মহুয়া কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ধান কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের একটি পরম আধ্যাত্মিক, সংহত ও দার্শনিক বিরহ-চেতনার লিরিক কবিতা হলো ‘অন্তর্ধান’। পার্থিব উপস্থিতির অবসান বা বিদায়ের পটভূমিতে প্রিয়তমের চিরন্তন রূপ কীভাবে অন্তরের নিভৃত লোকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এবং বিচ্ছেদের হোমানলে পুড়ে প্রেম কীভাবে পূজার মূর্তিতে রূপ নেয়—মাত্র আট চরণে কবি তা নিখুঁত ব্যঞ্জনায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামঅন্তর্ধান
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থমহুয়া
প্রকাশের বছর১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধ্যাত্মিক বিরহ-লিরিক ও দার্শনিক প্রণয়-কবিতা (Philosophical / Devotional Romantic Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘মহুয়া’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথ বারবার দেখিয়েছেন যে বাহ্যিক বিচ্ছেদ বা দৃশ্যমান অন্তর্ধানই ভালোবাসার শেষ কথা নয়। ইন্দ্রিগ্রাহ্য রূপ যখন চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যায়, তখনই অন্তরের অলক্ষ্য জগতে প্রিয়তমের চিরন্তন ও অবিনাশী রূপের আবির্ভাব ঘটে। বাইরের পৃথিবী অন্ধকারে ঢেকে গেলেও প্রিয় যেন অন্তরের মন্দিরে এক অনির্বাণ দেউলদীপ জ্বালিয়ে রেখে যান। বাহ্যিক শূন্যতা তখন নিজস্ব মহিমায় অন্তরে পূর্ণ হয়ে ওঠে। বিচ্ছেদের দুঃখের আগুনেই কামনা-বাসনার মলিনতা দূর হয় এবং প্রেম এক পবিত্র ‘পূজামূর্তি’ ধারণ করে দুঃখের আলোয় নিজেকে প্রকাশ করে।

সম্পূর্ণ কবিতা:

তব অন্ত-র্ধানপটে হেরি তব রূপ চিরন্তন।

অন্তরে অলক্ষ্যলোকে তোমার পরম-আগমন।

                              লভিলাম চিরস্পর্শমণি;

তোমার শূন্যতা তুমি পরিপূর্ণ করেছ আপনি।

জীবন আঁধার হল, সেই ক্ষণে পাইনু সন্ধান

সন্ধ্যার দেউলদীপ অন্তরে রাখিয়া গেছ দান।

                               বিচ্ছেদেরি হোমবহ্নি হতে

পূজামূর্তি ধরে প্রেম, দেখা দেয় দুঃখের আলোতে।

Amar Rabindranath Logo

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Tobo ontordhanpote heri tobo rup chironton.
Ontore olokkholoke tomar porom-agomon.
Lobhilam chirosporshomoni;
Tomar shunnota tumi poripurno korechho aponi.
Jibon andhar holo, shei khone painu shondhan
Shondhyar deulodip ontore rakhiya gechho dan.
Bichchhederi homobohni hote
Pujamurti dhore prem, dekha dey dukkher alote.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • দৃশ্যমান অন্তর্ধান ও চিরন্তন আবির্ভাব:
    “তব অন্তর্ধানপটে হেরি তব রূপ চিরন্তন। / অন্তরে অলক্ষ্যলোকে তোমার পরম-আগমন। / লভিলাম চিরস্পর্শমণি; / তোমার শূন্যতা তুমি পরিপূর্ণ করেছ আপনি।”
    — চোখের সামনে থেকে প্রিয়জনের হারিয়ে যাওয়া কোনো শূন্যতা তৈরি করে না, বরং বাহ্যিক রূপের আড়াল সরিয়ে তার অসীম আত্মিক রূপকে উন্মোচিত করে। সেই অন্তর্ধানের ক্যানভাসেই ফুটে ওঠে শাশ্বত রূপ। প্রিয়তম নিজের অভাবটুকু নিজেই অন্তরের আলো দিয়ে পূর্ণ করে দেন।
  • অন্ধকারে দেউলদীপের সন্ধান:
    “জীবন আঁধার হল, সেই ক্ষণে পাইনু সন্ধান / সন্ধ্যার দেউলদীপ অন্তরে রাখিয়া গেছ দান।”
    — জীবনের বাহ্যিক আলো যখন নিভে যায়, পার্থিব কোলাহল স্তব্ধ হয়, তখনই অন্তরের গোপন মন্দিরে থাকা প্রদীপের সন্ধান মেলে। প্রিয়তম বিদায় নেওয়ার আগে অন্তরে যে স্মৃতির আলো জ্বালিয়ে রেখে গেছেন, তা অনন্ত পথের দিশারি হয়।
  • হোমানল থেকে পূজামূর্তির রূপান্তর:
    “বিচ্ছেদেরি হোমবহ্নি হতে / পূজামূর্তি ধরে প্রেম, দেখা দেয় দুঃখের আলোতে।”
    — বিরহের তীব্র দহন কেবল যাতনা দেয় না, তা যজ্ঞাগ্নির মতো আত্মাকে বিশুদ্ধ করে। সুখের দিনে যা ছিল পার্থিব মোহ বা অনুরাগ, বিচ্ছেদের সেই দুঃসহ দুঃখের আগুনে পুড়ে তা-ই এক পরম পূজার মূর্তিতে রূপায়িত হয়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ (অনুলিপির অতিরিক্ত হাইফেন বর্জনপূর্বক প্রমিত ‘অন্তর্ধান’ রূপসহ), ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মহুয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন