পূরবী কাব্যগ্রন্থের শেষ বসন্ত কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত বিষাদমধুর, সূর্যাস্তকালীন ও বিদায়-আবেগজড়িত লিরিক কবিতা হলো ‘শেষ বসন্ত’। জীবনের অপরাহ্ণে এসে সময় ফুরিয়ে আসার গভীর উপলব্ধি এবং তরুণী সঙ্গিনীর বসন্তোৎসবে আর কোনো ভার না হয়ে, অস্তলগ্নে একটিমাত্র ফুল তোলার স্মৃতি ও একটি ঝরে পড়া ম্লান মালার স্পর্শটুকু নিয়ে চিরবিদায় গ্রহণের আর্তি এ কবিতায় অপূর্ব সুরে ব্যক্ত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামশেষ বসন্ত
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপূরবী
রচনাকাল/রচনাস্থান১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ (আর্জেন্টিনার সান ইসিদ্রো, প্লাতা নদীর তীরে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথ্যকালে)
প্রকাশের বছর১৯২৫ (১৩৩২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরোমান্টিক বিষাদ-লিরিক ও গোধূলিলগ্নের প্রণয়-কবিতা (Elegiac Twilight Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯২৪ সালে অসুস্থতার কারণে আর্জেন্টিনায় অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয় হয় বিদুষী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর (যাঁকে কবি আদর করে ‘বিজয়া’ নাম দিয়েছিলেন)। ওকাম্পোর প্রাণোচ্ছ্বল তারুণ্য এবং কবির প্রতি তাঁর অকৃত্রিম যত্ন বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা রবীন্দ্রমানসে এক নতুন বসন্তের শিহরণ তোলে, যার ফলশ্রুতি ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থ। তবে এই পুনরুজ্জীবনের সাথে কবি সর্বক্ষণ সচেতন ছিলেন নিজের শেষ হয়ে আসা সময় ও বয়সের ব্যবধান সম্পর্কে। তরুণীর জীবনে ফাল্গুন বারবার ফিরে আসবে, কিন্তু অস্তোন্মুখ কবির জীবনে এটিই হয়তো শেষ বসন্ত। তাই তিনি কোনো কৃত্রিম দাবি বা স্মৃতির বোঝা না রেখে সূর্যাস্তের শেষ আলোটুকুর মধ্যেই ফুল কুড়ানোর ক্ষণিক আনন্দটুকু চেয়েছেন। রাত নামলে তিনি সামনের পথ ধরে নিঃশব্দে চলে যাবেন—বাতায়ন থেকে ফেলে দেওয়া একগাছি ম্লান মল্লিকার মালাটুকুই হবে তাঁর শেষ স্পর্শ ও অন্তিম পাথেয়।

সম্পূর্ণ কবিতা:

          আজিকার দিন না ফুরাতে

          হবে মোর এ আশা পুরাতে–

                শুধু এবারের মতো

                বসন্তের ফুল যত

          যাব মোরা দুজনে কুড়াতে।

তোমার কাননতলে ফাল্গুন আসিবে বারম্বার,

তাহারি একটি শুধু মাগি আমি দুয়ারে তোমার।

          বেলা কবে গিয়াছে বৃথাই

          এতকাল ভুলে ছিনু তাই।

                হঠাৎ তোমার চোখে

                দেখিয়াছি সন্ধ্যালোকে

          আমার সময় আর নাই।

তাই আমি একে একে গনিতেছি কৃপণের সম

ব্যাকুল সংকোচভরে বসন্তশেষের দিন মম।

          ভয় রাখিয়ো না তুমি মনে!

          তোমার বিকচ ফুলবনে

                দেরি করিব না মিছে,

                ফিরে চাহিব না পিছে

          দিনশেষে বিদায়ের ক্ষণে।

চাব না তোমার চোখে আঁখিজল পাব আশা করি

রাখিবারে চিরদিন স্মৃতিরে করুণারসে ভরি।

          ফিরিয়া যেয়ো না, শোনো শোনো,

          সূর্য অস্ত যায় নি এখনো।

                সময় রয়েছে বাকি;

                সময়েরে দিতে ফাঁকি

          ভাবনা রেখো না মনে কোনো।

পাতার আড়াল হতে বিকালের আলোটুকু এসে

আরো কিছুখন ধরে ঝলুক তোমার কালো কেশে।

          হাসিয়া মধুর উচ্চহাসে

          অকারণ নির্মম উল্লাসে,

                বনসরসীর তীরে

                ভীরু কাঠবিড়ালিরে

          সহসা চকিত কোরো ত্রাসে।

ভুলে-যাওয়া কথাগুলি কানে কানে করায়ে স্মরণ

দিব না মন্থর করি ওই তব চঞ্চল চরণ।

          তার পরে যেয়ো তুমি চলে

          ঝরা পাতা দ্রুতপদে দোলে,

                নীড়ে-ফেরা পাখি যবে

                অস্ফুট কাকলিরবে

          দিনান্তেরে ক্ষুব্ধ করি তোলে।

বেণুবনচ্ছায়াঘন সন্ধ্যায় তোমার ছবি দূরে

মিলাইবে গোধূলির বাঁশরির সর্বশেষ সুরে।

          রাত্রি যবে হবে অন্ধকার

          বাতায়নে বসিয়ো তোমার।

                সব ছেড়ে যাব, প্রিয়ে,

                সমুখের পথ দিয়ে,

          ফিরে দেখা হবে না তো আর।

ফেলে দিয়ো ভোরে-গাঁথা ম্লান মল্লিকার মালাখানি।

সেই হবে স্পর্শ তব, সেই হবে বিদায়ের বাণী।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Ajikar din na furate

Hobe mor e asha purate—

Shudhu ebarer moto

Boshonter phul joto

Jabo mora dujone kurate.

Tomar kanan-tale Falgun asibe barambar,

Tahari ekti shudhu magi ami duare tomar.

Bela kobe giyechhe brithai

Etokal bhule chhinu tai.

Hothat tomar chokhe

Dekhechhi sondhyaloke

Amar shomoy ar nai.

Tai ami eke eke gonitechhi kriponer som

Byakul shongkoch-bhore boshonto-shesher din mom.

Bhoy rakhiyo na tumi mone!

Tomar bikoch phulbone

Deri koribo na miche,

Phire chahibo na pichhe

Dinsheshe biday-er khone.

Chab na tomar chokhe aankhijol pab asha kori

Rakhivare chirodin smritire korunaroshe bhori.

Phiriya jeyo na, shono shono,

Surjo ost jay ni ekhono.

Shomoy royechhe baki;

Shomoyere dite phanki

Bhavna rekho na mone kono.

Patar aral hote bikaler alok-tuku eshe

Aro kichhukkhon dhore jholuk tomar kalo keshe.

Hasiya modhur uccho-hashe

Akaran nirmom ullashe,

Bonsorosir tire

Bhiru kathbiralire

Sohosha chokito koro trase.

Bhule-jaoa kothaguli kane kane karae smoron

Dibo na monthor kori oi tob chonchol choron.

Tar pore jeyo tumi chole

Jhora pata drutopode dole,

Nire-phera pakhi jabe

Osphut kakoli-rabe

Dinantore khubdho kori tole.

Benubon-chhayaghon sondhyay tomar chhobi dure

Milaibe godhulir banshorir shorbosesh sure.

Ratri jabe hobe andhokar

Batayane bosiyo tomar.

Shob chhere jabo, priye,

Shomukher poth diye,

Phire dekha hobe na to ar.

Phele dio bhore-gantha mlan mallikar malakhani.

Sei hobe sparsho tob, sei hobe biday-er bani.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • সময় ফুরানোর সচেতনতা ও কৃপণের মতো ক্ষণ গণনা:
    “হঠাৎ তোমার চোখে / দেখিয়াছি সন্ধ্যালোকে / আমার সময় আর নাই। / তাই আমি একে একে গনিতেছি কৃপণের সম / ব্যাকুল সংকোচভরে বসন্তশেষের দিন মম।”
    — প্রেমিকার তরুণ চোখের দিকে তাকিয়েই কবি হঠাৎ নিজের বার্ধক্য ও জীবনের গোধূলিবেলার সত্যটি উপলব্ধি করেন। জীবনের সঞ্চয় যেখানে শেষ হয়ে আসছে, সেখানে প্রতিটি মুহূর্তকে কৃপণের ধনের মতো হিসাব করে আঁকড়ে ধরার ব্যাকুলতা ও সংকোচ জেগে ওঠে।
  • বন্ধনহীন বিদায় ও নির্ভার সান্নিধ্য:
    “দেরি করিব না মিছে, / ফিরে চাহিব না পিছে / দিনশেষে বিদায়ের ক্ষণে। / চাব না তোমার চোখে আঁখিজল পাব আশা করি / রাখিবারে চিরদিন স্মৃতিরে করুণারসে ভরি।”
    — কবির ভালোবাসায় কোনো অধিকারবোধ বা করুণা ভিক্ষার দীনতা নেই। তিনি প্রিয়জনের চোখে জল বা স্মৃতির কৃত্রিম বোঝা রেখে যেতে চান না; বরং বিদায়ের মুহূর্তটিকে রাখতে চান শান্ত, সুন্দর ও অভিযোগহীন।
  • ম্লান মালার নিঃশব্দ বিদায়স্পর্শ:
    “রাত্রি যবে হবে অন্ধকার / বাতায়নে বসিয়ো তোমার। / সব ছেড়ে যাব, প্রিয়ে, / সমুখের পথ দিয়ে, / ফিরে দেখা হবে না তো আর। / ফেলে দিয়ো ভোরে-গাঁথা ম্লান মল্লিকার মালাখানি।”
    — দিনের আলো মিলিয়ে যখন রাত নামবে, কবি তখন চিরতরে প্রস্থান করবেন। বাতায়ন থেকে নিঃশব্দে ছুঁড়ে দেওয়া ভোরের সেই বাসি ও ম্লান মল্লিকার মালাটিই হবে বিদায়লগ্নের চরম আশীর্বাদ ও স্পর্শ। এই নির্লিপ্ত অথচ গভীর আত্মত্যাগী সমর্পণেই কবিতাটির মহিমা।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও ঐতিহাসিক সংকলন-তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পূরবী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংকলন ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন