বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য রচনার অন্ত্যপর্বের একটি অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর, প্রকৃতি-ভাবনামূলক ও গভীর দার্শনিক সৃষ্টি হলো ‘আমাকে এনে দিল এই বুনো চারাগাছটি’। ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত এই কবিতায় একটি সাধারণ বুনো চারাগাছ ও তার নামহীন ফুলের মধ্য দিয়ে বিশ্বপ্রকৃতির অসীম রহস্য, মহাকালের দীর্ঘ প্রবাহ এবং ক্ষুদ্র জীবনের সাথে বৃহৎ ইতিহাসের এক অপূর্ব যোগসূত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | আমাকে এনে দিল এই বুনো চারাগাছটি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পত্রপুট |
| প্রকাশের বছর | ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ / ১৯৩৬ খ্রীস্টাব্দ (রচনাকাল: ৫ নভেম্বর, ১৯৩৫) |
| কবিতার ধরন | প্রকৃতিচেতনা ও দার্শনিক লিরিক কবিতা (Nature and Philosophical Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থটি গদ্যছন্দের অবাধ ব্যবহারের মাধ্যমে রচিত তাঁর জীবনের এক পরিণত মননশীল সৃষ্টি। এসময়ের কবিতায় কবি বিশ্বচরাচরের ছোট-বড় প্রতিটি উপাদানের মাঝে মহাকালের অনন্ত স্পন্দন ও বিশ্বপ্রকৃতির নিগূঢ় রূপ খুঁজে পেয়েছেন। ‘আমাকে এনে দিল এই বুনো চারাগাছটি’ কবিতায় কবি একটি অখ্যাত বুনো চারা ও তার দেওয়া ‘পেয়ালী’ নামকরণের মাধ্যমে প্রকৃতির স্বাধীন সত্তা এবং কোটি কোটি বছরের বিবর্তন ও সৃষ্টির ইতিহাসকে অত্যন্ত সহজ ও গভীর উপলব্ধিতে তুলে ধরেছেন।
আমাকে এনে দিল এই বুনো চারাগাছটি – সম্পূর্ণ কবিতা
আমাকে এনে দিল এই বুনো চারাগাছটি।
পাতার রং হলদে সবুজ,
ফুলগুলি যেন আলো পান করবার
শিল্প-করা পেয়ালা, বেগুনি রঙের।
প্রশ্ন করি, নাম কী,
জবাব নেই কোনোখানে।
ও আছে বিশ্বের অসীম অপরিচিতের মহলে
যেখানে আছে আকাশের নামহারা তারা।
আমি ওকে ধ’রে এনেছি একটি ডাক-নামে
আমার একলা জানার নিভৃতে।
ওর নাম পেয়ালী।
বাগানের নিমন্ত্রণে এসেছে ডালিয়া, এসেছে ফুশিয়া,
এসেছে ম্যারিগোল্ড্,
ও আছে অনাদরের অচিহ্নিত স্বাধীনতায়,
জাতে বাঁধা পড়েনি।
ও বাউল, ও অসামাজিক।
देखते [देखते] দেখতে ঐ খসে পড়ল ফুল।
যে শব্দটুকু হোলো বাতাসে
কানে এল না।
ওর কুষ্ঠির রাশিচক্র যে নিমেষগুলির সমবায়ে
অণুপরিমাণ তার অঙ্ক,
ওর বুকের গভীরে যে মধু আছে
কণাপরিমাণ তার বিন্দু।
একটুকু কালের মধ্যে সম্পূর্ণ ওর যাত্রা,
একটি কল্পে যেমন সম্পূর্ণ
আগুনের পাপড়ি-মেলা সূর্যের বিকাশ।
ওর ইতিহাসটুকু অতি ছোটো পাতার কোণে
বিশ্ব-লিপিকারের অতি ছোটো কলমে লেখা।
তবু তারই সঙ্গে সঙ্গে উদ্ঘাটিত হচ্ছে বৃহৎ ইতিহাস।
দৃষ্টি চলে না এক পৃষ্ঠা থেকে অন্য পৃষ্ঠায়।
শতাব্দীর যে নিরন্তর স্রোত বয়ে চলেছে
বিলম্বিত তালের তরঙ্গের মতো,
যে ধারায় উঠল নামল কত শৈলশ্রেণী,
সাগরে মরুতে কত হোলো বেশ পরিবর্তন,
সেই নিরবধি কালেরই দীর্ঘ প্রবাহে এগিয়ে এসেছে
এই ছোটো ফুলটির আদিম সংকল্প
সৃষ্টির ঘাতপ্রতিঘাতে।
লক্ষ লক্ষ বৎসর এই ফুলের ফোটা-ঝরার পথে
সেই পুরাতন সংকল্প রয়েছে নূতন, রয়েছে সজীব সচল,
ওর শেষ সমাপ্ত ছবি আজও দেয়নি দেখা।
এই দেহহীন সংকল্প, সেই রেখাহীন ছবি
নিত্য হয়ে আছে কোন্ অদৃশ্যের ধ্যানে।
যে অদৃশ্যের অন্তহীন কল্পনায় আমি আছি,
যে অদৃশ্যে বিধৃত সকল মানুষের ইতিহাস
অতীতে ভবিষ্যতে॥
Romanized Version
Amake ene dilo ei buno charagashti.
