উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থের ‘ক্ষান্ত করিয়াছ তুমি আপনারে’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ, রূপকধর্মী ও দর্শনমূলক কবিতা হলো ‘ক্ষান্ত করিয়াছ তুমি আপনারে’। এই কবিতায় একটি সুউচ্চ পর্বতকে (যা একসময় আগ্নেয়গিরি বা প্রলয়ঙ্কর ছিল) সম্বোধন করে কবি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও প্রশান্তির মহিমা তুলে ধরেছেন। বিধ্বংসী ক্ষমতা বা অহংকার ত্যাগ করে যখন কেউ নিজেকে শান্ত করে, তখনই সে সমগ্র বিশ্বের আশ্রয় ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে—এটাই এই কবিতার মূল দর্শন।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামক্ষান্ত করিয়াছ তুমি আপনারে
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থউৎসর্গ
প্রকাশের বছর১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপ্রকৃতি-দর্শন ও রূপকধর্মী কবিতা (১৪ লাইনের পয়ার ছন্দ) (Philosophical, Nature and Allegorical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থে বিশ্বপ্রকৃতির সাথে মানুষের অন্তরের এক গভীর যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। এই কবিতায় কবি একটি পর্বত বা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে তার সৃষ্টির আদিম ইতিহাসের কথা স্মরণ করেছেন। একসময় এই পর্বত তার অগ্নুৎপাত বা ভূমিকম্পের তাণ্ডবে আকাশ ছুঁতে চেয়েছিল, তার সঙ্গী ছিল কেবলই প্রলয়। কিন্তু যেদিন সে তার সেই অহংকার ও ধ্বংসলীলা থামিয়ে শান্ত হয়েছে, সেদিন থেকেই তার বুকে জন্ম নিয়েছে সবুজ বনানী, নিশ্চিন্তে বাসা বেঁধেছে পাখি, আর মানুষ নির্ভয়ে তৈরি করেছে আপন আশ্রয়। ক্ষমতা প্রদর্শনের চেয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ যে কত বড় মহত্ত্ব, তা এখানে নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।

ক্ষান্ত করিয়াছ তুমি আপনারে – সম্পূর্ণ কবিতা

ক্ষান্ত করি-য়াছ তুমি আপনারে, তাই হেরো আজি

তোমার সর্বাঙ্গ ঘেরি পুলকিছে শ্যাম শস্পরাজি

প্রস্ফুটিত পুষ্পজালে; বনস্পতি শত বরষার

আনন্দবর্ষণকাব্য লিখিতেছে পত্রপুঞ্জে তার

বল্কলে শৈবালে জটে; সুদুর্গম তোমার শিখর

নির্ভয় বিহঙ্গ যত কলোল্লাসে করিছে মুখর।

আসি নরনারীদল তোমার বিপুল বক্ষপটে

নিঃশঙ্ক কুটিরগুলি বাঁধিয়াছে নির্ঝরিণীতটে।

যেদিন উঠিয়াছিলে অগ্নিতেজে স্পর্ধিতে আকাশ,

কম্পমান ভূমণ্ডলে, চন্দ্রসূর্য করিবারে গ্রাস —

সেদিন হে গিরি, তব এক সঙ্গী আছিল প্রলয়;

যখনি থেমেছ তুমি, বলিয়াছ “আর নয় নয়’,

চারি দিক হতে এল তোমা’পরে আনন্দনিশ্বাস,

তোমার সমাপ্তি ঘেরি বিস্তারিল বিশ্বের বিশ্বাস।

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version

Kshanto koriyachho tumi aponare, tai hero aji
Tomar shorbongo gheri pulokichhe shyam shoshporaji
Proshphutito pushpojale; bonoshpoti shoto boroshar
Anondoborshonokabyo likhitechhe potropunje tar
Bolkole shoibale jote; shudurgom tomar shikhor
Nirbhoy bihonggo joto kolollashe korichhe mukhor.
Ashi noronaridol tomar bipul bokkhopote
Nishongko kutirguli bandhiyachhe nirjhorinitote.
Jedin uthiyachhile ogniteje spordhite akash,
Kompoman bhumondole, chondroshurjo koribare grash —
Shedin he giri, tobo ek shonggi achhilo proloy;
Jokhoni themechho tumi, boliyachho “Ar noy noy’,
Chari dik hote elo toma’pore anondonishwash,

Tomar shomapti gheri bistarilo bishwer bishwash.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • শান্ত সমাহিত রূপ ও প্রাণের বিকাশ:
“ক্ষান্ত করিয়াছ তুমি আপনারে… তোমার সর্বাঙ্গ ঘেরি পুলকিছে শ্যাম শস্পরাজি / প্রস্ফুটিত পুষ্পজালে; … নির্ভয় বিহঙ্গ যত কলোল্লাসে করিছে মুখর।”
— পর্বত নিজেকে শান্ত করেছে বলেই আজ তার পাথর ভেদ করে শ্যামল ঘাস ও ফুল ফুটেছে। শত বছরের পুরোনো গাছপালা তার বুকে শেকড় গেড়েছে এবং দুর্গম চূড়ায় পাখিরা নির্ভয়ে আনন্দ-কোলাহল করছে। আত্মনিয়ন্ত্রণই প্রাণের বিকাশের প্রথম শর্ত।
  • নির্ভয় আশ্রয় ও নির্ভরতা:
“আসি নরনারীদল তোমার বিপুল বক্ষপটে / নিঃশঙ্ক কুটিরগুলি বাঁধিয়াছে নির্ঝরিণীতটে।”
— পাহাড়ের এই শান্ত ও সমাহিত রূপ দেখে সাধারণ মানুষ তার বিশাল বুকের ওপর বয়ে চলা ঝরনার পাশে নির্ভয়ে নিজেদের কুঁড়েঘর বা বসতি স্থাপন করেছে।
  • অতীতের তাণ্ডব বনাম বর্তমানের প্রশান্তি:
“যেদিন উঠিয়াছিলে অগ্নিতেজে স্পর্ধিতে আকাশ… সেদিন হে গিরি, তব এক সঙ্গী আছিল প্রলয়; / যখনি থেমেছ তুমি, বলিয়াছ ‘আর নয় নয়’ … বিস্তারিল বিশ্বের বিশ্বাস।”
— অতীতের আগ্নেয়গিরি যখন আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে আগুন ছুঁড়ত, তখন ধ্বংস ছাড়া তার আর কোনো সঙ্গী ছিল না, কেউ তাকে বিশ্বাস করত না। কিন্তু যেদিন সে নিজের অহংকার ও শক্তি প্রদর্শন থামিয়ে বলেছে ‘আর নয়’, তখন সমগ্র পৃথিবী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে এবং তার সেই প্রশান্তির ওপরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সৃষ্টির বিশ্বাস ও ভরসা।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও কবিতার ভেতরের অনাকাঙ্ক্ষিত হাইফেনগুলো পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন