বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীথিকা’ (১৯৩৫) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম একটি মরমিয়া, গভীর আত্মোপলব্ধিমূলক ও দার্শনিক সৃষ্টি হলো ‘সত্যরূপ’। এই কবিতায় চঞ্চল ও মায়াময় সংসারের কোলাহল এবং প্রাত্যহিক জীবনের পরিচয়হীন ভিড়ের মাঝে হঠাৎ প্রিয়জনের বা পরম সত্তার স্পর্শে জীবনের প্রকৃত সত্য ও মহিমা উপলব্ধির এক অপূর্ব রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | সত্যরূপ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | বীথিকা |
| কবিতার ধরন | মরমি ও আত্মোপলব্ধিমূলক লিরিক কবিতা (Spiritual / Introspective Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের কাব্যরচনার এক অনন্য নিদর্শন হলো ‘বীথিকা’ কাব্যগ্রন্থটি। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা, আত্মিক অনুভূতি এবং মানবজীবনের সূক্ষ্ম সত্যের প্রকাশ দেখা যায়। ‘সত্যরূপ’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে, মানুষের জীবন নানা চঞ্চলতা, ধূলিমলিন পথ এবং মায়ার আবর্তে ঘেরা। কত মানুষ আসে, অতিথি আশ্রয় নেয় এবং প্রাত্যহিক জানাশোনার পরও তারা যেন একরকম পরিচয়হীন কুজ্ঝটিকালোকে হারিয়ে যায়। কিন্তু এই কোলাহলের বাইরে যখন সন্ধ্যার নৈঃশব্দ্য নেমে আসে এবং সেই অজানা সত্তা এসে অস্পষ্টতা ছিন্ন করে কাছে দাঁড়ায়, তখন কবির উপলব্ধি হয় যে তিনি মহাকালদেবতার মন্দিরের কত কাছাকাছি আছেন। বিশ্বের মহিমা এবং অনির্বচনীয় প্রেম তখন দেহ, মন ও প্রাণে এক অন্তহীন বিস্ময়ে প্রকাশ পায়।
সত্যরূপ কবিতা (সম্পূর্ণ)
অন্ধকারে জানি না কে এল কোথা হতে–
মনে হল তুমি;
রাতের লতা-বিতান তারার আলোতে
উঠিল কুসুমি।
সাক্ষ্য আর কিছু নাই, আছে শুধু একটি স্বাক্ষর,
প্রভাত-আলোক তলে মগ্ন হলে প্রসুপ্ত প্রহর
পড়িব তখন।
ততক্ষণ পূর্ণ করি থাক মোর নিস্তব্ধ অন্তর
তোমার স্মরণ।
কত লোক ভিড় করে জীবনের পথে
উড়াইয়া ধূলি;
কত যে পতাকা ওড়ে কত রাজপথে
আকাশ আকুলি।
প্রহরে প্রহরে যাত্রী ধেয়ে চলে খেয়ার উদ্দেশে–
অতিথি আশ্রয় মাগে শ্রান্তদেহে মোর দ্বারে এসে
দিন-অবসানে,
দূরের কাহিনী বলে, তার পরে রজনীর শেষে
যায় দূর-পানে।
মায়ার আবর্তে রচে আসায় যাওয়ায়
চঞ্চল সংসারে।
ছায়ার তরঙ্গ যেন ধাইছে হাওয়ায়
ভাঁটায় জোয়ারে।
ঊর্ধ্বকণ্ঠে ডাকে কেহ, স্তব্ধ কেহ ঘরে এসে বসে–
প্রত্যহের জানাশোনা, তবু তারা দিবসে দিবসে
পরিচয়হীন।
এই কুজ্ঝটিকালোকে লুপ্ত হয়ে স্বপ্নের তামসে
কাটে জীর্ণ দিন।
সন্ধ্যার নৈঃশব্দ্য উঠে সহসা শিহরি;
না কহিয়া কথা
কখন যে আস কাছে, দাও ছিন্ন করি
মোর অস্পষ্টতা।
তখন বুঝিতে পারি, আছি আমি একান্তই আছি
মহাকালদেবতার অন্তরের অতি কাছাকাছি
মহেন্দ্রমন্দিরে;
জাগ্রত জীবনলক্ষ্মী পরায় আপন মাল্যগাছি
উন্নমিত শিরে।
তখনই বুঝিতে পারি, বিশ্বের মহিমা
উচ্ছ্বসিয়া উঠি
রাখিল সত্তায় মোর রচি নিজ সীমা
আপন দেউটি।
সৃষ্টির প্রাঙ্গণতলে চেতনার দীপশ্রেণী-মাঝে
সে দীপে জ্বলেছে শিখা উৎসবের ঘোষণার কাজে;
সেই তো বাগানে,
অনির্বচনীয় প্রেম অন্তহীন বিস্ময়ে বিরাজে
দেহে মনে প্রাণে।
সত্যরূপ কবিতার Romanized Version:
Andhakare jani na ke elo kotha hote–
Mone holo tumi;
Rater lota-bitan tarar alote
Uthilo kusumi.
Sakkho ar kichhu nai, ache shudhu ekti sakhor,
Probhat-alok tole mogno hole prosupto prohor
Poribo tokhon.
Totokkhon purno kori thako mor nistobho ontor
Tomar shoron.
Koto lok bhir kore jiboner pothe
Uriya dhuli;
Koto je pataka ore koto rajpothe
Akash akuli.
Prohore prohore jatri dheye chole kheyar uddeshe–
Atithi ashroy mage shrantodehe mor dware ese
Din-obsane,
Durer kahini bole, tar pore ronir shese
Jay dur-pane.
Mayar aborte roche ashay jaoyay
Chonchol shongshare.
Chhayar torongo jeno dhaiche haway
Bhatay joyare.
UrdhhokonThe dake keho, stobdho keho ghore ese bose–
Protyoher janashona, tobu tara dibose dibose
Porichoyhin.
Ei kujjhajotiloke lupto hoye shopner tamase
Kate jirno din.
Shondhyar noishobdo uthe sohosha sihri;
Na kohiya kotha
Kokon je asho kase, dao chinno kori
Mor ospostota.
Tokhon bujhite pari, achhi ami ekantoi achhi
Mohakaldebatar ontorer oti kachakachi
Mohendromondire;
Jagroto jibonlokkhi poray apon malygachi
Unnomito shire.
Tokhon-i bujhite pari, bishwer mohima
Uchchhosiya uthi
Rakhilo shottay mor rochi nij shima
Apon deuti.
Srishtir prangontole chetonar dipshreni-majhe
Se dipe jwoleche shikha utsober ghoshonar kaje;
Shei to bagane,
Onirbchoniyo prem ontohin bishmoye biraje
Dehe mone prane.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- সংসারের কোলাহলে আত্মোপলব্ধি: জাগতিক ব্যস্ততা ও পরিচমহীন ভিড়ের মাঝেও সন্ধ্যার নৈঃশব্দ্যে প্রিয়তম বা পরম সত্তার সান্নিধ্য মানুষের আত্মাকে মহিমান্বিত করে তোলে।
- বিশ্বের মহিমা ও প্রেমের প্রকাশ: সৃষ্টির প্রাঙ্গণে চেতনার দীপের শিখা এবং অনির্বচনীয় প্রেমের অন্তহীন বিস্ময় দেহ, মন ও প্রাণকে পরিপূর্ণ করে তোলে—এই আধ্যাত্মিক সত্যই কবিতার মূল সুর।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (বীথিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।