মহুয়া কাব্যগ্রন্থের মুক্তি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের একটি প্রাণবন্ত, ছন্দচঞ্চল ও নিসর্গ-জাগরণের লিরিক কবিতা হলো ‘মুক্তি’। রাতের মোহঘোর ও জটিল ভাবনার গুহা থেকে বেরিয়ে ভোরের আলো, পাখির ডাক, ঘাসের স্পর্শ ও বাতাসের হিল্লোলে আত্মাকে বিশ্বপ্রকৃতির মাঝে মুক্ত করে দেওয়ার আনন্দময় স্ফুরণ এ কবিতায় রূপায়িত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামমুক্তি
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থমহুয়া
প্রকাশের বছর১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপ্রকৃতিচেতনামূলক রোমান্টিক লিরিক ও আত্মজাগরণের কবিতা (Lyric of Nature and Spiritual Liberation)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৩৩৬ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘মহুয়া’ কাব্যে প্রেম ও প্রকৃতির মেলবন্ধনে মানবচেতনার নবজাগরণ এক বিশেষ মাত্রা পেয়েছে। কবিতাটিতে ‘মুক্তি’ কোনো সন্ন্যাস বা বৈরাগ্য নয়, বরং প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধের অফুরান প্রবাহে নিজেকে নিঃশেষে মেলে ধরা। ভোরের পাখির দৃষ্টি যেন কবির অন্তরের পুরানো ও জীর্ণ স্বপ্নের বাঁধন কেটে দেয়। রুদ্ধ মন এক লহমায় উন্মুক্ত হয় অসীম আকাশের কোলে। ঘাসের ওপর শিশিরভেজা স্পর্শ, আমের মুকুলের গন্ধ, ঝাউপাতার দোলা আর বাতাসের খেয়াল—সব মিলিয়ে পার্থিব লাভ-ক্ষতির সমস্ত সংকীর্ণ হিসেব তুচ্ছ হয়ে যায়। প্রকৃতির উন্মুক্ত অঙ্গনে একদা ফেলে আসা অবুঝ শৈশবের আনন্দময় খেলাঘরের ডাক কবিকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলে।

সম্পূর্ণ কবিতা:

ভোরের পাখি নবীন আঁখিদুটি

       পুরানো মোর স্বপনডোর

            ছিঁড়িল কুটিকুটি।

       রুদ্ধ মন গগনে গেল খুলি,

      বিজুলি হানি দৈববাণী

            বক্ষে উঠে দুলি।

      ঘাসের ছোঁওয়া তৃণশয়নছায়ে

মাটির যেন মর্মকথা বুলায়ে দিল গায়ে;

      আমের বোল, ঝাউয়ের দোল,

            ঢেউয়ের লুটিপুটি

      মিলি সকলে কী কোলাহলে

            বক্ষে এল জুটি।

ভোরের পাখি নবীন আঁখিদুটি

      গুহাবিহারী ভাবনা যত

            নিমেষে নিল লুটি।

      কী ইঙ্গিতে আচম্বিতে

            ডাকিল লীলাভরে

      দুয়ারখোলা পুরানো খেলাঘরে–

      যেখানে ব ‘সে সবার কাছাকাছি

       অজানা ভাবে অবুঝ গান

            একদা গাহিয়াছি।

প্রাণের মাঝে ছুটে-চলার

            খেপামি এল ছুটি,

       লাভের লোভ, ক্ষতির ক্ষোভ

            সকলি গেল টুটি।

ভোরের পাখি নবীন আঁখিদুটি

       শুকতারাকে যেমনি ডাকে

            প্রাণে সে উঠে ফুটি।

       অরুণরাঙা চেতনা জাগে চিতে–

       ঝুমকোলতা জানায় কথা

            রঙিন রাগিণীতে।

       মনের ‘পরে খেলায় বায়ুবেগে

       কত-যে মায়া-রঙের ছায়া

            খেয়ালে-পাওয়া মেঘে;

       বুলায় বুকে ম্যাগ্‌নোলিয়া

            কৌতূহলী মুঠি,

       অতি বিপুল ব্যাকুলতায়

            নিখিলে জেগে উঠি।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Bhorer pakhi nobin ankhiduti
Purano mor swoponodor
Chhinrilo kutikuti.
Ruddho mon gogone gelo khuli,
Bijuli hani doibobani
Bokkhe uthe duli.
Ghasher chhonwa trinoshoyonchhaye
Matir jeno mormokotha bulaye dilo gaye;
Amer bol, jhauer dol,
Dheuer lutiputi
Mili shokole ki kolahole
Bokkhe elo juti.
Bhorer pakhi nobin ankhiduti
Guhbihari bhabna joto
Nimeshe nilo luti.
Ki inggite achombite
Dakilo lilabhore
Duyarkhola purano khelaghore–
Jekhane bo’se shobar kachhakachhi
Ojana bhabe obujh gan
Ekoda gahiyachhi.
Praner majhe chhute-cholar
Khepami elo chhuti,
Labher lobh, khotir khobh
Shokoli gelo tuti.
Bhorer pakhi nobin ankhiduti
Shuktara-ke jemni dake
Prane she uthe phuti.
Orunranga chetona jage chite–
Jhumkolota janay kotha
Rongin raginite.
Moner ‘pore khelay bayubege
Koto-je maya-ronger chhaya
Kheyale-pawa meghe;
Bulay buke magnolia
Koutuholi muthi,
Oti bipul bakulotay
Nikhile jege uthi.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • ভোরের আলোয় মোহভঙ্গ ও অন্তর্জাগরণ:
    “ভোরের পাখি নবীন আঁখিদুটি / পুরানো মোর স্বপনডোর / ছিঁড়িল কুটিকুটি। / রুদ্ধ মন গগনে গেল খুলি,”
    — ভোরের আগমন কেবল পার্থিব অন্ধকারের অবসান নয়, তা অন্তরের বহুদিনের জড়তা ও অলীক স্বপ্নের গ্রন্থি ছিন্ন করার প্রতীক। বন্ধ মনের কপাট খুলে গিয়ে তা বিশ্বাকাশের উদারতায় লীন হয়ে যায়।
  • প্রকৃতির সহজিয়া স্পর্শ ও বৈষয়িক বন্ধনমুক্তি:
    “প্রাণের মাঝে ছুটে-চলার / খেপামি এল ছুটি, / লাভের লোভ, ক্ষতির ক্ষোভ / সকলি গেল টুটি।”
    — ঘাসের নরম বিছানা, আমের মুকুল ও নদীর ঢেউয়ের সহজ আনন্দে অবগাহন করার ফলে মানুষের কৃত্রিম স্বার্থচিন্তা খসে পড়ে। বৈষয়িক জগতের লাভ ও ক্ষতির হিসাব মুছে গিয়ে অন্তরে এক নির্লিপ্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত মুক্তি নেমে আসে।
  • নিখিল চেতনায় আত্মবিলোপ:
    “বুলায় বুকে ম্যাগ্‌নোলিয়া / কৌতূহলী মুঠি, / অতি বিপুল ব্যাকুলতায় / নিখিলে জেগে উঠি।”
    — ম্যাগ্‌নোলিয়া ফুলের উন্মেষ ও রঙিন মেঘের খেলার মধ্য দিয়ে কবির চেতনা ক্ষুদ্র ব্যক্তিসীমানা অতিক্রম করে মহাবিশ্বের সাথে একাত্ম হয়। এই বিপুল ব্যাকুলতাই কবিকে নতুন করে সমগ্র নিখিলের মাঝে জাগ্রত করে তোলে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মহুয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন