স্নেহ-কারাগারে / সন্তানেরে চিরজন্ম বন্দী রাখিবারে। / বেষ্টন করিয়া তারে আগ্রহ-পরশে, / জীর্ণ করি দিয়া তারে লালনের রসে,”— ভালোবাসার রূপান্তর যখন শিকলে পরিণত হয়, কবি তাকে নির্ভীকভাবে ‘স্নেহ-কারাগার’ বলেছেন। অতিরিক্ত সুরক্ষাবেষ্টনী ও বিলাসের লালন সন্তানের তেজ ও জীবনীশক্তিকে জীর্ণ করে দেয়, যা তার স্বাভাবিক আত্মবিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
- আত্মতৃপ্তি বনাম সন্তানের মনুষ্যত্বহরণ:“মনুষ্যত্ব-স্বাধীনতা করিয়া শোষণ / আপন ক্ষুধিত চিত্ত করিবে পোষণ? / দীর্ঘ গর্ভবাস হতে জন্ম দিলে যার / স্নেহগর্ভে গ্রাসিয়া কি রাখিবে আবার?”— অভিভাবক অনেক সময় অজান্তেই নিজের মানসিক ক্ষুধা বা অধিকারবোধ মেটাতে গিয়ে সন্তানের স্বাধীনতা ও পুরুষোচিত মনুষ্যত্বকে শোষণ করেন। শারীরিক গর্ভবাসের পর দ্বিতীয়বার মনস্তাত্ত্বিক স্নেহগর্ভে তাকে বন্দি রাখার প্রবণতাকে কবি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
- বিশ্বের অধিকার ও অন্তিম সত্য:“নিজের সে, বিশ্বের সে, বিশ্বদেবতার– / সন্তান নহে, গো মাতঃ, সম্পত্তি তোমার।”— কবিতার শেষ দুই চরণে উন্মোচিত হয়েছে এর চিরন্তন সার্বজনীন সত্য। সন্তান কোনো স্থাবর সম্পত্তি নয় যে তার ওপর পিতামাতার একচ্ছত্র মালিকানা থাকবে। তার প্রথম পরিচয় সে স্বয়ংসম্পূর্ণ এক ব্যক্তি, দ্বিতীয়ত সে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে নিবেদিত এবং সর্বোপরি সে পরম বিশ্বদেবতারই সৃষ্টি। তাকে মুক্তি দেওয়াই মাতৃত্বের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (চৈতালী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংকলন ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।
