মহুয়া কাব্যগ্রন্থের রাখিপূর্ণিমা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর প্রতীক্ষাময়, বীরোচিত ও বিরহবিধুর রোমান্টিক লিরিক কবিতা হলো ‘রাখিপূর্ণিমা’। যৌবনের চরম পূর্ণলগ্নে যোগ্য বীরের হাতে অন্তরের আত্মনিবেদনের পবিত্র রাখি বাঁধার আকুল আকাঙ্ক্ষা এবং সেই বীরযাত্রীর ক্ষণিক উপস্থিতিকে অর্ধ-জাগরণে হারিয়ে ফেলার অনুশোচনা এ কবিতায় এক মহিমান্বিত চিত্রকল্পে রূপায়িত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামরাখিপূর্ণিমা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থমহুয়া
প্রকাশের বছর১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনবীররসাত্মক রোমান্টিক প্রণয়-লিরিক ও প্রতীক্ষার কবিতা (Heroic Romantic Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থে প্রেমকে কেবল মৃদু ও কোমল অনুভূতিরূপে নয়, পৌরুষদীপ্ত সংগ্রাম ও দুঃসাধ্য সাধনার অনুষঙ্গ হিসেবেও দেখা হয়েছে। ‘রাখিপূর্ণিমা’ কবিতায় রাখি কেবল সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন নয়, বরং যৌবনের চরম অর্ঘ্য ও বীরের প্রতি নারীর চিরন্তন বরণডালা। মেঘাচ্ছন্ন এক দুর্যোগপূর্ণ দিনে নায়িকার মনে গভীর সংশয় জাগে—তার যৌবনের এই পরম লগ্ন কি পাত্রহীন হয়ে বয়ে যাবে? একদা প্রচ্ছন্ন গোধূলিতে সেই কাঙ্ক্ষিত বীর অশ্বারোহী হয়ে দ্বারের সামনে এসেছিল, কিন্তু নায়িকা তখন ছিল সুপ্তির আবেশে। সে বীর কোনো করাঘাত করেনি; সমুদ্রের কলরোলে মিলিয়ে গেছে তার ঘোড়ার খুরের শব্দ। রজনীর শেষে জেগে উঠে নারী অনুধাবন করে—অপরিচিত বীর কোনো এক দুর্গম পথের সাধনায় চলে গেছে, আর সে একা দাঁড়িয়ে রইল শূন্য অন্তরে।

সম্পূর্ণ কবিতা:

কাহারে পরাব রাখি যৌবনের রাখিপূর্ণিমায়,
হে মোর ভাগ্যের দেব! লগ্ন যেন বহে নাহি যায়।
মেঘে আজি আবিষ্ট অম্বর, ঘনবৃষ্টি-আচ্ছাদনে
অস্পষ্ট আলোর মন্ত্র আকাশ নিবিষ্ট হয়ে শোনে,
বুঝিতে পারে না ভালো। আমি ভাবিতেছি একা বসে।
আমার বাঞ্ছিত কবে বাহিরিল প্রচ্ছন্ন প্রদোষে
চিহ্নহীন পথে। এসেছিল দ্বারের সম্মুখে মোর
ক্ষণতরে। তখনো রজনী মম হয় নাই ভোর,
হৃদয় অস্ফুট ছিল অর্ধ জাগরণে। ডাকে নি সে
নাম ধরে, দুয়ারে করে নি করাঘাত, গেছে মিশে
সমুদ্রতরঙ্গরবে তাহার অশ্বের হ্রেষাধ্বনি।
হে বীর অপরিচিত, শেষ হল আমার রজনী,
জানা তো হল না কোন্‌ দুঃসাধ্যের সাধন লাগিয়া
অস্ত্র তব উঠিল ঝঞ্ঝনি। আমি রহিনু জাগিয়া।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Kahare porabo rakhi jouboner rakhipurnimay,
He mor bhagger deb! Logno jeno bohe nahi jay.
Meghe aji abishto ombor, ghonobrishti-achchhadone
Osposhto alor montro akash nibishto hoye shone,
Bujhite pare na bhalo. Ami bhabitechhi eka boshe.
Amar banchhito kobe bahirilo prochhonno prodoshe
Chinhohin pothe. Eshechhilo dwarer shommukhe mor
Khonotore. Tokhono rojoni momo hoy nai bhor,
Hridoy osphuto chhilo ordho jagorone. Dake ni she
Nam dhore, duyare kore ni koraghat, gechhe mishe
Shomudrotoronggorobe tahar oshwer hreshadhoni.
He bir oporichito, shesh holo amar rojoni,
Jana to holo na kon duhshaddher shadhon lagiya
Ostro tobo uthilo jhonjhoni. Ami rohinu jagiya.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • যৌবনের লগ্ন ও পাত্রহীনতার শঙ্কা:
    “কাহারে পরাব রাখি যৌবনের রাখিপূর্ণিমায়, / হে মোর ভাগ্যের দেব! লগ্ন যেন বহে নাহি যায়।”
    — জীবনের শ্রেষ্ঠ বিকাশের মুহূর্তে নিজের প্রেম ও শুভকামনার রাখি অর্পণ করার মতো যোগ্য ব্যক্তিত্বের সন্ধান নায়িকাকে ব্যাকুল করে। মেঘলা আকাশ ও দুর্যোগের আঁধারে শুভমুহূর্ত যেন নিষ্ফল হয়ে বয়ে না যায়, বিধাতার কাছে সেই আকুল প্রার্থনা উচ্চারিত হয়েছে।
  • অর্ধ-জাগরণ ও হারানো সুযোগের ট্র্যাজেডি:
    “এসেছিল দ্বারের সম্মুখে মোর / ক্ষণতরে। তখনো রজনী মম হয় নাই ভোর, / হৃদয় অস্ফুট ছিল অর্ধ জাগরণে। ডাকে নি সে / নাম ধরে, দুয়ারে করে নি করাঘাত,”
    — জীবনের পরম বাঞ্ছিত মানুষটি হয়তো কাছে এসেছিল, কিন্তু নায়িকার চেতনা তখনো পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। সেই বীর পুরুষ কোনো জবরদস্তি করেনি বা নাম ধরে ডাকেনি; সে নিঃশব্দে অপেক্ষা করে আবার চলে গেছে। এই ক্ষণিক অসচেতনতার কারণে ঘটে যায় এক চিরন্তন বিচ্ছেদ।
  • অপরিচিত বীরের দুঃসাধ্য যাত্রা ও অন্তহীন জাগরণ:
    “হে বীর অপরিচিত, শেষ হল আমার রজনী, / জানা তো হল না কোন্‌ দুঃসাধ্যের সাধন লাগিয়া / অস্ত্র তব উঠিল ঝঞ্ঝনি। আমি রহিনু জাগিয়া।”
    — সমুদ্রের গর্জনে মিলিয়ে যাওয়া অশ্বের ডাক এবং অস্ত্রে ঝংকার শুনিয়ে বীর চলে গেছে কোনো অজানিত সংগ্রামের পথে। নায়িকার মোহনিদ্রা যখন ভাঙল, তখন রজনী শেষ; কিন্তু বীরের সেই অজানা আদর্শ ও সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সে অনন্ত অপেক্ষায় জাগ্রত রইল। প্রেম এখানে বীরত্বের মহিমান্বিত রূপকে বরণ করে এক চিরকালীন জাগরণে পরিণত হয়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মহুয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংকলন ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন