আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

পলাতকা কাব্যগ্রন্থের ‘চিরদিনের দাগা’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামচিরদিনের দাগা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপলাতকা
প্রকাশের বছর১৯১৮ (১৩২৫ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআখ্যানধর্মী ও স্মৃতিকাতর লিরিক কবিতা (Narrative / Elegiac Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯১৮ সালে প্রকাশিত ‘পলাতকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমাজচেতনা, পারিবারিক জীবনের অন্তরালের সত্য এবং মানবমানস বিশ্লেষণের এক অনন্য নিদর্শন। ‘চিরদিনের দাগা’ কবিতায় শৈল নামের একটি অবহেলিত মেয়ের করুণ জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে। তিনটি মেয়ের পর জন্ম নেওয়ার কারণে মা তাকে ‘অবাঞ্ছিত কাঙাল’ মনে করতেন এবং বিনা দোষে তাকে প্রতিনিয়ত গালমন্দ ও অনাদরে বড় করতেন। পাড়ার এক বৃদ্ধ প্রতিবেশী কবির সাথেই ছিল সেই দুষ্টু ও প্রাণচঞ্চল মেয়েটির একমাত্র মেশামেশি; সে কবিকে ‘বর’ বলে ডাকত। বড় হওয়ার পর বর্মার এক পাত্রের সাথে তার বিয়ে দেওয়া হয় এবং রেঙ্গুনে যাওয়ার পথে ইরাবতীর মোহানায় জাহাজ ডুবে তার আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর পর শৈলের বাবা এসে কবির কাছে এক অদ্ভুত অনুশোচনার কথা জানান—একবার শৈল খাতার পাতায় হিজিবিজি আঁচড় কাটলে বাবা তাকে শাস্তি হিসেবে কবির বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আজ সেই হিসাবের খাতার পাতাগুলোই চিরদিনের দাগা হয়ে বাবার বুকে চিরকালের কান্না হয়ে বেজে চলেছে।

চিরদিনের দাগা কবিতা (সম্পূর্ণ)

ওপার হতে এপার পানে খেয়া-নৌকা বেয়ে

                   ভাগ্য নেয়ে

          দলে দলে আনছে ছেলেমেয়ে।

               সবাই সমান তারা

     এক সাজিতে ভরে-আনা চাঁপাফুলের পারা।

                 তাহার পরে অন্ধকারে

               কোন্‌ ঘরে সে পৌঁছিয়ে দেয় কারে!

তখন তাদের আরম্ভ হয় নব নব কাহিনী-জাল বোনা–

                   দুঃখে সুখে দিনমুহূর্ত গোনা।

               একে একে তিনটি মেয়ের পরে

          শৈল যখন জন্মাল তার বাপের ঘরে,

     জননী তার লজ্জা পেল; ভাবল কোথা থেকে

          অবাঞ্ছিত কাঙালটারে আনল ঘরে ডেকে।

                   বৃষ্টিধারা চাইছে যখন চাষি

                   নামল যেন শিলাবৃষ্টিরাশি।

বিনা-দোষের অপরাধে শৈলবালার জীবন হল শুরু,

          পদে পদে অপরাধের বোঝা হল গুরু।

কারণ বিনা যে-অনাদর আপনি ওঠে জেগে

          বেড়েই চলে সে যে আপন বেগে।

মা তারে কয় “পোড়ারমুখী”, শাসন করে বাপ,–

                   এ কোন্‌ অভিশাপ

হতভাগী আনলি বয়ে–শুধু কেবল বেঁচে-থাকার পাপ।

          যতই তারা দিত ওরে গালি

নির্মলারে দেখত মলিন মাখিয়ে তারে আপন কথার কালি।

          নিজের মনের বিকারটিরেই শৈল ওরা কয়,

                   ওদের শৈল বিধির শৈল নয়।

          আমি বৃদ্ধ ছিনু ওদের প্রতিবেশী।

পাড়ায় কেবল আমার সঙ্গে দুষ্টু মেয়ের ছিল মেশামেশি।

                   “দাদা” বলে

     গলা আমার জড়িয়ে ধরে বসত আমার কোলে।

     নাম শুধালে শৈল আমায় বলত হাসি হাসি–

          “আমার নাম যে দুষ্টু, সর্বনাশী!”

     যখন তারে শুধাতেম তার মুখটি তুলে ধরে

          “আমি কে তোর বল দেখি ভাই মোরে?”

          বলত “দাদা, তুই যে আমার বর!”–

          এমনি করে হাসাহাসি হত পরস্পর।

     বিয়ের বয়স হল তবু কোনোমতে হয় না বিয়ে তার–

               তাহে বাড়ায় অপরাধের ভার।

          অবশেষে বর্মা থেকে পাত্র গেল জুটি।

                   অল্পদিনের ছুটি;

               শুভকর্ম সেরে তাড়াতাড়ি

     মেয়েটিরে সঙ্গে নিয়ে রেঙ্গুনে তার দিতে হবে পাড়ি।

          শৈলকে যেই বলতে গেলেম হেসে–

“বুড়ো বরকে হেলা করে নবীনকে ভাই বরণ করলি শেষে?”

          অমনি যে তার দু-চোখ গেল ভেসে

     ঝরঝরিয়ে চোখের জলে। আমি বলি, “ছি ছি,

          কেন, শৈল, কাঁদিস মিছিমিছি,

                   করিস অমঙ্গল।”

     বলতে গিয়ে চক্ষে আমার রাখতে নারি জল।

                   বাজল বিয়ের বাঁশি,

     অনাদরের ঘর ছেড়ে হায় বিদায় হল দুষ্টু সর্বনাশী।

     যাবার বেলা বলে গেল, “দাদা, তোমার রইল নিমন্ত্রণ,

তিন-সত্যি–যেয়ো যেয়ো।” “যাব, যাব, যাব বই কি বোন।”

                   আর কিছু না বলে

     আশীর্বাদের মোতির মালা পরিয়ে দিলেম গলে।

                   চতুর্থ দিন প্রাতে

          খবর এল, ইরাবতীর সাগর-মোহানাতে

         ওদের জাহাজ ডুবে গেছে কিসের ধাক্কা খেয়ে।

                   আবার ভাগ্য নেয়ে

শৈলরে তার সঙ্গে নিয়ে কোন্‌ পারে হায় গেল নৌকো বেয়ে

          কেন এল কেনই গেল কেই বা তাহা জানে।

               নিমন্ত্রণটি রেখে গেল শুধু আমার প্রাণে।

          যাব যাব যাব, দিদি, অধিক দেরি নাই,

তিন-সত্যি আছে তোমার, সে-কথা কি ভুলতে পারি ভাই।

      আরো একটি চিহ্ন তাহার রেখে গেছে ঘরে

                   খবর পেলেম পরে।

                   গালিয়ে বুকের ব্যথা

          লিখে রাখি এইখানে সেই কথা।

দিনের পরে দিন চলে যায়, ওদের বাড়ি যাই নে আমি আর।

               নিয়ে আপন একলা প্রাণের ভার

                       আপন মনে

                  থাকি আপন কোণে।

               হেনকালে একদা মোর ঘরে

          সন্ধ্যাবেলায় বাপ এল তার কিসের তরে।

               বললে, “খুড়ো একটা কথা আছে,

                   বলি তোমার কাছে।

     শৈল যখন ছোটো ছিল, একদা মোর বাক্স খুলে দেখি

               হিসাব-লেখা খাতার ‘পরে এ কী

হিজিবিজি কালির আঁচড়। মাথায় যেন পড়ল ক্রোধের বাজ।

               বোঝা গেল শৈলরি এ কাজ।

     মারা-ধরা গালিমন্দ কিছুতে তার হয় না কোনো ফল,–

          হঠাৎ তখন মনে এল শাস্তির কৌশল।

                   মানা করে দিলেম তারে

               তোমার বাড়ি যাওয়া একেবারে।

     সবার চেয়ে কঠিন দন্ড! চুপ করে সে রইল বাক্যহীন

     বিদ্রোহিণী বিষম ক্রোধে। অবশেষে বারো দিনের দিন

          গরবিনী গর্ব ভেঙে বললে এসে, “আমি

                   আর কখনো করব না দুষ্টামি।’

          আঁচড়-কাটা সেই হিসাবের খাতা,

                   সেই ক’খানা পাতা

আজকে আমার মুখের পানে চেয়ে আছে তারি চোখের মতো।

     হিসাবের সেই অঙ্কগুলার সময় হল গত;–

          সে শাস্তি নেই, সে দুষ্টু নেই;

                   রইল শুধু এই

                   চিরদিনের দাগা

     শিশু-হাতের আঁচড় ক’টি আমার বুকে লাগা।”

Amar Rabindranath Logo

চিরদিনের দাগা কবিতার Romanized Version:

Opar hote epar pane kheya-nouka beye
Bhagyo neye
Dole dole anche chelemeye।
Shobai shoman tara
Ek sajite vhore-ana chapaphuler para।
Tahar pore andhakare
Kon ghore se pouchhiye dey kare!
Tokhon tader arombho hoy nobo nobo kahini-jal bona–
Dushe sukhe dinmuhurto gona।
Eke eke tin-ti meyer pore
Shoil jokhon jonmalo tar baper ghore,
Jononi tar lojja pelo; bhablo kotha theke
Obanchhito kangaltare anlo ghore deke।
Brishtidhara chaije jokhon chashi
Namlo jeno shilabrishtirashi।
Bina-dosher oporadhe shoilbalar jibon holo shuru,
Pode pode oporadher bojha holo guro।
Karon bina je-onador aponi othe jege
Bere-i chole se je apon bege।
Ma tare koy “poramukhi”, shashon kore bap,–
E kon obhishap
Hotabhagi anli boye–shudhu kebol benche-thakar pap।
Jotoki tara dito ore gali
Nirmalare dekhto molin makiye tare apon kothar kali।
Nijer moner bokartirei shoil ora koy,
Oder shoil bidhir shoil noy।
Ami briddho chinu oder proti-beshi।
Paray kebol amar shongge dushtu meyer chhilo meshameshi।
“Dada” bole
Gola amar joriye dhore bosot amar kole।
Nam shudhale shoil amay bolto hashi hashi–
“Amar nam je dushtu, shorbonashi!”
Jokon tare shudhatem tar mukhti tule dhore
“Ami ke tor bolo dekhi bhai more?”
Bolto “dada, tui je amar bor!”–
Moni kore hashashi hoto poroshor।
Biere boyosh holo tobu konomote hoy na biye tar–
Tahe baray oporadher bhar।
Obosheshe borma theke patro gelo juti।
Alpdiner chhuti;
Shubhokormo sere taratari
Meyetire shongge niye rengune tar dite hobe pari।
Shoilke jei bolte gelem hese–
“Buro bor ke hela kore nobin ke bhai boron korli sheshe?”
Omoni je tar du-chokh gelo bhese
Jhorjoriye chokher jole. Ami boli, “chhi chhi,
Keno, shoil, kandish michimichi,
Koris omongol.”
Bolte giye chokhe amar rakhte nari jol।
Bajlo biyer banshi,
Onadorer ghor chhere hay biday holo dushtu shorbonashi।
Jabar bela bole gelo, “dada, tomar roilo nimontron,
Tin-sotyi–jeyo jeyo.” “Jab, jab, jab boi ki bon.”
Ar kichu na bole
Ashirbader motir mala poriye dilen gole।
Choturtho din prate
Khobor elo, irabatir shagor-mohanate
Oder jahaj dube geche kisher dhakka kheye।
Abar bhagyo neye
Shoilre tar shongge niye kon pare hay gelo nouka beye
Keno elo kenoi gelo kei ba taha jane।
Nimontronti rekhe gelo shudhu amar prane।
Jab jab jab, didi, odhik deri nai,
Tin-sotyi ache tomar, se-kotha ki vulte pari bhai।
Aro ekti chinho tahar reke geche ghore
Khobor pelem pore।
Galiye buker byatha
Like rakhi ekhane shei kotha।
Diner pore din chole jay, oder bari jai ne ami ar।
Niye apon ekla praner bhar
Apon mone
Thaki apon kone।
Henokale ekda mor ghore
Shondhyabelay bap elo tar kisher tore।
Bolle, “khuro ekta kotha ache,
Boli tomar kache।
Shoil jokhon chhoło chhilo, ekda mor baksho khule deki
Hishab-lekha khatar ‘pare e ki
Hijibiji kalir anchor. Mathay jeno porlo krodher baj।
Bojha gelo shoilri e kaj।
Mara-dhoraha galimondo kichute tar hoy na kono fol,–
Hothat tokhon mone elo shastir koushol।
Mana kore dilen tare
Tomar bari jawa ekbare।
Shobar cheye kothin dondo! Chup kore se roilo bakyohin
Bidrohini bishom krode. Obosheshe baro diner din
Gorbini gorbo bhenge bolle ese, “ami
Ar kokhono korbo na dushtami.’
Anchor-kata shei hishaber khata,
Shei ko-khana pata
Ajke amar mukher pane cheye ache tari chokher moto।
Hishaber shei onk gular shomoy holo goto;–
Se shasti nei, se dushtu nei;
Roilo shudhu ei
Chirodiner daga
Shishu-hater anchror k’ti amar buke laga।”

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • অনাদৃত বালিকার মর্মান্তিক পরিণতি: যে মেয়েটি সারাজীবন শুধু অবহেলা, গালমন্দ ও শাসন সহ্য করেছে, জীবনের শেষ মুহূর্তে আকস্মিক মৃত্যু তার কপালে এক অপরিসীম দুঃখের সিলমোহর এঁকে দিয়েছে।
  • স্মৃতির চিরস্থায়ী ক্ষত: খাতার পাতার সামান্য আঁচড় বা ‘চিরদিনের দাগা’ হয়ে থাকা শাস্তির সেই স্মৃতিটিই কবির বুকে আজ চিরকালের বেদনা ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে বেঁচে রয়েছে।

উৎস:কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পলাতকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত