আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

মহুয়া কাব্যগ্রন্থ (১৯২৯) – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে (ভাদ্র, ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘মহুয়া’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য-পরিক্রমায় এক অনন্য ও যুগান্তকারী সংযোজন। সাহিত্যালোচকেরা এই কাব্যগ্রন্থটিকে রবীন্দ্রনাথের কাব্যরীতির ‘বলাকা পর্ব’-এর অন্তিম ও পরিণত ফসল হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। ‘পূরবী’ (১৯২৫)-র বিষাদময় মন্থরতার পর ‘মহুয়া’য় রবীন্দ্রনাথ পুনরায় এক তারুণ্যদীপ্ত, সংরাগপূর্ণ ও অতীন্দ্রিয় গীতিময়তায় প্রত্যাবর্তন করেন।

                                  [মহুয়া কাব্যগ্রন্থের দ্বিমুখী ধারা]
                                                  │
         ┌────────────────────────────────────────┴────────────────────────────────────────┐
         ▼                                                                                 ▼
[প্রসাধনকলা (Lyrical Ornamentation)]                                              [সাধন-বেগ (Spiritual Realisation)]
• ছন্দ ও ভাষার লঘুপক্ষ তান                                                          • প্রেমের গূঢ় আত্মিক আকুলতা
• লৌকিক সৌন্দর্যের প্রসাধন ও ব্যঞ্জনা                                               • স্বাধিকারকামী নারীর জাগরণ

১. রচনার পটভূমি ও ‘শেষের কবিতা’-র সংযোগ

‘মহুয়া’ রচনার নেপথ্যে রয়েছে এক চমৎকার ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ। ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের দিকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, রবীন্দ্রনাথের পূর্ববর্তী প্রেমকাব্যগুলো থেকে কিছু বাছাই করা কবিতা সংকলন করে বিবাহ উপলক্ষে উপহার দেওয়ার উপযোগী একটি বই প্রকাশ করা হবে এবং কবি তার জন্য কয়েকটি নতুন কবিতা লিখে দেবেন। কিন্তু লিখতে গিয়ে ‘প্রজাপতি’ (বিবাহের দেবতা)-র অনুপ্রেরণায় অল্প সময়ের মধ্যেই একের পর এক নতুন প্রেমের কবিতা জন্ম নিতে থাকে। ফলে সংকলন গ্রন্থটি আর কেবল সংকলন থাকেনি; একটি সম্পূর্ণ নতুন মৌলিক কাব্যগ্রন্থ ‘মহুয়া’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

উলেখযোগ্য যে, এই কাব্য রচনার অব্যবহিত পূর্বেই (১৩৩৫ আষাঢ়) রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’ রচনা শেষ করেন। ‘শেষের কবিতা’-র অমিত-লাবণ্যের ভালোবাসার যে আধুনিক, স্বাধীন ও তীব্র রূপক বাংলা সাহিত্য প্রত্যক্ষ করেছিল, ‘মহুয়া’-র কবিতার ভাবাবেগে তারই প্রচ্ছায়া লক্ষ্য করা যায়।

২. দ্বিমুখী প্রেমতত্ত্ব: প্রসাধনকলা ও সাধন-বেগ

‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের মূলসুর হলো প্রেম, তবে এই প্রেম কেবল পার্থিব ভোগ বা রোমান্টিক আবেশে সীমাবদ্ধ নয়। এক চিঠিতে কবি নিজেই ‘মহুয়া’-র কাব্যভাবনাকে দুটি ধারায় বিভক্ত করেছেন:

  • নিছক গীতিকাব্য (প্রসাধনকলা): যেখানে ছন্দ ও ভাষার চঞ্চলতায় প্রণয়ের সৌন্দর্য সজ্জা ও অলঙ্করণ মুখ্য রূপ নিয়েছে।
  • গভীর ভাবাবেগ (সাধন-বেগ): যেখানে প্রেম আত্মিক অন্বেষণ ও আত্মোৎসর্গের পরম সাধনায় রূপান্তরিত হয়েছে।

‘মহুয়া’ নামটির মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের মাতাল করা আরণ্যক সুবাস ও মাদকতা। বসন্তের বিদায়লগ্নে চৈত্র-ফসলের রিক্ত মাঠে মহুয়া ফুলের যে মদির ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে, কবি সেই সুরভিকেই জীবনের শেষ প্রান্তের প্রেমোচ্ছ্বাসের রূপক হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

৩. নারীবন্দনা ও স্বাধিকার প্রকাশ

‘মহুয়া’কে বলা হয় রবীন্দ্রনাথের নারীবন্দনার কাব্য। এই কাব্যে নারী কেবল পুরুষের অনুভূতির অলঙ্কার বা নিষ্ক্রিয় প্রেমিকা নয়; বরং সে এক স্বশাসিত, তেজস্বী ও স্বাধীন সত্তা। ‘সবলা’ কবিতায় কবি নারীর সেই চিরন্তন আকুতি ও বিদ্রোহকে ভাষা দিয়েছেন:

“কেন নারী রবে শুধু পরশের লাগি,
একান্তে আকুল হয়ে নিশিদিন জাগি…”

একইভাবে ‘সাগরিকা’, ‘বোধন’, ‘মৌন’ ও ‘নাম্নী’ পর্যায়ের কবিতাগুলোতে নারীর সৌন্দর্য, আত্মমর্যাদা ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে নতুন মাত্রায় তুলে ধরা হয়েছে।

‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের সংশোধিত ও প্রামাণ্য কবিতা সূচি

‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থে মোট ৬৯টি মূল কবিতা সংকলিত হয়েছে (একটি ভূমিকা/উৎসর্গ সূচক অখণ্ড পংক্তি সহ)। আপনার দেওয়া তালিকায় কিছু বানানের ভুল (যেমন: প্রচ্ছন্নাা) এবং ক্রমবিন্যাসের অসামঞ্জস্য ছিল, যা রবীন্দ্র রচনাবলীর মূল পাঠানুসারে নিচে সংশোধন ও পূর্ণাঙ্গভাবে সাজিয়ে দেওয়া হলো:

ক্রমকবিতার নামক্রমকবিতার নামক্রমকবিতার নাম
১উজ্জীবন২৪গুপ্তধন৪৭বাপী
২নির্ভয়২৫দ্বৈত৪৮নৈবেদ্য
৩দর্পণ২৬সাগরিকা৪৯বরণডালা
৪বোধন২৭প্রত্যাগত৫০মহুয়া
৫পথের বাঁধন২৮সন্ধান৫১অশ্রু
৬ভাবিনী২৯বরণ৫২মুক্তি
৭বসন্ত৩০পুরাতন৫৩দীনা
৮দূত৩১উপহার৫৪অন্তর্ধান
৯আশীর্বাদ৩২পথবর্তী৫৫উদ্ঘাত
১০বরযাত্রা৩৩ছায়া৫৬সৃষ্টি-রহস্য
১১পরিচয়৩৪শুভযোগ৫৭বিরহ
১২নববধূ৩৫মুক্তরূপ৫৮অসমাপ্ত
১৩মাধবী৩৬বাসরঘর৫৯নাম্নী (নন্দিনী, শামলী, জয়তী ইত্যাদি)
১৪দায়মোচন৩৭মায়া৬০বিদায়সম্বল
১৫পরিণয়৩৮স্পর্ধা৬১নিবেদন
১৬বিজয়ী৩৯বিচ্ছেদ৬২ছায়ালোক
১৭সবলা৪০নির্ঝরিণী৬৩দিনান্তে
১৮মিলন৪১রাখিপূর্ণিমা৬৪অচেনা
১৯প্রত্যাশা৪২বিদায়৬৫প্রচ্ছন্না (সঠিক বানান)
২০প্রতীক্ষা৪৩শুকতারা৬৬শেষ মধু
২১বন্দিনী৪৪আহ্বান৬৭অপরাজিত
২২অর্ঘ্য৪৫প্রণতি৬৮একাকী
২৩লগ্ন৪৬প্রকাশ৬৯অবশেষে
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: ‘নাম্নী’ শিরোনামটির অধীনে বেশ কয়েকটি উপ-কবিতা সংকলিত রয়েছে—যেমন: নাম্নী-নন্দিনী, নাম্নী-শামলী, নাম্নী-জয়তী, নাম্নী-খেয়ালী, নাম্নী-হেঁয়ালী ইত্যাদি, যেগুলো সামগ্রিকভাবে ‘নাম্নী’ ক্রমিকের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য করা হয়।)

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত