সেঁজুতি কাব্যগ্রন্থের ‘প্রাণের দান’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সেঁজুতি’ (১৯৩৮) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর দর্শনমূলক কবিতা হলো ‘প্রাণের দান’। এই কবিতায় কবি একটি গাছের পাতা ঝরানোর অনায়াস প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জীবন ও মৃত্যুর এক অমোঘ দার্শনিক সত্য এবং মৃত্যুকে নির্লিপ্তভাবে গ্রহণ করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন।

কবিতার মূল তথ্য
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামপ্রাণের দান
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসেঁজুতি
প্রকাশের বছর১৯৩৮ (১৩৪৫ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদর্শনমূলক ও প্রকৃতি-প্রেক্ষিত কবিতা (Philosophical and Nature-inspired Poem)
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩৮ সালে প্রকাশিত ‘সেঁজুতি’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের জীবনের সায়াহ্নবেলার রচনা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কবি মৃত্যুচিন্তা ও সংসারের প্রতি একপ্রকার নির্লিপ্ততা অনুভব করছিলেন। ‘প্রাণের দান’ কবিতায় কবি একটি বৃক্ষকে সম্বোধন করেছেন, যে তার সঞ্চিত ঐশ্বর্য বা পাতাকে অনায়াসে ঝরিয়ে দেয়। গাছের কাছে পাওয়া ও দেওয়ার মধ্যে কোনো কৃপণতা বা আসক্তি নেই। সে যেমন আনন্দে বাঁচে, তেমনি মৃত্যুর কাছেও নিজেকে সহজে সঁপে দেয়। কবিও গাছের মতো এই আনন্দিত ঔদাসীন্য বা নির্লিপ্ততা নিয়ে মৃত্যুকে চিনে নিতে এবং নিজের প্রাণকে মৃত্যুর হাতে সহজে তুলে দিতে চেয়েছেন।

প্রাণের দান – সম্পূর্ণ কবিতা

অব্যক্তের অন্তঃপুরে উঠেছিলে জেগে,

তার পর হতে তরু, কী ছেলেখেলায়

নিজেরে ঝরায়ে চল চলাহীন বেগে,

পাওয়া দেওয়া দুই তব হেলায়-ফেলায়।

প্রাণের উৎসাহ নাহি পায় সীমা খুঁজি

মর্মরিত মাধুর্যের সৌরভসম্পদে।

মৃত্যুর উৎসাহ সেও অফুরন্ত বুঝি

জীবনের বিত্তনাশ করে পদে পদে।

আপনার সার্থকতা আপনার প্রতি

আনন্দিত ঔদাসীন্যে; পাও কোন্‌ সুধা

রিক্ততায়; পরিতাপহীন আত্মক্ষতি

মিটায় জীবনযজ্ঞে মরণের ক্ষুধা।

এমনি মৃত্যুর সাথে হোক মোর চেনা,

প্রাণেরে সহজে তার করিব খেলেনা।

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version
Obyokter ontopure uthechhile jege,
Tar por hote toru, ki chhelekhelay
Nijere jhoraye cholo cholahin bege,
Pawa dewa dui tobo helay-phelay.
Praner utshaho nahi pay shima khunji
Mormorito madhurjer shourobhoshompode.
Mrityur utshaho sheo ophuronto bujhi
Jiboner bittonash kore pode pode.
Aponar sharthokota aponar proti
Anondito oudashinye; pao kon shudha
Riktotay; poritaphin atmokkhoti
Mitay jibonjogge moroner khudha.
Emni mrityur shathe hok mor chena,
Pranere shohoje tar koribo khelena.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
  • তরুর নির্লিপ্ত আত্মদান:
    “অব্যক্তের অন্তঃপুরে উঠেছিলে জেগে, / তার পর হতে তরু… পাওয়া দেওয়া দুই তব হেলায়-ফেলায়।”
    — কবি গাছকে উদ্দেশ করে বলছেন যে, জন্ম নেওয়ার পর থেকেই গাছ যেন এক অবিরাম ছেলেখেলায় মত্ত। সে যেমন প্রকৃতির কাছ থেকে অনায়াসে গ্রহণ করে, তেমনি কোনো পিছুটান ছাড়াই অবলীলায় নিজের পাতা ঝরিয়ে দেয়। তার এই পাওয়া ও দেওয়ার মাঝে এক অপরূপ নির্লিপ্ততা রয়েছে।
  • জীবন ও মৃত্যুর অবিচ্ছেদ্য খেলা:
    “মৃত্যুর উৎসাহ সেও অফুরন্ত বুঝি / জীবনের বিত্তনাশ করে পদে পদে… পরিতাপহীন আত্মক্ষতি / মিটায় জীবনযজ্ঞে মরণের ক্ষুধা।”
    — পৃথিবীতে জীবনের যেমন এক সীমাহীন উচ্ছ্বাস আছে, মৃত্যুর উৎসাহও তেমনি অফুরন্ত। মৃত্যু পদে পদে জীবনের সঞ্চয়কে হরণ করে। কিন্তু গাছ কোনো পরিতাপ বা আক্ষেপ ছাড়াই তার এই শূন্যতাকে বা আত্মক্ষতিকে মেনে নেয় এবং জীবনযজ্ঞে মৃত্যুর ক্ষুধাকে তৃপ্ত করে।
  • মৃত্যুকে সহজে বরণ করার আকাঙ্ক্ষা:
    “এমনি মৃত্যুর সাথে হোক মোর চেনা, / প্রাণেরে সহজে তার করিব খেলেনা।”
    — কবিতার শেষে কবি নিজের জীবনের জন্য এই একই শিক্ষা কামনা করেছেন। তিনি চান গাছের মতো তাঁরও যেন মৃত্যুর সাথে এমন এক সহজ ও স্বাভাবিক পরিচয় ঘটে, যাতে কোনো আক্ষেপ বা ভয় ছাড়াই তিনি তাঁর প্রাণকে মৃত্যুর হাতে একটি খেলনার মতো সহজে তুলে দিতে পারেন।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সেঁজুতি কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের ইংরেজি অংশ এবং ‘আরও দেখুন’ জাতীয় অপ্রাসঙ্গিক অংশ পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন