বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছড়ার ছবি’ (১৯৩৭) কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম সুন্দর, ভ্রমণপিপাসু ও মুক্তপ্রাণের কবিতা হলো ‘ভ্রমণী’। এই কবিতায় নাগরিক জীবনের আবদ্ধতা ও কৃত্রিমতার বিপরীতে প্রকৃত পথচারী বা ভ্রমণকারীদের দুর্দম অভিযাত্রা, প্রকৃতির সাথে তাদের একাত্মতা এবং পৃথিবীর আসল বিজয়ী কারা—তার এক অপূর্ব কাব্যিক চিত্র ফুটে উঠেছে।
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | ভ্রমণী |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ছড়ার ছবি |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৭ (১৩৪৪ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | ভ্রমণপিপাসু ও মুক্তপ্রাণের গীতি-কবিতা (Wanderlust and Free-spirited Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
ভ্রমণী – সম্পূর্ণ কবিতা
মাটির ছেলে হয়ে জন্ম, শহর নিল মোরে
পোষ্যপুত্র ক’রে।
ইঁটপাথরের আলিঙ্গনের রাখল আড়ালটিকে
আমার চতুর্দিকে।
বই প’ড়ে তাই পেতে হত ভ্রমণকারীর দেখা
ছাদের উপর একা।
কষ্ট তাদের, বিপদ তাদের, তাদের শঙ্কা যত
লাগত নেশার মত।
পথিক যে জন পথে পথেই পায় সে পৃথিবীকে,
মুক্ত সে চৌদিকে।
চলার ক্ষুধায় চলতে সে চায় দিনের পরে দিনে
অচেনাকেই চিনে।
লড়াই ক’রে দেশ করে জয়, বহায় রক্তধারা,
ভূপতি নয় তারা।
পলে পলে পার যারা হয় মাটির পরে মাটি
প্রত্যেক পদ হাঁটি–
নাইকো সেপাই, নাইকো কামান, জয়পতাকা নাহি–
আপন বোঝা বাহি
অপথেও পথ পেয়েছে, অজানাতে জানা,
মানে নাইকো মানা–
মরু তাদের, মেরু তাদের, গিরি অভ্রভেদী
তাদের বিজয়বেদী।
সবার চেয়ে মানুষ ভীষণ; সেই মানুষের ভয়
ব্যাঘাত তাদের নয়।
তারাই ভূমির বরপুত্র, তাদের ডেকে কই,
তোমরা পৃথ্বীজয়ী।
Romanized Version
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- নাগরিক বন্দিদশা ও বইয়ের পাতার ভ্রমণ:“মাটির ছেলে হয়ে জন্ম, শহর নিল মোরে / পোষ্যপুত্র ক’রে। … বই প’ড়ে তাই পেতে হত ভ্রমণকারীর দেখা / ছাদের উপর একা।”— মাটির মানুষের সন্তান হয়ে জন্ম নিয়েও কবিকে শহরের ইটপাথরের কৃত্রিম খাঁচায় বন্দি থাকতে হয়েছে। তাই ছোটবেলায় ছাদের ওপর একা বসে বই পড়েই তাঁকে ভ্রমণকারীদের কল্পিত দুনিয়া দেখতে হতো।
- পথিকের মুক্তি ও চলার ক্ষুধা:“পথিক যে জন পথে পথেই পায় সে পৃথিবীকে, / মুক্ত সে চৌদিকে। / চলার ক্ষুধায় চলতে সে চায় দিনের পরে দিনে / অচেনাকেই চিনে।”— যারা সত্যিকারের পথিক, তারা কেবল ঘরের কোণে বন্দি থাকে না; পথেই তারা পৃথিবীকে খুঁজে নেয়। অচেনাকে চেনার নেশায় এবং চলার অবিরাম ক্ষুধায় তারা দিনরাত পাড়ি দেয়।
- প্রকৃত বিজয়ী ও ভূমির বরপুত্র:“নাইকো সেপাই, নাইকো কামান, জয়পতাকা নাহি– / আপন বোঝা বাহি… মরু তাদের, মেরু তাদের, গিরি অভ্রভেদী / তাদের বিজয়বেদী।”— রাজা-বাদশাহদের মতো যুদ্ধ করে রক্তবন্যা বইয়ে যারা দেশ জয় করে, তারা আসল বিজয়ী নয়। কোনো অস্ত্র, সেপাই বা জয়পতাকা ছাড়াই যারা নিজেদের বোঝা বয়ে মরুভূমি, মেরুপ্রদেশ কিংবা আকাশছোঁয়া পাহাড় জয় করে—তারাই প্রকৃতির প্রকৃত সন্তান।
- ভয়হীন অভিযাত্রী:“সবার চেয়ে মানুষ ভীষণ; সেই মানুষের ভয় / ব্যাঘাত তাদের নয়। / তারাই ভূমির বরপুত্র, তাদের ডেকে কই, / তোমরা পৃথ্বীজয়ী।”— মানুষের নিষ্ঠুরতা বা ভয়ংকর রূপও এই নির্ভীক অভিযাত্রীদের যাত্রাকে আটকাতে পারে না। পৃথিবীর প্রকৃত ‘বরপুত্র’ বা বিজয়ী তারাই—যারা সমস্ত বাধাকে জয় করে পথকে আপন করে নিয়েছে।


![রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা [ ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – Ramkanaiyer Nirbuddhita by Rabindranath Tagore রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা ramkanaiyer nirbuddhita [ ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/08/রামকানাইয়ের-নির্বুদ্ধিতা-1024x576.gif)




![ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের ‘সুখ স্বপ্ন’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুখ স্বপ্ন sukh swapna [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/সুখ-স্বপ্ন-sukh-swapna-কবিতা--1024x536.gif)