আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

যেতে যদি হয় , পূজা পর্যায়, ৬১৪ | রবীন্দ্রসঙ্গীত

Table of Content

জীবনের কর্মময় অধ্যায় শেষে মহাপ্রস্থানের অবধারিত ডাককে শান্ত, প্রসন্ন ও নির্ভীক চিত্তে বরণ করে নেওয়ার এক ধ্রুপদী দার্শনিক প্রকাশ “যেতে যদি হয়”। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূজা পর্বের এই গানটিতে মৃত্যুর প্রতি কোনো ভীতি বা কাতরতা নেই; বরং জীবনের আলো-আঁধারের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, সুখ-দুঃখের ঘাত-প্রতিঘাত এবং প্রকৃতির রূপময়তার প্রতি এক গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ ব্যক্ত হয়েছে। পার্থিব জীবনের যাবতীয় দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে ভারমুক্ত হৃদয়ে হাসিমুখে নীরব বিদায় নেওয়ার যে আত্মিক প্রস্তুতি, তা গানটিকে এক পরম আধ্যাত্মিক প্রশান্তির স্তরে উন্নীত করেছে।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
শিরোনামযেতে যদি হয়
পর্যায়পূজা পর্যায় (গান সংখ্যা: ৬১৪)
উপ-পর্যায়শেষ (পরিণাম)
রাগভৈরবী
তালদাদরা (ছয় মাত্রা: ৩+৩)
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ)বৈশাখ, ১৩৩২ বঙ্গাব্দ
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ)এপ্রিল–মে, ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ
রচনাস্থানশান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকারদিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল উপজীব্যজীবনের পূর্ণতা, কৃতজ্ঞতাবোধ, মৃত্যুর স্বাভাবিকতা ও ভারমুক্ত নিঃশব্দ প্রস্থান

যেতে যদি হয় হবে (পুরো গান)

যেতে যদি হয় হবে–

যাব, যাব, যাব তবে ॥

লেগেছিল কত ভালো এই-যে আঁধার আলো–

খেলা করে সাদা কালো উদার নভে।

গেল দিন ধরা-মাঝে কত ভাবে, কত কাজে,

সুখে দুখে কভু লাজে, কভু গরবে ॥

প্রাণপণে কত দিন শুধেছি কঠিন ঋণ,

কখনো বা উদাসীন ভুলেছি সবে।

কভু ক’রে গেনু খেলা, স্রোতে ভাসাইনু ভেলা,

আনমনে কত বেলা কাটানু ভবে ॥

জীবন হয় নি ফাঁকি, ফলে ফুলে ছিল ঢাকি,

যদি কিছু রহে বাকি কে তাহা লবে!

দেওয়া-নেওয়া যাবে চুকে, বোঝা-খসে-যাওয়া বুকে

যাব চলে হাসিমুখে– যাব নীরবে ॥

যেতে যদি হয় হবে — Romanized Version

Jete jodi hoy hobe—
jab, jab, jab tobe॥

Legechhilo koto bhalo ei-je andhar alo—
khela kore sada kalo udar nabhe।

Gel din dhora-majhe koto bhabe, koto kaje,
sukhe dukhe kobhu laje, kobhu gorobe॥

Pranpane koto din shudhechhi kothin rin,
kokhono ba udasin bhulechhi sabe।

Kobhu kore genu khela, srote bhasainu bhela,
anomone koto bela katanu bhobe॥

Jibon hoy ni phanki, phole phule chhilo dhaki,
jodi kichhu roye baki ke taha lobe!

Deoa-neoa jabe chuke, bojha-khসে-jaoa buke
jab chole hasimukhe— jab nirobe॥

 

গানের মূল ভাব

“যেতে যদি হয়” গানটির মূল ভিত্তি হলো জীবনের পরম সার্থকতা এবং মৃত্যুর প্রশান্ত রূপ উপলব্ধি করা। অধিকাংশ মানুষের কাছে মৃত্যু এক ভীতিপ্রদ বিচ্ছেদ, কিন্তু কবির কাছে তা অনন্ত যাত্রার এক স্বাভাবিক পদক্ষেপ। জীবনকে তিনি কোনো শূন্য বা ব্যর্থ অধ্যায় মনে করেননি; বিশ্বপ্রকৃতির ফুল ও ফলের প্রাচুর্যে এই জীবন ছিল পরিপূর্ণ।
গানটিতে মানবজীবনের দ্বৈত রূপ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। মানুষ কখনো কঠিন দায়িত্বের ঋণ শোধ করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়েছে, কখনো আবার পার্থিব খেলাধুলায় উদাসীনভাবে সময় কাটিয়েছে। কিন্তু যাত্রার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কোনো অতৃপ্তি বা অভিযোগ অবশিষ্ট থাকে না। যখন পার্থিব দেওয়া-নেওয়ার সমস্ত দেনা চুকে যায়, তখন হৃদয় সব বোঝা থেকে মুক্ত হয়ে এক নির্মল আনন্দের সাথে অচিনের পথে পা বাড়াতে প্রস্তুত হয়।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. প্রস্থানের সম্মতি ও ধরণীর সৌন্দর্যের স্মৃতি

  • “যেতে যদি হয় হবে—যাব, যাব, যাব তবে / লেগেছিল কত ভালো এই-যে আঁধার আলো—খেলা করে সাদা কালো উদার নভে…”
    গানটির সূচনাই এক অটল ও দ্বিধাহীন সংকল্প দিয়ে। মহাকালের আহ্বান এলে কোনো প্রতিরোধ নেই। পেছনে তাকিয়ে উদার আকাশের আলো-আঁধারের রূপময় খেলাকে পরম মমতায় স্মরণ করার মধ্য দিয়ে জীবনের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে।

২. জীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা ও কর্মপ্রবাহ

  • “গেল দিন ধরা-মাঝে কত ভাবে, কত কাজে, সুখে দুখে কভু লাজে, কভু গরবে…”
    ধরিত্রীতে কাটানো দিনগুলোর এক সংহত মূল্যায়ন। মানবজীবন কোনো একরৈখিক অভিজ্ঞতা নয়; এতে রয়েছে সুখের আনন্দ, দুঃখের ক্ষত, কুণ্ঠার লজ্জা এবং সাফল্যের আত্মগরিমা। এই সবকিছুর সম্মিলনেই জীবন পূর্ণতা পায়।

৩. দায়িত্বের ভার বনাম সহজিয়া খেলা

  • “প্রাণপণে কত দিন শুধেছি কঠিন ঋণ, কখনো বা উদাসীন ভুলেছি সবে / কভু ক’রে গেনু খেলা, স্রোতে ভাসাইনু ভেলা, আনমনে কত বেলা কাটানু ভবে…”
    সংসারের কঠিন কর্তব্য পালন করার তীব্র পরিশ্রমের পাশাপাশি জীবনের খেয়ালখুশিময় দিনগুলোর স্মৃতিচারণ। নদীর স্রোতে খেলার ভেলা ভাসিয়ে দেওয়া এবং আনমনে বেলা কাটানোর উল্লেখ মানবজীবনের স্বাভাবিক সারল্যকে তুলে ধরে।

৪. জীবনের প্রাচুর্য ও ভারমুক্ত নীরব বিদায়

  • “জীবন হয় নি ফাঁকি, ফলে ফুলে ছিল ঢাকি, যদি কিছু রহে বাকি কে তাহা লবে! / দেওয়া-নেওয়া যাবে চুকে, বোঝা-খসে-যাওয়া বুকে যাব চলে হাসিমুখে—যাব নীরবে…”
    চরম আত্মতৃপ্তি ও বৈরাগ্যের প্রকাশ। বিশ্বচরাচরের রূপ-রস থেকে জীবন কোনো প্রতারণা পায়নি; তা ফুলে-ফলে সুশোভিত ছিল। আর তাই, পার্থিব সমস্ত দেনাপাওনার সমাপ্তিতে বক্ষের সমস্ত ভার নামিয়ে রেখে হাসিমুখে ও নিঃশব্দে প্রস্থান করাই সাধকের শেষ পরিণতি।

বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন

সাধারণ মানবীয় সম্পর্কে বিদায় মানেই বিচ্ছেদের তীব্র হাহাকার এবং অশ্রুসজল আশাহীন দৃষ্টি। তবে এই গানে রবীন্দ্রনাথ বিদায়ের ধারণাকে এক ভিন্ন দার্শনিক উচ্চতায় রূপান্তর করেছেন। এখানে আশাহীন নয়ন কোনো হতাশায় নিমজ্জিত নয়; বরং তা সমস্ত পার্থিব প্রত্যাশা ও আঁকড়ে ধরার মোহ থেকে মুক্ত। যখন আর কোনো নতুন প্রাপ্তির আশা থাকে না, তখনই দৃষ্টি সমস্ত ক্লান্তি পেরিয়ে নির্লিপ্ত ও শান্ত হয়ে ওঠে। বিদায়ের আঘাত তখন আর অন্তরে কোনো ক্ষতের জন্ম দেয় না, তা রূপ নেয় ‘বোঝা-খসে-যাওয়া’ পরম মুক্তির এক দিব্য আনন্দে।

সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য

  • অভ্যন্তরীণ অন্ত্যমিলের নিপুণ বিন্যাস: ‘হবে-তবে-নভে’, ‘মাঝে-কাজে-লাজে’, ‘ঋণ-দিন-উদাসীন’, এবং ‘ফাঁকি-ঢাকি-বাকি’—এই ধ্বনিময় অন্ত্যমিলগুলো গানটিকে এক অসাধারণ ছন্দোময় গতি দিয়েছে।
  • সংযত ও ভাবগম্ভীর ভাষা: কোনো জটিল বা দুর্বোধ্য রূপকের আশ্রয় না নিয়ে অত্যন্ত প্রাত্যহিক ও প্রাঞ্জল শব্দে জীবনের মহত্তম দর্শনকে প্রকাশ করা হয়েছে।
  • মৃত্যুচেতনার রূপান্তর: মৃত্যুকে কোনো অন্ধকারের ধ্বংসরূপ হিসেবে না দেখে, তাকে জীবনের এক স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা

  • ভৈরবী রাগের প্রশান্ত মহিমা: বিদায়, সমাপ্তি এবং বৈরাগ্যের চিরন্তন সুর হলো ‘ভৈরবী’। ভৈরবীর করুণ অথচ গভীর শান্ত চলন গানটির বাণীকে এক ধ্যানমগ্ন রূপ দান করেছে।
  • দাদরা তালের স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দ: ছয় মাত্রার দাদরা তালের মৃদু ও নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ জীবনের চলার পথকে নির্দেশ করে। তালের এই সাবলীল গতি সুরের ভেতর কোনো ভারী বিষাদ জমতে দেয় না; বরং তা এক সহজ প্রবহমানতা বজায় রাখে।
  • স্বরলিপির বিশুদ্ধতা: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বরলিপিতে ভৈরবীর নিখাদ ও কোমল স্বরগুলোর প্রয়োগ গানটির আত্মসমর্পণের ভাবকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৯২৫ সালে (বৈশাখ ১৩৩২) কবির বয়স যখন চৌষট্টি বছর, তখন শান্তিনিকেতনের আশ্রমে বসে তিনি এই গানটি রচনা করেন। জীবনের এই পর্যায়ে এসে কবির সৃষ্টিতে পার্থিব কোলাহলের চেয়ে মহাজাগতিক সত্য ও নিঃসঙ্গ মুক্তির ব্যাকুলতা প্রধান হয়ে উঠেছিল।
  • গীতবিতানের শেষ পর্যায়: গীতবিতানের পূজা পর্বের অন্তর্গত ‘শেষ’ বা পরিণাম উপ-পর্যায়ের গানগুলো মানুষের নশ্বর জীবনের অবসান ও পরমাত্মায় লীন হওয়ার এক অনন্য আধ্যাত্মিক দলিল।

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

“যেতে যদি হয়” বাংলা সংগীত সাহিত্যের এমন একটি কালজয়ী গান যা মানুষের জীবনের অন্তিম মুহূর্তের ভয়কে দূর করে এক শান্ত আশাবাদ জাগিয়ে তোলে। শোকসভা, স্মরণানুষ্ঠান কিংবা নিভৃত আত্মচিন্তার মুহূর্তে গানটি মানুষের অন্তরে ক্ষণভঙ্গুর জীবনের সার্থকতা এবং বিদায়ের সৌন্দর্যকে এক অমর সান্ত্বনা হিসেবে উপহার দেয়।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
  2. স্বরবিতান (৪৫তম খণ্ড), বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
  3. রবীন্দ্র-জীবনী (তৃতীয় খণ্ড), প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত