‘বসেছি অপরাহ্নে পারের খেয়াঘাটে’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত একটি গভীর আত্মঅনুসন্ধানী ও দার্শনিক কবিতা। কবিতার সূচনায় কবিকে দেখা যায় অপরাহ্নে নদীর ঘাটে বসে জীবনের অতীত পথের দিকে ফিরে তাকাতে। খেয়াঘাট, কালো জল, নৌকা, অপরাহ্নের আলো, সন্ধ্যার অন্ধকার—এসব চিত্রকল্প ধীরে ধীরে কবিতাটিকে জীবন, অপূর্ণতা, শিল্প, আত্মপরিচয়, মৃত্যু ও মানবসভ্যতার বৃহত্তর প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়।
কবি উপলব্ধি করেন, জীবনের বহু সম্ভাবনা ও সৃষ্টির মুহূর্ত সময়মতো পূর্ণতা পায়নি। কিন্তু সেই বঞ্চনা শেষ পর্যন্ত তাঁর শিল্পসত্তাকে শূন্য করেনি; বরং বিরহ, অপূর্ণতা ও দুঃখ থেকেই জন্ম নিয়েছে গভীরতর সুর।
পত্রপুট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্ত্যপর্বের একটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এটি ২৫ বৈশাখ ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ (১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে) প্রকাশিত হয় এবং এতে মোট আঠারোটি কবিতা রয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| কবিতার নাম | বসেছি অপরাহ্নে পারের খেয়াঘাটে |
| কবি | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| কাব্যগ্রন্থ | পত্রপুট |
| প্রকাশকাল | ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ / ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ |
| রচনার তারিখ | ১ বৈশাখ ১৩৪৩ |
| ধরন | দার্শনিক, আত্মঅনুসন্ধানী ও গীতিধর্মী কবিতা |
| প্রধান বিষয় | জীবন, অপূর্ণতা, শিল্প, আত্মপরিচয়, মৃত্যু, মানবমুক্তি ও ইতিহাস |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের শেষ পর্বে এসে ব্যক্তি-জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৃহত্তর মানবজীবন ও ইতিহাসের প্রশ্নকে গভীরভাবে যুক্ত করেছেন। পত্রপুট-এর কবিতাগুলিতেও আত্মসমীক্ষা, সময়, মৃত্যু, সৃষ্টি এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বারবার ফিরে আসে।
‘বসেছি অপরাহ্নে পারের খেয়াঘাটে’ কবিতায় নদীর ঘাটটি যেন কবির আত্মসমীক্ষার স্থান। ‘অপরাহ্ন’ জীবনের শেষপ্রহরের প্রতীক হয়ে ওঠে। অতীতের দিকে তাকিয়ে কবি তাঁর শিল্পজীবনের অপূর্ণতা, হারানো সুযোগ, না-পাওয়া মানুষের স্মৃতি এবং নিজের অন্তর্গত সম্ভাবনার দিকে ফিরে তাকান।
কবিতাটি ব্যক্তিগত আত্মসমীক্ষা থেকে ধীরে ধীরে মানবসভ্যতার ইতিহাস ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার দিকে প্রসারিত হয়েছে। শেষাংশে কবি সেইসব মানববীরের প্রতি নতশিরে প্রণাম জানিয়েছেন, যাঁরা “মর্ত্যের অমরাবতী” সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও দুঃখের মূল্য দিয়ে।
সম্পূর্ণ কবিতা
বসেছি অপরাহ্নে পারের খেয়াঘাটে
বসেছি অপরাহ্ণে পারের খেয়াঘাটে
শেষ ধাপের কাছটাতে।
কালো জল নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে পা ডুবিয়ে দিয়ে।
জীবনের পরিত্যক্ত ভোজের ক্ষেত্র প’ড়ে আছে পিছন দিকে
অনেক দিনের ছড়ানো উচ্ছিষ্ট নিয়ে।
মনে পড়ছে ভোগের আয়োজনে
ফাঁক পড়েছে বারংবার।
কতদিন যখন মূল্য ছিল হাতে
হাট জমেনি তখনো,
বোঝাই নৌকো লাগল যখন ডাঙায়
তখন ঘণ্টা গিয়েছে বেজে,
ফুরিয়েছে বেচাকেনার প্রহর।
অকাল বসন্তে জেগেছিল ভোরের কোকিল;
সেদিন তার চড়িয়েছি সেতারে,
গানে বসিয়েছি সুর।
যাকে শোনাব তার চুল যখন হোলো বাঁধা,
বুকে উঠল জাফ্রানি রঙের আঁচল
তখন ঝিকিমিকি বেলা,
করুণ ক্লান্তি লেগেছে মূলতানে।
ক্রমে ধূসর আলোর উপরে কালো মরচে পড়ে এল।
থেমে-যাওয়া গানখানি নিভে-যাওয়া প্রদীপের ভেলার মতো
ডুবল বুঝি কোন্ একজনের মনের তলায়,
উঠল বুঝি তার দীর্ঘনিশ্বাস,
কিন্তু জ্বালানো হোলো না আলো॥
এ নিয়ে আজ নালিশ নেই আমার।
বিরহের কালো গুহা ক্ষুধিত গহ্বর থেকে
ঢেলে দিয়েছে ক্ষুভিত সুরের ঝরনা রাত্রিদিন।
সাত রঙের ছটা খেলেছে তার নাচের উড়নিতে
সারাদিনের সূর্যালোকে,
নিশীথরাত্রের জপমন্ত্র ছন্দ পেয়েছে
তার তিমিরপুঞ্জ কলোচ্ছল ধারায়।
আমার তপ্ত মধ্যাহ্নের শূন্যতা থেকে উচ্ছ্বসিত
গৌড়-সারঙের আলাপ।
আজ বঞ্চিত জীবনকে বলি সার্থক,
নিঃশেষ হয়ে এল তার দুঃখের সঞ্চয়
মৃত্যুর অর্ঘ্যপাত্রে,
তার দক্ষিণা রয়ে গেল কালের বেদীপ্রান্তে।
জীবনের পথে মানুষ যাত্রা করে
নিজেকে খুঁজে পাবার জন্যে।
গান যে-মানুষ গায়, দিয়েছে সে ধরা, আমার অন্তরে;
যে মানুষ দেয় প্রাণ, দেখা মেলেনি তার।
দেখেছি শুধু আপনার নিভৃত রূপ
ছায়ায় পরিকীর্ণ,
যেন পাহাড়তলীতে একখানা অনুত্তরঙ্গ সরোবর।
তীরের গাছ থেকে
সেখানে বসন্ত-শেষের ফুল পড়ে ঝরে,
ছেলেরা ভাসায় খেলার নৌকো,
কলস ভরে নেয় তরুণীরা
বুদ্বুদ ফেনিল গর্গরধ্বনিতে।
নব বর্ষার গম্ভীর বিরাট শ্যামমহিমা
তার বক্ষতলে পায় লীলাচঞ্চল দোসরটিকে।
কালবৈশাখী হঠাৎ মারে পাখার ঝাপট,
স্থির জলে আনে অশান্তির উন্মন্থন,
অধৈর্যের আঘাত হানে তটবেষ্টনের স্থাবরতায়,
বুঝি তার মনে হয়
গিরিশিখরের পাগলা-ঝোরা পোষ মেনেছে
গিরিপদতলের বোবা জলরাশিতে।
বন্দী ভুলেছে আপনার উদ্বেলকে উদ্দামকে।
পাথর ডিঙিয়ে আপন সীমানা চুর্ণ করতে করতে
নিরুদ্দেশের পথে
অজানার সংঘাতে বাঁকে বাঁকে
গর্জিত করল না সে আপন অবরুদ্ধ বাণী,
আবর্তে আবর্তে উৎক্ষিপ্ত করল না
অন্তর্গূঢ়কে।
মৃত্যুর গ্রন্থি থেকে ছিনিয়ে ছিনিয়ে
যে উদ্ধার করে জীবনকে
সেই রুদ্র মানবের আত্মপরিচয়ে বঞ্চিত
ক্ষীণ পাণ্ডুর আমি
অপরিস্ফুটতার অসম্মান নিয়ে যাচ্ছি চলে।
দুর্গম ভীষণের ওপারে
অন্ধকারে অপেক্ষা করছে জ্ঞানের বরদাত্রী;
মানবের অভ্রভেদী বন্ধনশালা
তুলেছে কালো পাথরে গাঁথা উদ্ধত চূড়া
সূর্যোদয়ের পথে;
বহু শতাব্দীর ব্যথিত ক্ষত মুষ্টি
রক্তলাঞ্ছিত বিদ্রোহের ছাপ
লেপে দিয়ে যায় তার দ্বারফলকে;
ইতিহাস-বিধাতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ
দৈত্যের লৌহদুর্গে প্রচ্ছন্ন;
আকাশে দেবসেনাপতির কণ্ঠ শোনা যায়—
এসো মৃত্যুবিজয়ী;
বাজ্ল ভেরী,
তবু জাগ্ল না রণদুর্মদ
এই নিরাপদ নিশ্চেষ্ট জীবনে;
ব্যুহ ভেদ ক’রে
স্থান নিইনি যুধ্যমান দেবলোকের সংগ্রাম-সহকারিতায়।
কেবল স্বপ্নে শুনেছি ডমরুর গুরুগুরু,
কেবল সমরযাত্রীর পদপাতকম্পন
মিলেছে হৃৎস্পন্দনে বাহিরের পথ থেকে।
যুগে যুগে যে মানুষের সৃষ্টি প্রলয়ের ক্ষেত্রে,
সেই শ্মশানচারী ভৈরবের পরিচয়জ্যোতি
ম্লান হয়ে রইল আমার সত্তায়,
শুধু রেখে গেলেম নতমস্তকের প্রণাম
মানবের হৃদয়াসীন সেই বীরের উদ্দেশে,
মর্ত্যের অমরাবতী যাঁর সৃষ্টি
মৃত্যুর মূল্যে, দুঃখের দীপ্তিতে॥
১লা বৈশাখ, ১৩৪৩
Romanized Version
Boshechhi Aparāhne Pārer Kheẏāghāṭe
Boshechhi aparāhṇe pārer kheẏāghāṭe
Śeṣ dhāper kāchhṭāte.
Kālo jal niḥśabde baẏe yācchhe pā ḍubiẏe diẏe.
Jībāner parityakta bhojer kṣetra poṛe āchhe pichhan dike
Anek diner chaṛāno ucchiṣṭa niẏe.
Mane paṛchhe bhoger āyojane
Phāṅk paṛechhe bārambār.
Katadin yakhon mūlya chhila hāte
Hāṭ jamenī takhano,
Bojhāi nauko lāglo yakhon ḍāṅgāẏ
Takhon ghaṇṭā giẏechhe beje,
Phurieche becākenār prahar.
Akāl basante jegechhila bhorer kokil;
Sedin tār chaṛiechi setāre,
Gāne basiẏechhi sur.
Yāke śonābo tār cul yakhon holo bāṅdhā,
Buke uṭhlo jāfrāni raṅger āñcal
Takhon jhikimiki belā,
Karuṇ klānti legechhe mūltāne.
Krame dhūsar ālor upare kālo morce paṛe el.
Theme-yāoā gānkhāni nibhe-yāoā pradīper bhelār mato
Dublo bujhi kon ekjoner maner talāẏ,
Uṭhlo bujhi tār dīrghanihśvās,
Kintu jvālāno holo nā ālo॥
E niẏe āj nāliś nei āmār.
Biraher kālo guhā kṣudhita gahbar theke
Ḍhele diyechhe kṣubhita surer jharanā rātridin.
Sāt raṅger chaṭā khelechhe tār nācer uṛanite
Sārādiner sūryāloke,
Niśītharātrer japamantra chhanda peẏechhe
Tār timirapuñja kalochchhala dhārāẏ.
Āmār tapta madhyāhner śūnyatā theke ucchvasita
Gauṛ-Sāraṅger ālāp.
Āj bañcita jīban-ke bali sārthak,
Niḥśeṣ haẏe el tār duḥkher sañcay
Mṛtyur arghyapātre,
Tār dakṣiṇā raẏe gel kāler bedīprānte.
Jībāner pathe mānuṣ yātrā kare
Nijeke khũje pābār janye.
Gān ye-mānuṣ gāẏ, diyechhe se dharā, āmār antare;
Ye mānuṣ deẏ prāṇ, dekhā meleni tār.
Dekhechhi śudhu āpnār nibhṛta rūp
Chhāyāẏ parikīrṇa,
Yena pāhāṛtalīte ekkhānā anuttaraṅga sarobar.
Tīrer gāchh theke
Sekhāne basanta-śeṣer phul paṛe jhare,
Chelerā bhāsāẏ khelār nauko,
Kalaś bhare neẏ taruṇīrā
Budbuda phenil gargara-dhvanite.
Naba barṣār gambhīr birāṭ śyāmahimā
Tār bakṣatale pāẏ līlācañcala dosortike.
Kālabaiśākhī haṭhāt māre pākhār jhāpaṭ,
Sthir jale āne aśāntir unmanthan,
Adhairyer āghāt hāne taṭabeṣṭaner sthābaratāẏ,
Bujhi tār mane haẏ
Giriśikharer pāglā-jhorā poṣ menechhe
Giripadataler boba jalrāśite.
Bandī bhulechhe āpnār udbelke uddāmke.
Pāthor ḍiṅie āpan sīmānā cūrṇa korte korte
Niruddeśer pathe
Ajānār saṅghāte bāṅke bāṅke
Garjita karlo nā se āpan abaruddha bāṇī,
Ābarte ābarte utkṣipta karlo nā
Antargūṛhake.
Mṛtyur granthi theke chhiniẏe chhiniẏe
Ye uddhār kare jīban-ke
Sei rudra mānaber ātmaparicaye bañcita
Kṣīṇa pāṇḍur āmi
Aparisphuṭatār asammān niẏe yācchhi cale.
Durgam bhīṣaṇer opāre
Andhakāre apekṣā karachhe jñāner baradātrī;
Mānaber abhrabhedī bandhanaśālā
Tulechhe kālo pāthare gāṅthā uddhata cūṛā
Sūryodayer pathe;
Bahu śatābdīr byāthita kṣata muṣṭi
Raktalāñchhita bidroher chhāp
Lepe diye yāẏ tār dvāraphalake;
Itihās-bidhātār śreṣṭha sampad
Daityer lauhadurge pracchanna;
Ākāśe debasenāpater kaṇṭha śonā yāẏ—
Eso mṛtyubijaẏī;
Bājla bherī,
Tabu jāgla nā raṇadurmad
Ei nirāpada niśceṣṭa jībane;
Byūha bhed kore
Sthān nīni yudhyamān debloker saṅgrām-sahakāritāẏ.
Kebal svapne śunechhi ḍamarur guruguru,
Kebal samarayātrīr padapātakampan
Milechhe hṛtspandane bāhirer path theke.
Yuge yuge ye mānuṣer sṛṣṭi pralaẏer kṣetre,
Sei śmaśānacārī bhairaber paricayajyoti
Mlān haẏe roil āmār sattāẏ,
Śudhu rekhe gelem natamastaker praṇām
Mānaber hṛdayāsīn sei bīrer uddeshe,
Martyer amarābatī yãr sṛṣṭi
Mṛtyur mūlye, duḥkher dīptite॥
1lā Baiśākh, 1343
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
১. অপরাহ্ন ও খেয়াঘাটের প্রতীক
কবিতার শুরুতেই “অপরাহ্ন” ও “খেয়াঘাট” দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে উপস্থিত। অপরাহ্ন দিনের শেষভাগ; কবিতার প্রেক্ষাপটে এটি জীবনের শেষ পর্বের ইঙ্গিত বহন করে। আর খেয়াঘাট নদী পার হওয়ার স্থান—অর্থাৎ এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় যাওয়ার সীমারেখা।
“বসেছি অপরাহ্ণে পারের খেয়াঘাটে
শেষ ধাপের কাছটাতে।”
‘শেষ ধাপ’ কথাটিও তাই সরল স্থানবর্ণনার বাইরে গিয়ে গভীর অস্তিত্ববাদী তাৎপর্য ধারণ করে।
২. অপূর্ণ জীবনের হিসাব
কবি অতীতের দিকে তাকিয়ে দেখছেন, জীবনের বহু সুযোগ সঠিক সময়ে কাজে লাগানো হয়নি।
“কতদিন যখন মূল্য ছিল হাতে
হাট জমেনি তখনো,”
আবার যখন সুযোগ এসেছে, তখন সময় শেষ হয়ে গেছে—
“বোঝাই নৌকো লাগল যখন ডাঙায়
তখন ঘণ্টা গিয়েছে বেজে,”
এখানে জীবনের অপূর্ণতা ও সময়ের নির্মম গতির অনুভূতি অত্যন্ত তীব্র।
৩. অপূর্ণ প্রেম ও অসমাপ্ত গান
কবিতার একটি অংশে অতীতের এক গান ও প্রিয়জনের স্মৃতি এসেছে। কবি সুর প্রস্তুত করেছিলেন, কিন্তু যাকে শোনাবেন, তার কাছে পৌঁছানোর আগেই সময় ফুরিয়ে গেছে।
“থেমে-যাওয়া গানখানি নিভে-যাওয়া প্রদীপের ভেলার মতো
ডুবল বুঝি কোন্ একজনের মনের তলায়”
এই অসম্পূর্ণতা পরবর্তীতে কবির সৃষ্টিশীলতারই অংশ হয়ে ওঠে।
৪. বঞ্চনা থেকে সৃষ্টির জন্ম
কবি শেষ পর্যন্ত তাঁর অপূর্ণতাকে শুধুই ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন না।
“এ নিয়ে আজ নালিশ নেই আমার।”
বরং বিরহের অন্ধকার থেকেই জন্ম নিয়েছে “ক্ষুভিত সুরের ঝরনা”। তাঁর বঞ্চিত জীবন শিল্পের গভীরতর সম্পদে পরিণত হয়েছে।
“আজ বঞ্চিত জীবনকে বলি সার্থক”
এই উপলব্ধি কবিতাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
৫. আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান
কবিতায় একটি গভীর প্রশ্ন উঠে আসে—
“জীবনের পথে মানুষ যাত্রা করে
নিজেকে খুঁজে পাবার জন্যে।”
কিন্তু কবি অনুভব করেন, যে মানুষ গান গায় তাকে তিনি তাঁর অন্তরে পেয়েছেন, অথচ যে মানুষ প্রাণের গভীরতম পরিচয় বহন করে, তার সম্পূর্ণ দেখা তিনি পাননি।
এখানে শিল্পীসত্তা ও মানবসত্তার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
৬. স্থির সরোবর ও অবদমিত জীবন
পাহাড়ের পাদদেশের স্থির সরোবরের সঙ্গে কবির অন্তর্গত সত্তার তুলনা করা হয়েছে। বাইরে থেকে শান্ত হলেও তার মধ্যে রয়েছে এক সম্ভাব্য প্রবল স্রোত।
পরে পাহাড়ি ঝরনা, কালবৈশাখী, আবর্ত ও উন্মন্থনের চিত্রের মাধ্যমে সেই অবদমিত শক্তির রূপ প্রকাশ পেয়েছে।
৭. রুদ্র মানবের আত্মপরিচয়
কবিতার শেষভাগ ব্যক্তিগত জীবন থেকে বৃহত্তর মানবজগতের দিকে চলে যায়। কবি এমন মানুষের কথা বলেছেন, যিনি মৃত্যুর বন্ধন থেকে জীবনকে উদ্ধার করেন এবং ইতিহাসের গতিকে পরিবর্তন করেন।
“মৃত্যুর গ্রন্থি থেকে ছিনিয়ে ছিনিয়ে
যে উদ্ধার করে জীবনকে”
এই ‘রুদ্র মানব’ ব্যক্তিমানুষের সীমা অতিক্রম করে সংগ্রামী, সৃষ্টিশীল ও মুক্তিকামী মানবতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
৮. আত্মসমালোচনা ও বিনম্র প্রণাম
কবি স্বীকার করেন যে সেই বৃহত্তর মানবিক সংগ্রামে তিনি নিজে সম্পূর্ণভাবে অংশ নিতে পারেননি—
“স্থান নিইনি যুধ্যমান দেবলোকের সংগ্রাম-সহকারিতায়।”
তাই শেষ পর্যন্ত তাঁর অবস্থান আত্মগৌরবের নয়; বরং শ্রদ্ধা ও প্রণামের—
“শুধু রেখে গেলেম নতমস্তকের প্রণাম
মানবের হৃদয়াসীন সেই বীরের উদ্দেশে”
কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্য
‘বসেছি অপরাহ্নে পারের খেয়াঘাটে’ একদিকে ব্যক্তিগত জীবনের আত্মসমীক্ষা, অন্যদিকে মানবসভ্যতার বৃহত্তর ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান নির্ণয়ের কবিতা।
খেয়াঘাটে বসে থাকা কবি জানেন, জীবনের “বেচাকেনার প্রহর” প্রায় শেষ। কিন্তু এই উপলব্ধি তাঁকে নিছক হতাশায় নিয়ে যায় না। বরং তিনি বুঝতে পারেন, অপূর্ণতা, বিরহ ও বঞ্চনাও তাঁর সৃষ্টিকে গভীর করেছে।
কবিতার শেষদিকে ব্যক্তিগত আত্মসমীক্ষা আরও বিস্তৃত হয়ে মানবমুক্তির প্রশ্নে পৌঁছায়। যাঁরা মৃত্যু ও দুঃখের মূল্য দিয়ে মানুষের জন্য নতুন পৃথিবী নির্মাণ করেন, তাঁদের সামনে কবি নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নতশিরে দাঁড়ান।
শেষ পঙ্ক্তি—
“মর্ত্যের অমরাবতী যাঁর সৃষ্টি
মৃত্যুর মূল্যে, দুঃখের দীপ্তিতে॥”
—কবিতাটির দর্শনকে সংক্ষেপে ধারণ করে। মানুষের মহৎ সৃষ্টি অনেক সময় আরাম বা নিরাপত্তা থেকে নয়; মৃত্যু, দুঃখ, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই তা নির্মিত হয়।
উৎস
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পত্রপুট।
- কবিতার রচনার তারিখ: ১ বৈশাখ ১৩৪৩।
- কবিতার মূল পাঠ: প্রদত্ত পাঠ অনুসারে সংরক্ষিত।
![পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের ‘বসেছি অপরাহ্নে পারের খেয়াঘাটে’ কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 বসেছি অপরাহ্নে পারের খেয়াঘাটে [ পুত্রপুট কাব্যগ্রন্থ ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/বসেছি-অপরাহ্নে-পারের-খেয়াঘাটে.gif)