রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের ‘এই দেহখানা বহন করে আসছে দীর্ঘকাল’ একটি গভীর আত্মজিজ্ঞাসামূলক ও আধ্যাত্মিক কবিতা। এখানে কবি মানুষের দেহ, মন, কামনা, ভয়, অহংকার ও দৈনন্দিন জীবনের আবিলতার আড়ালে থাকা অন্তরের সত্যকে অনুসন্ধান করেছেন।
কবিতার শুরুতে মানুষের দেহকে দীর্ঘকাল ধরে বহন করে চলা অসংখ্য ক্ষুদ্র অনুভূতি, রাগ, দ্বেষ, ভয়, ভাবনা ও কামনার আবর্জনার আধার হিসেবে দেখা হয়েছে। এই আবরণ আত্মার মুক্ত রূপকে বারবার আচ্ছন্ন করে। কিন্তু কবিতাটি কেবল দেহের সীমাবদ্ধতার কথা বলে থেমে থাকে না; সূর্যের জ্যোতি, বৈদিক ঋষির প্রার্থনা এবং মানবসভ্যতার দীর্ঘ আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে কবি পৌঁছান মানুষের অন্তর্নিহিত সত্য ও মহত্তর সত্তার ধারণায়।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| কবিতার নাম | এই দেহখানা বহন করে আসছে দীর্ঘকাল |
| কাব্যগ্রন্থ | পত্রপুট |
| কবি | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| রচনার স্থান | শান্তিনিকেতন |
| রচনার তারিখ | ৭ নভেম্বর, ১৯৩৫ |
| কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ | ২৫ বৈশাখ ১৩৪৩ / ১৯৩৬ |
| কাব্যগ্রন্থের কবিতা | মোট ১৮টি |
| কাব্যগ্রন্থের পর্ব | রবীন্দ্রনাথের অন্ত্যপর্বের কাব্যরচনা |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ের কবিতায় মানুষের অন্তর্জগৎ, মৃত্যু, আত্মপরিচয়, বিশ্বমানবতা এবং আধ্যাত্মিক সত্যের অনুসন্ধানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। পত্রপুট সেই অন্ত্যপর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ।
‘এই দেহখানা বহন করে আসছে দীর্ঘকাল’ কবিতাটি ৭ নভেম্বর ১৯৩৫ তারিখে শান্তিনিকেতনে রচিত। কবিতার ভাবপ্রবাহ ব্যক্তিগত আত্মসমীক্ষা থেকে ক্রমে বৈদিক মন্ত্র, সূর্যদেবতা এবং প্রাচীন মানবসভ্যতার আধ্যাত্মিক উপলব্ধির দিকে বিস্তৃত হয়েছে।
এখানে ‘দেহ’ কেবল শারীরিক অস্তিত্ব নয়; এটি মানুষের পার্থিব পরিচয়, ক্ষুদ্র আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক আবরণের প্রতীক। এর বিপরীতে ‘অন্তরতম সত্য’ হলো সেই গভীর সত্তা, যা বাহ্যিক আবরণ অতিক্রম করে বৃহত্তর বিশ্বসত্তার সঙ্গে যুক্ত।
সম্পূর্ণ কবিতা
এই দেহখানা বহন করে আসছে দীর্ঘকাল
এই দেহখানা বহন ক’রে আসছে দীর্ঘকাল
বহু ক্ষুদ্র মুহূর্তের রাগ দ্বেষ ভয় ভাবনা,
কামনার আবর্জনারাশি।
এর আবিল আবরণে বারে বারে ঢাকা পড়ে
আত্মার মুক্ত রূপ।
এ সত্যের মুখোষ প’রে সত্যকে আড়ালে রাখে;
মৃত্যুর কাদামাটিতেই গড়ে আপনার পুতুল,
তবু তার মধ্যে মৃত্যুর আভাস পেলেই
নালিশ করে আর্তকণ্ঠে।
খেলা করে নিজেকে ভোলাতে,
কেবলি ভুলতে চায় যে সেটা খেলা।
প্রাণপণ সঞ্চয়ে রচনা করে মরণের অর্ঘ্য;
স্তুতিনিন্দার বাষ্পবুদ্বুদে ফেনিল হয়ে
পাক খায় ওর হাসিকান্নার আবর্ত।
বক্ষ ভেদ ক’রে ও হাউয়ের আগুন দেয় ছুটিয়ে,
শূন্যের কাছ থেকে ফিরে পায় ছাই,—
দিনে দিনে তাই করে স্তূপাকার।
প্রতিদিন যে প্রভাতে পৃথিবী
প্রথম সৃষ্টির অক্লান্ত নির্মল দেববেশে দেয় দেখা,
আমি তা’র উন্মীলিত আলোকের অনুসরণ ক’রে
অন্বেষণ করি আপন অন্তরলোক।
অসংখ্য দণ্ড পল নিমেষের জটিল মলিন জালে বিজড়িত
দেহটাকে সরিয়ে ফেলি মনের থেকে,—
যেখানে স’রে যায় অন্ধকার রাতের
নানা ব্যর্থ ভাবনার অত্যুক্তি,
যায় বিস্মৃত দিনের অনবধানে পুঞ্জিত লেখন যত,—
সেই সব নিমন্ত্রণ-লিপি নীরব যার আহ্বান,
নিঃশেষিত যার প্রত্যুত্তর।
তখন মনে পড়ে, সবিতা,
তোমার কাছে ঋষি-কবির প্রার্থনা মন্ত্র,—
যে মন্ত্রে বলেছিলেন,—হে পূষণ,
তোমার হিরন্ময় পাত্রে সত্যের মুখ আচ্ছন্ন,
উন্মুক্ত করো সেই আবরণ।
আমিও প্রতিদিন উদয়দিগ্বলয় থেকে বিচ্ছুরিত রশ্মিচ্ছটায়
প্রসারিত ক’রে দিই আমার জাগরণ,
বলি,—হে সবিতা,
সরিয়ে দাও আমার এই দেহ, এই আচ্ছাদন,—
তোমার তেজোময় অঙ্গের সূক্ষ্ম অগ্নিকণায়
রচিত যে-আমার দেহের অণু পরমাণু,
তারো অলক্ষ্য অন্তরে আছে তোমার কল্যাণতম রূপ,
তাই প্রকাশিত হোক আমার নিরাবিল দৃষ্টিতে
আমার অন্তরতম সত্য
আদি যুগে অব্যক্ত পৃথিবীর সঙ্গে
তোমার বিরাটে ছিল বিলীন
সেই সত্য তোমারি।
তোমার জ্যোতির স্তিমিত কেন্দ্রে মানুষ
আপনার মহৎস্বরূপকে দেখেছে কালে কালে,
কখনো নীল মহানদীর তীরে,
কখনো পারস্যসাগরের কূলে,
কখনো হিমাদ্রি-গিরিতটে,—
বলেছে, জেনেছি আমরা অমৃতের পুত্র,
বলেছে, দেখেছি অন্ধকারের পার হতে
আদিত্যবর্ণ মহান পুরুষের আবির্ভাব।
শান্তিনিকেতন
৭ নভেম্বর, ১৯৩৫
Romanized Version
Ei Dehokhāna Bôhon Kore Āschhe Dīrghakāl
Ei dehokhāna bôhon kore āschhe dīrghakāl
Bôhu kṣudro muhūrter rāg dbeṣ bhoy bhābnā,
Kāmanār ābôrjonārāśi.
Er ābil ābôrône bāre bāre ḍhākā pôṛe
Ātmār mukto rūp.
E sotyer mukhoṣ pôre sotyoke āṛāle rākhē;
Mṛtyur kādāmāṭitei goṛe āpnār putul,
Tobu tār modhye mṛtyur ābhās pele-i
Nāliś kore ārto-kônṭhe.
Khelā kore nijeke bholāte,
Keboli bhulte chāy je seṭā khelā.
Prāṇpaṇ sonchoye rochonā kore môrôṇer ôrghyo;
Stutininder bāṣpobudbude phenil hoye
Pāk khāy or hāsi-kānnār ābôrto.
Bôkṣo bhed kore o hāuyer āgun dey chuṭiye,
Śūnyer kāch theke phire pāy chhāi,—
Dine dine tāi kore stupākār.
Protidin je prabhāte prithibī
Prothom sṛṣṭir ôklānto nirmol debobeśe dey dekhā,
Āmi tār unmīlit āloker ônusôron kore
Onbeṣôṇ kori āpnār ôntôrlok.
Ôsongkho dônḍo pôl nimiṣer joṭil molin jāle bijṛito
Dehoṭāke soriye phēli moner theke,—
Jekhāne sore yāy ôndhokār rāter
Nānā byôrtho bhābnār ôtyukti,
Yāy bismṛito diner ônôbôdhāne puñjito lekhan yôto,—
Sei sob nimôṇtroṇ-lipi nīrob yār āhvān,
Niḥśeṣito yār prôtyuttor.
Tôkhon mone pôṛe, Sobitā,
Tomār kāchhe ṛṣi-kobir prārthonā môntra,—
Je montre bolechhilen,—he Pūṣôṇ,
Tomār hiranmôy pātre sotyer mukh āchhônno,
Unmukto koro sei ābôrôṇ.
Āmio protidin uday-digboloy theke bichchurito rośmichhaṭāy
Prôsārito kore di āmār jāgôroṇ,
Boli,—he Sobitā,
Soriye dāo āmār ei deho, ei āchhādon,—
Tomār tejomoy ôṅger sūkṣmo ôgnikaṇāy
Rochito je-āmār deher ôṇu pôromāṇu,
Tāro ôlôkṣyo ôntôre āchhe tomār kôlyāṇotôm rūp,
Tāi prôkāśito hok āmār nirābil dṛṣṭite
Āmār ôntôrotôm sotyo
Ādi juge ôbyôkto prithibīr sôṅge
Tomār birāṭe chhilo bilīn
Sei sotyo tomāri.
Tomār jyotir stimito kendre mānuṣ
Āpnār môhôtsôrūpke dekhechhe kāle kāle,
Kôkhono nīl mohānôdīr tīre,
Kôkhono Pārsyo-sāgôrer kūle,
Kôkhono Himādri-giritôṭe,—
Bôlechhe, jenechhi āmra ômṛter putro,
Bôlechhe, dekhechhi ôndhokārer pār hote
Ādityôborṇo mohān puruṣer ābirbhāb.
Śāntiniketan
7 November, 1935
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
১. দেহের মধ্যে জমে থাকা পার্থিব আবর্জনা
কবিতার শুরুতেই দেহকে মানুষের দীর্ঘ জীবনের বহনকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। রাগ, দ্বেষ, ভয়, ভাবনা এবং কামনা—অসংখ্য ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা দেহ ও মনের উপর স্তর তৈরি করে।
“এর আবিল আবরণে বারে বারে ঢাকা পড়ে
আত্মার মুক্ত রূপ।”
এখানে ‘আবিল আবরণ’ মানুষের প্রকৃত সত্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখা পার্থিব ও মানসিক স্তরের প্রতীক।
২. সত্যের মুখোশ
মানুষ অনেক সময় সত্যের মুখোশ পরেই সত্যকে আড়াল করে। নিজের তৈরি পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা ও ভোগের জগৎকে বাস্তব মনে করতে করতে মানুষ ভুলে যায় তার অস্তিত্বের গভীরতর সত্য।
“এ সত্যের মুখোষ প’রে সত্যকে আড়ালে রাখে”
এই পংক্তিটি কবিতার আত্মঅনুসন্ধানের অন্যতম কেন্দ্রীয় বক্তব্য।
৩. মৃত্যুর সঙ্গে মানুষের বিরোধ
মানুষ জানে তার জীবন নশ্বর। অথচ নিজের তৈরি পার্থিব জগতের মধ্যে মৃত্যুর সামান্য আভাস পেলেই সে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।
“মৃত্যুর কাদামাটিতেই গড়ে আপনার পুতুল,
তবু তার মধ্যে মৃত্যুর আভাস পেলেই
নালিশ করে আর্তকণ্ঠে।”
মানুষ নিজেই নশ্বর জগৎ নির্মাণ করে, আবার সেই নশ্বরতার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করে—এই দ্বন্দ্ব কবিতায় তীব্রভাবে প্রকাশিত।
৪. জীবনের খেলাকে সত্য বলে ভুল করা
“খেলা করে নিজেকে ভোলাতে,
কেবলি ভুলতে চায় যে সেটা খেলা।”
জীবনের পার্থিব ব্যস্ততা, সঞ্চয়, সম্মান, সম্পর্ক ও উদ্বেগকে মানুষ এত গভীরভাবে গ্রহণ করে যে সেগুলোর সাময়িক চরিত্র ভুলে যায়।
৫. সঞ্চয়ের অন্তিম পরিণতি
মানুষ প্রাণপণে সঞ্চয় করে, অথচ সেই সঞ্চয়ের চূড়ান্ত পরিণতি মৃত্যু। তাই কবি বলেন—
“প্রাণপণ সঞ্চয়ে রচনা করে মরণের অর্ঘ্য”
এখানে সঞ্চয় শুধু অর্থসম্পদের অর্থে নয়; জীবনের সমস্ত জমা অভিজ্ঞতা, অহংকার ও অর্জনের প্রতীক হিসেবেও পড়া যায়।
৬. আত্মবিস্মৃতি থেকে অন্তরলোকের দিকে
কবিতার মাঝামাঝি এসে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে। বাহ্যিক দেহ ও তার জটিলতা থেকে কবি ফিরে তাকান অন্তরের দিকে।
প্রতিদিনের প্রভাতকে তিনি দেখেন “প্রথম সৃষ্টির” নির্মলতার প্রতীক হিসেবে। সেই আলোর অনুসরণ করে তিনি অন্বেষণ করেন—
“আপন অন্তরলোক।”
অর্থাৎ বাহ্যিক পৃথিবীর আলো অন্তরের সত্য অনুসন্ধানের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে।
৭. মনের আবর্জনা সরিয়ে ফেলা
দেহকে সরিয়ে মনকে মুক্ত করার যে চিত্র কবি দিয়েছেন, তা এক ধরনের আধ্যাত্মিক শুদ্ধিকরণের প্রতীক।
অতীতের ব্যর্থ চিন্তা, অপ্রয়োজনীয় স্মৃতি, অপূর্ণ আহ্বান এবং উত্তরহীন সম্পর্ক—সবকিছুর স্তর সরিয়ে কবি পৌঁছাতে চান এমন এক জায়গায় যেখানে অন্ধকার ক্রমে সরে যায়।
৮. বৈদিক প্রার্থনার সঙ্গে আত্মঅনুসন্ধানের সংযোগ
কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে রবীন্দ্রনাথ বৈদিক প্রার্থনার দিকে ফিরে যান। ‘সবিতা’ ও ‘পূষণ’-এর উদ্দেশে প্রার্থনার মাধ্যমে তিনি সত্যের উপর থাকা আবরণ সরিয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন।
“তোমার হিরন্ময় পাত্রে সত্যের মুখ আচ্ছন্ন,
উন্মুক্ত করো সেই আবরণ।”
এখানে সত্য যেন আলোর মধ্যে থেকেও একটি আবরণে ঢাকা। মানুষের সাধনা হলো সেই আবরণ সরিয়ে সত্যকে প্রত্যক্ষ করা।
৯. দেহের অণু-পরমাণুতেও মহাজাগতিক সত্য
কবি দেহকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন না। বরং বলেন, দেহের অণু-পরমাণুর গভীরতম স্তরেও সেই মহত্তর সত্তার উপস্থিতি রয়েছে।
“তারো অলক্ষ্য অন্তরে আছে তোমার কল্যাণতম রূপ”
অর্থাৎ মানুষের শরীর ও মহাবিশ্ব পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষের গভীরতম সত্তার সঙ্গে বৃহত্তর বিশ্বসত্তার সম্পর্ক রয়েছে।
১০. ‘অমৃতের পুত্র’—মানবতার মহত্তর পরিচয়
শেষ অংশে কবিতাটি ব্যক্তিগত আত্মজিজ্ঞাসা ছাড়িয়ে মানবসভ্যতার দীর্ঘ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় পৌঁছে যায়।
“বলেছে, জেনেছি আমরা অমৃতের পুত্র”
মানুষের প্রকৃত পরিচয় কেবল ক্ষণস্থায়ী দেহে সীমাবদ্ধ নয়—এই উপলব্ধিই কবিতার চূড়ান্ত দার্শনিক অভিমুখ।
কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্য
এই কবিতার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো—মানুষ কি কেবল তার দেহ, স্মৃতি, কামনা, ভয়, সামাজিক পরিচয় ও পার্থিব সঞ্চয়ের সমষ্টি?
রবীন্দ্রনাথের উত্তর অনুসন্ধানী। মানুষের দেহ ও পার্থিব জীবন বাস্তব হলেও তার মধ্যে একটি গভীরতর সত্য আবৃত রয়েছে। সেই সত্যকে উপলব্ধি করতে হলে মানুষকে নিজের তৈরি আবরণ অতিক্রম করতে হবে।
কবিতার গতি তাই তিনটি স্তরে এগিয়েছে—
দেহ → অন্তরলোক → বিশ্বসত্য।
প্রথমে কবি দেখেছেন দেহের আবিলতা। তারপর তিনি মনকে সেই আবিলতা থেকে সরিয়ে অন্তরলোকের দিকে তাকিয়েছেন। শেষে সেই অন্তরলোককে বৃহৎ বিশ্বসত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
এই দৃষ্টিতে কবিতাটি কেবল আধ্যাত্মিক কবিতা নয়; এটি মানুষের আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানের কবিতা। দেহ নশ্বর, কিন্তু মানুষের অন্তর্গত সত্যকে কবি বৃহত্তর সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখেছেন।
সংক্ষেপে
‘এই দেহখানা বহন করে আসছে দীর্ঘকাল’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ মানুষের নশ্বর দেহ ও অন্তর্নিহিত মহত্তর সত্তার মধ্যে সম্পর্ক অনুসন্ধান করেছেন। রাগ, দ্বেষ, ভয়, কামনা, স্মৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের আবরণ মানুষের প্রকৃত সত্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কিন্তু প্রভাতের আলো, আত্মসমীক্ষা এবং আধ্যাত্মিক জাগরণের মাধ্যমে সেই আবরণ সরিয়ে অন্তরের সত্যকে উপলব্ধি করা সম্ভব।
কবিতার শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিমানুষের আত্মঅনুসন্ধান বিশ্বমানবের দীর্ঘ আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ‘অমৃতের পুত্র’ হিসেবে মানুষের পরিচয় তাই এখানে নশ্বর দেহের সীমা অতিক্রম করে এক বৃহত্তর সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
উৎস
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পত্রপুট
- কবিতার রচনাস্থল: শান্তিনিকেতন
- রচনার তারিখ: ৭ নভেম্বর ১৯৩৫
- পত্রপুট প্রকাশকাল: ২৫ বৈশাখ ১৩৪৩ / ১৯৩৬
![পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের ‘এই দেহখানা বহন করে আসছে দীর্ঘকাল’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 এই দেহখানা বহন করে আসছে দীর্ঘকাল [ পুত্রপুট কাব্যগ্রন্থ ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/এই-দেহখানা-বহন-করে-আসছে-দীর্ঘকাল.gif)