Patar rong holde sobuj,
Phulguli jeno alo pan korbar
Shilpo-kora peyala, beguni ronger.
Proshno kori, nam ki,
Jobab nei konokhane.
O achhe bishwer oshim oporichiter mohole
Jekhane achhe akasher namhara tara.
Ami oke dhore enechi ekti dak-name
Amar ekla janar nibhrite.
O-r nam peyali.
Baganer nimontrone eseche daliya, eseche fushiya,
Eseche marigold,
O achhe onadorer ochinhinito shadhinotay,
Jate badha poreni.
O baul, o ashamajik.
Dekhte dekhte oi khose porlo phul.
Je shobdotuku holo batashe
Kane elo na.
Or kushthir rashichokro je nimesh-guli re somobaye
Onu-poriman tar onko,
Or buker gobhire je modhu ache
Kona-poriman tar bindu.
Ektuku kaler modhye shompurno or jatra,
Ekti kolpe jemon shompurno
Aguner papri-mela shurjer bikash.
Or itihas-tuku oti chhoto patar kone
Bishwo-lipikarer oti chhoto kolome lekha.
Tobu tari shonge shonge udghatito hocchhe brihot itihash.
Drishti chole na ek prishtha theke onyo prishthay.
Shotabdiyer je nirotor srot boye choleche
Bilombito taler toronger moto,
Je dharay uthlo namlo koto shoiloshreni,
Shagore morute koto holo besh poriborton,
Sei nirobodhi kaler-i dirgho probhahe egiye eseche
Ei chhoto phultir adim shongkolpo
Srishtir ghāt-protighate.
Lokkho lokkho bocchor ei phuler fota-jhorar pothe
Sei puraton shongkolpo royeche nuton, royeche sojib sochol,
Or shesh shomapto chhobi ajou deyni dekha.
Ei dehin shongkolpo, sei rekhahin chhobi
Nitto hoye ache kon odrishyer dhyane.
Je odrishyer ontehin kolponay ami achhi,
Je odrishyete bidhrito shokol manuser itihash
Otite vobishyote.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
বুনো গাছের অসামাজিক ও স্বাধীন সত্তা:
“বাগানের নিমন্ত্রণে এসেছে ডালিয়া, এসেছে ফুশিয়া, / এসেছে ম্যারিগোল্ড্, / ও আছে অনাদরের অচিহ্নিত স্বাধীনতায়, / জাতে বাঁধা পড়েনি। / ও বাউল, ও অসামাজিক।”— বাগানের সুবিন্যস্ত ও চর্চিত ফুলের ভিড়ে বুনো গাছ বা ‘পেয়ালী’ হলো সম্পূর্ণ স্বাধীন, জাতে না-বাঁধা এক বাউল ও অসামাজিক সত্তা, যা প্রকৃতির আপন খেয়ালে বেড়ে ওঠে।
ক্ষুদ্র প্রাণের সাথে মহাকালের অনন্ত ধারা:
“ওর ইতিহাসটুকু অতি ছোটো পাতার কোণে / বিশ্ব-লিপিকারের অতি ছোটো কলমে লেখা। / তবু তারই সঙ্গে সঙ্গে উদ্ঘাটিত হচ্ছে বৃহৎ ইতিহাস।”— একটি ছোট্ট বুনো ফুলের জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও ক্ষুদ্র হলেও, তার সৃষ্টির পেছনে রয়েছে লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তন ও মহাকালের এক দীর্ঘ ধারা। ক্ষুদ্রাতিত ক্ষুদ্র এই প্রাণের মাঝেও সমগ্র মহাবিশ্বের বৃহৎ ইতিহাস ও আদিম সংকল্প নিহিত রয়েছে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পত্রপুট কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।
![পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের ‘আমাকে এনে দিল এই বুনো চারাগাছটি’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 আমাকে এনে দিল এই বুনো চারাগাছটি [ পুত্রপুট কাব্যগ্রন্থ ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/আমাকে-এনে-দিল-এই-বুনো-চারাগাছটি.gif)