বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর আবেগময় ও কৃতজ্ঞতাপূর্ণ সৃষ্টি হলো ‘পথসঙ্গী’। জীবনের অন্তিম লগ্নে পৌঁছে কবি তাঁর দীর্ঘ যাত্রাপথের বিশ্বস্ত সঙ্গীদের প্রতি যে অকৃত্রিম ভালোবাসা, আশীর্বাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন, এই কবিতায় তারই এক সুন্দর, মর্মস্পর্শী ও শাশ্বত রূপায়ণ ঘটেছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামপথসঙ্গী
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপরিশেষ
প্রকাশের বছর১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআত্মজৈবনিক, স্মৃতিচারণমূলক ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশক লিরিক কবিতা (Autobiographical and Dedicatory Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের জীবনের সায়াহ্নবেলার এক অসামান্য সৃষ্টি। এই গ্রন্থে কবির বিদায়বেলার সুর, বিগত জীবনের স্মৃতিচারণ এবং আপনজনদের প্রতি কৃতজ্ঞতা অত্যন্ত গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। ‘পথসঙ্গী’ কবিতাটি মূলত তাঁর জীবনের দুজন বিশেষ সঙ্গী—কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত। জীবনের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে কবি তাঁর এই সুহৃদদের নিঃস্বার্থ সেবার কথা স্মরণ করেছেন এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য অশেষ শুভকামনা জানিয়েছেন।

পথসঙ্গী – সম্পূর্ণ কবিতা

শ্রীযুক্ত কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়
ছিলে যে পথের সাথী,
দিবসে এনেছ পিপাসার জল
রাত্রে জ্বেলেছ বাতি।
আমার জীবনে সন্ধ্যা ঘনায়,
পথ হয় অবসান,
তোমার লাগিয়া রেখে যাই মোর
শুভকামনার দান।
সংসারপথ হোক বাধাহীন,
নিয়ে যাক কল্যাণে,
নব নব ঐশ্বর্য আনুক
জ্ঞানে কর্মে ও ধ্যানে।
মোর স্মৃতি যদি মনে রাখ কভু
এই বলে রেখো মনে —
ফুল ফুটায়েছি, ফল যদিও-বা
ধরে নাই এ জীবনে।
শ্রীযুক্ত অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তী
বাহিরে তোমার যা পেয়েছি সেবা
অন্তরে তাহা রাখি,
কর্মে তাহার শেষ নাহি হয়
প্রেমে তাহা থাকে বাকি।
আমার আলোর ক্লান্তি ঘুচাতে
দীপে তেল ভরি দিলে।
তোমার হৃদয় আমার হৃদয়ে
সে-আলোকে যায় মিলে।

Romanized Version

Srijukto Kedarnath Chattopadhyay
Chhile je pother shathi,
Diboshe enechho pipashar jol
Ratre jwelechho bati.
Amar jibone shondhya ghonay,
Poth hoy oboshan,
Tomar lagiya rekhe jai mor
Shubhokamonar dan.
Shongsharpoth hok badhahin,
Niye jak kolyane,
Nobo nobo oishorjo anuk

Gyane korme o dhyane.

Mor smriti jodi mone rakho kobhu
Ei bole rekho mone —
Phul phutayechi, phol jodio-ba
Dhore nai e jibone.
Srijukto Omiyochondro Chokroborti
Bahire tomar ja peyechi sheba
Ontore taha rakhi,
Korme tahar shesh nahi hoy
Preme taha thake baki.
Amar alor klanti ghuchate
Dipe tel vori dile.
Tomar hridoy amar hridoye

Se-aloke jay mile.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • পথের সঙ্গীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা:
“ছিলে যে পথের সাথী, / দিবসে এনেছ পিপাসার জল / রাত্রে জ্বেলেছ বাতি।”
— জীবনের দীর্ঘ যাত্রাপথে যারা দিনের বেলায় তৃষ্ণা নিবারণ করেছে এবং রাতের অন্ধকারে আলো জ্বেলে পথ দেখিয়েছে, কবি তাঁদের নিঃস্বার্থ সেবার কথা অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন।
  • বিদায়বেলার শুভকামনা ও স্মৃতি:
“আমার জীবনে সন্ধ্যা ঘনায়, / পথ হয় অবসান, / তোমার লাগিয়া রেখে যাই মোর / শুভকামনার দান। … ফুল ফুটায়েছি, ফল যদিও-বা / ধরে নাই এ জীবনে।”
— জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এসে কবি সঙ্গীদের জন্য নব নব ঐশ্বর্য, জ্ঞান ও কর্মের কল্যাণে এক বাধাহীন ভবিষ্যতের প্রার্থনা করে গেছেন এবং আক্ষেপ করেছেন যে তিনি জীবনে হয়তো কেবল ফুলই ফুটিয়েছেন, ফলের দেখা পাননি।
  • প্রেম ও সেবার শাশ্বত বন্ধন:
“বাহিরে তোমার যা পেয়েছি সেবা / অন্তরে তাহা রাখি, / কর্মে তাহার শেষ নাহি হয় / প্রেমে তাহা থাকে বাকি।”
— বহির্জগতের সেবার বা কাজের হয়তো একদিন শেষ হয়, কিন্তু অন্তরের ভালোবাসার কোনো শেষ নেই। অন্যের হৃদয়ের আলোর সাথে নিজের হৃদয়ের যে মিলন, তা এই কবিতায় এক শাশ্বত প্রেমের রূপ লাভ করেছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পরিশেষ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন