আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

নীলমণিলতা nilmonilota [ কবিতা ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

নীলমণিলতা

-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কাব্যগ্রন্থ : পুনশ্চ [ ১৯৩২ ]

কবিতার শিরনামঃ নীলমণিলতা 

নীলমণিলতা nilmonilota [ কবিতা ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শান্তিনিকেতন উত্তরায়ণের একটি কোণের বাড়িতে আমার বাসা ছিল। এই বাসার অঙ্গনে আমার পরলোকগত বন্ধু পিয়র্সন একটি বিদেশী গাছের চারা রোপণ করেছিলেন। অনেককাল অপেক্ষার পরে নীলফুলের স্তবকে স্তবকে একদিন সে আপনার অজস্র পরিচয় অবারিত করলে। নীল রঙে আমার গভীর আনন্দ, তাই এই ফুলের বাণী আমার যাতায়াতের পথে প্রতিদিন আমাকে ডাক দিয়ে বারে বারে স্তব্ধ করেছে। আমার দিক থেকে কবিরও কিছু বলবার ইচ্ছে হত কিন্তু নাম না পেলে সম্ভাষণ করা চলে না। তাই লতাটির নাম দিয়েছি নীলমণিলতা।

উপযুক্ত অনুষ্ঠানের দ্বারা সেই নামকরণটি পাকা করবার জন্যে এই কবিতা। নীলমণি ফুল যেখানে চোখের সামনে ফোটে  সেখানে নামের দরকার হয় নি, কিন্তু একদা অবসানপ্রায় বসন্তের দিনে দূরে ছিলুম, সেদিন রূপের স্মৃতি নামের দাবি করলে। ভক্ত ১০১ নামে দেবতাকে ডাকে সে শুধু বিরহের আকাশকে পরিপূর্ণ করবার জন্যে।

ফাল্গুনমাধুরী তার চরণের মঞ্জীরে মঞ্জীরে

নীলমণিমঞ্জরির গুঞ্জন বাজায়ে দিল কি রে।

             আকাশ যে মৌনভার

             বহিতে পারে না আর,

নীলিমাবন্যায় শূন্যে উচ্ছলে অনন্ত ব্যাকুলতা ,

তারি ধারা পুষ্পপাত্রে ভরি নিল নীলমণিলতা।

পৃথ্বী গভীর মৌন দূর শৈলে ফেলে নীল ছায়া,

মধ্যাহ্নমরীচিকায় দিগন্তে খোঁজে সে স্বপ্নমায়া।

         যে মৌন নিজেরে চায়

         সমুদ্রের নীলিমায়,

অন্তহীন সেই মৌন উচ্ছ্বসিল নীলগুচ্ছ ফুলে,

দুর্গম রহস্য তার উঠিল সহজ ছন্দে দুলে।

 

আসন্ন মিলনাশ্বাসে বধূর কম্পিত তনুখানি

নীলাম্বর-অঞ্চলের গুণ্ঠনে সঞ্চিত করে বাণী।

         মর্মের নির্বাক কথা

         পায় তার নিঃসীমতা

নিবিড় নির্মল নীলে; আনন্দের সেই নীল দ্যুতি

নীলমণিমঞ্জরির পুঞ্জে পুঞ্জে প্রকাশে আকূতি।

অজানা পান্থের মতো ডাক দিলে অতিথির ডাকে,

অপরূপ পুষ্পোচ্ছ্বাসে হে লতা, চিনালে আপনাকে।

         বেল জুঁই শেফালিরে

         জানি আমি ফিরে ফিরে,

কত ফাল্গুনের, কত শ্রাবণের, আশ্বিনের ভাষা

তারা তো এনেছে চিত্তে, রঙিন করেছে ভালোবাসা।

চাঁপার কাঞ্চন-আভা সে-যে কার কণ্ঠস্বরে সাধা,

নাগকেশরের গন্ধ সে-যে কোন্‌ বেণীবন্ধে বাঁধা।

         বাদলের চামেলি-যে

         কালো আঁখিজলে ভিজে,

করবীর রাঙা রঙ কঙ্কণঝংকারসুরে মাখা,

কদম্বকেশরগুলি নিদ্রাহীন বেদনায় আঁকা।

তুমি সুদুরের দূতী, নূতন এসেছ নীলমণি,

স্বচ্ছ নীলাম্বরসম নির্মল তোমার কণ্ঠধ্বনি।

           যেন ইতিহাসজালে

           বাঁধা নহ দেশে কালে,

যেন তুমি দৈববাণী বিচিত্র বিশ্বের মাঝখানে,

পরিচয়হীন তব আবির্ভাব, কেন এ কে জানে।

“কেন এ কে জানে– এই মন্ত্র আজি মোর মনে জাগে;

তাই তো ছন্দের মালা গাঁথি অকারণ অনুরাগে।

           বসন্তের নানা ফুলে

           গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলে,

আম্রবনে ছায়া কাঁপে মৌমাছির গুঞ্জরণগানে;

মেলে অপরূপ ডানা প্রজাপতি , কেন এ কে জানে।

 

কেন এ কে জানে এত বর্ণগন্ধরসের উল্লাস,

প্রাণের মহিমাছবি রুপের গৌরবে পরকাশ।

           যেদিন বিতানচ্ছায়ে

           মধ্যাহ্নের মন্দবায়ে

ময়ুর আশ্রয়ে নিল, তোমারে তাহারে একখানে

দেখিলাম চেয়ে চেয়ে, কহিলাম, “কেন এ কে জানে।’

অভ্যাসের সীমা-টানা চৈতন্যের সংকীর্ণ সংকোচে

ঔদাস্যের ধুলা ওড়ে, আঁখির বিস্ময়রস ঘোচে।

           মন জড়তায় ঠেকে,

           নিখিলেরে জীর্ণ দেখে,

হেনকালে হে নবীন, তুমি এসে কী বলিলে কানে;

বিশ্বপানে চাহিলাম, কহিলাম, “কেন এ কে জানে।’

আমি আজ কোথা আছি, প্রবাসে অতিথিশালা মাঝে।

তব নীললাবণ্যের বংশীধ্বনি দূর শূন্যে বাজে।

           আসে বৎসরের শেষ,

           চৈত্র ধরে ম্লান বেশ,

হয়তো বা রিক্ত তুমি ফুল ফোটাবার অবসানে,

তবু, হে অপূর্ব রূপ, দেখা দিলে কেন যে কে জানে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত