বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সানাই’ (১৯৪০) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত গভীর, দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক কবিতা হলো ‘নারী’। এই কবিতায় ধরণীর বুকে নারীর চিরন্তন সৌন্দর্য, পুরুষের অন্তরের শূন্যতা পূরণে তার ভূমিকা এবং শিল্পের মাধ্যমে নারীর সেই অধরা রূপকে ধরে রাখার যে চিরন্তন সাধনা, তা অপূর্ব ভাষায় বর্ণিত হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | নারী |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | সানাই |
| প্রকাশের বছর | ১৯৪০ (১৩৪৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সৌন্দর্যতাত্ত্বিক কবিতা (Philosophical, Psychological and Aesthetic Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থে কবি জীবনের পরিণত দৃষ্টিতে প্রেম, নারী ও শিল্পের অন্তর্নিহিত সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করেছেন। ‘নারী’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে, আদিম ও স্পর্ধিত পুরুষকে বশ করার জন্যই বিধাতা যেন নারীর মধ্যে এক অদ্ভুত আনন্দরস ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন। পুরুষ চিরকাল তার শিল্পে, কাব্যে ও ভাস্কর্যে নারীর সেই পলাতক লাবণ্যকে ধরে রাখতে চেয়েছে। সমাজের সমস্ত কৃত্রিম বাধা, শাস্ত্র ও সংকোচের ঊর্ধ্বে উঠে পুরুষ নারীর রূপের মাঝেই স্বর্গের সুধা অন্বেষণ করেছে এবং রূপের সাথে অরূপের (formless/spiritual) এক মহাজাগতিক মিলন ঘটিয়েছে।
নারী – সম্পূর্ণ কবিতা
স্বাতন্ত্র স্পর্ধায় মত্ত পুরুষেরে করিবারে বশ
যে-আনন্দরস
রূপ ধরেছিল রমণীতে,
ধরণীর ধমনীতে
তুলেছিল চাঞ্চল্যের দোল
রক্তিম হিল্লোল,
সেই আদি ধ্যানমূর্তিটিরে
সন্ধান করিছে ফিরে ফিরে
রূপকার মনে-মনে
বিধাতার তপস্যার সংগোপনে।
পলাতকা লাবণ্য তাহার
বাঁধিবারে চেয়েছে সে আপন সৃষ্টিতে
প্রত্যক্ষ দৃষ্টিতে।
দুর্বাধ্য প্রস্তরপিন্ডে দুঃসাধ্য সাধনা
সিংহাসন করেছে রচনা
অধরাকে করিতে আপন
চিরন্তন।
সংসারের ব্যবহারে যত লজ্জা ভয়
সংকোচ সংশয়,
শাস্ত্রবচনের ঘের,
ব্যবধান বিধিবিধানের
সকলি ফেলিয়া দূরে
ভোগের অতীত মূল সুরে
নগ্নতা করেছে শুচি,
দিয়ে তারে ভুবনমোহিনী শুভ্ররুচি।
পুরুষের অনন্ত বেদন
মর্তের মদিরা-মাঝে স্বর্গের সুধারে অন্বেষণ।
তারি চিহ্ন যেখানে-সেখানে
কাব্যে গানে,
ছবিতে মূর্তিতে,
দেবালয়ে দেবীর স্তুতিতে।
কালে কালে দেশে দেশে শিল্পস্বপ্নে দেখে রূপখানি,
নাহি তাহে প্রত্যহের গ্লানি।
দুর্বলতা নাহি তাহে, নাহি ক্লান্তি–
টানি লয়ে বিশ্বের সকল কান্তি
আদিস্বর্গলোক হতে নির্বাসিত পুরুষের মন
রূপ আর অরূপের ঘটায় মিলন।
উদ্ভাসিত ছিলে তুমি, অয়ি নারী, অপূর্ব আলোকে
সেই পূর্ণ লোকে–
সেই ছবি আনিতেছ ধ্যান ভরি
বিচ্ছেদের মহিমায় বিরহীর নিত্যসহচরী।
Nari — Sampurna Kobita
Swatantra spordhay matto purushere koribare bosh
“`
je-anandarosh
rup dhorechhilo ramanite,
dhoronir dhamonite
tulechhilo chancholyer dol
raktim hillol,
sei adi dhyanmurtitire
sondhan korichhe phire phire
rupokar mone-mone
Bidhatar tapasya-r sangopone.
Palataka labannya tahar
bandhibare cheyechhe se apon srishtite
pratyaksha drishtite.
Durbadhya prostorpinde dushsadhya sadhona
singhasan korechhe rachana
adharake korite apon
chirantan.
Songsarer byabahare joto lojja bhoy
sankoch sanshay,
shastrobochoner gher,
byabodhan bidhibidhaner
sokoli feliya dure
bhoger otit mul sure
nagnata korechhe shuchi,
diye tare bhubonmohini shubhroruchi.
Purusher ananta bedon
mortrer modira-majhe swarger sudhare anbesan.
tari chihna jekhane-sekhane
kabye gane,
chhobite murtite,
debalaye debir stutite.
kale kale deshe deshe shilposwapne dekhe rupkhani,
nahi tahe protyoher glani.
Durbalata nahi tahe, nahi klanti—
tani loye bishwer sokol kanti
adiswargalok hote nirbashito purusher mon
rup ar aruper ghotay milon.
udbhasito chile tumi, oyi nari, apurbo aloke
sei purno loke—
sei chhobi anitechho dhyan bhori
bichchheder mohimay birahir nityoshohochori.
- পুরুষের চাঞ্চল্য ও শিল্পের সাধনা:“স্বাতন্ত্র স্পর্ধায় মত্ত পুরুষেরে করিবারে বশ / যে-আনন্দরস / রূপ ধরেছিল রমণীতে… পলাতকা লাবণ্য তাহার / বাঁধিবারে চেয়েছে সে আপন সৃষ্টিতে”— অহংকারী ও স্পর্ধিত পুরুষকে বশ করার জন্যই প্রকৃতি বা বিধাতা নারীর মধ্যে এক অপূর্ব আনন্দরস দিয়েছিলেন। কিন্তু নারী চিরকালই এক অধরা ও পলাতক লাবণ্যের অধিকারী। তাই পুরুষ বা রূপকার পাথর কুঁদে, ভাস্কর্য বানিয়ে সেই অধরা নারীকে চিরন্তনভাবে নিজের সৃষ্টিতে বেঁধে রাখতে চেয়েছে।
- শাস্ত্রের ঊর্ধ্বে সৌন্দর্য ও স্বর্গের তৃষ্ণা:“সংসারের ব্যবহারে যত লজ্জা ভয় / সংকোচ সংশয়, / শাস্ত্রবচনের ঘের… সকলি ফেলিয়া দূরে / ভোগের অতীত মূল সুরে / নগ্নতা করেছে শুচি,”— শিল্পের জগতে রূপকার সমাজের সমস্ত ভয়, শাস্ত্রের বিধিবিধান এবং কৃত্রিমতাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। সে নারীর প্রকৃত, অনাবৃত সৌন্দর্যকে ভোগের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে পবিত্র করেছে। কারণ পুরুষের অনন্ত সাধনা হলো এই মর্ত্যের বা পৃথিবীর রূপ-মদিরার মাঝেই স্বর্গের সুধাকে খুঁজে পাওয়া।
- রূপ ও অরূপের মিলন:“টানি লয়ে বিশ্বের সকল কান্তি / আদিস্বর্গলোক হতে নির্বাসিত পুরুষের মন / রূপ আর অরূপের ঘটায় মিলন।”— যুগে যুগে দেশে দেশে শিল্পীরা কাব্যে, গানে বা দেবালয়ের স্তুতিতে নারীর এই নিষ্কলঙ্ক রূপকে খুঁজেছে, যেখানে কোনো ক্লান্তি বা প্রাত্যহিক জীবনের গ্লানি নেই। আদিস্বর্গ থেকে নির্বাসিত পুরুষের মন নারীর এই মহিমান্বিত রূপের মাধ্যমেই মর্ত্যের ‘রূপ’ (Physical form) এবং স্বর্গের ‘অরূপ’-এর (Spiritual/formless) মধ্যে এক পরম মিলন ঘটিয়েছে। নারী তাই বিচ্ছেদের জগতেও বিরহী পুরুষের ধ্যানের নিত্যসহচরী।

![সম্পত্তি সমর্পণ [ ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – Sompotti somorpon by Rabindranath Tagore সম্পত্তি সমর্পণ sompotti somorpon [ ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/08/সম্পত্তি-সমর্পণ-1024x576.gif)



![সম্ভাষণ কবিতা [ Sombhashon Kobita ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 2 সম্ভাষণ কবিতা [ Sombhashon Kobita ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/সম্ভাষণ-কবিতা-Sombhashon-Kobita--1024x536.gif)
![পরিচয় কবিতা [ Porichoy Kobita ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 3 পরিচয় কবিতা [ Porichoy Kobita ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/পরিচয়-কবিতা-Porichoy-Kobita--1024x536.gif)

![শাস্তি ছোটগল্প [ গল্পগুচ্ছ ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – Shasti Chotogolpo by Rabindranath Tagore শাস্তি ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । shasti । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/08/শাস্তি-ছোটগল্প-1024x576.gif)