রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কৈশোরক রচনার সংকলন ‘শৈশব সঙ্গীত’ (১৮৮৪)-এর অন্যতম ভাবঘন ও বেদনাময় সৃষ্টি ‘ভগ্নতরী’ কবিতাটি। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ ও অসীম জীবনের সমুদ্রে দিশাহীনভাবে ভাসতে থাকা একটি ভগ্ন বা চূর্ণ-বিচূর্ণ তরীকে কবি এখানে মানবজীবনের ভঙ্গুরতা, আশাহতি, একাকীত্ব এবং নিয়তির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। বাহ্যত একটি ক্ষয়িষ্ণু নৌকার রূপক বর্ণনার মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে তরুণ কবির অন্তর্জগতের তীব্র মানসিক ঝড়, অপ্রাপ্তির দহন এবং বিষাদময় রোমান্টিক বেদনাবোধই এই কবিতায় রূপায়িত হয়েছে। কবিচেতনার প্রাথমিক পর্যায়ের এই সৃষ্টিতে কেবল জীবনের অনিত্যতা ও করুণ সুরই ধ্বনিত হয়নি, বরং রূপক-প্রতীকের সুনিপুণ বুননে রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎ প্রজ্ঞাময় ও পরিণত সাহিত্যসাধনার প্রারম্ভিক স্বকীয়তার ইঙ্গিতও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
Table of Contents
শৈশব সঙ্গীত কাব্যগ্রন্থের ‘ভগ্নতরী’ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গাথা
প্রথম সর্গ
ডুবিছে তপন, আসিছে আঁধার,
দিবা হল অবসান–
ঘুমায় সাঁঝের সাগর, করিয়া
কনককিরণ পান।
অলস লহরী তটের চরণে
ঘুমে পড়িতেছে ঢুলি,
এ উহার গায়ে পড়েছে এলায়ে
ভাঙ্গাচোরা মেঘগুলি।
কনকসলিলে লহরী তুলিয়া
তরণী ভাসিয়া যায়–
উড়িয়াছে পাল, নাচিছে নিশান,
বহে অনুকূল বায়।
শত কণ্ঠ হতে সাঁঝের আকাশে
উঠিছে সুখের গীত,
তালে তালে তার পড়িতেছে দাঁড়,
ধ্বনিতেছে চারি ভিত।
বাজিতেছে বীণা, বাজিতেছে বাঁশি,
বাজিতেছে ভেরী কত–
কেহ দেয় তালি, কেহ ধরে তান,
কেহ নাচে জ্ঞানহত।
তারকা উঠিছে ফুটিয়া ফুটিয়া,
আকাশে উঠিছে শশী,
উছলি উছলি উঠিছে সাগর
জোছনা পড়িছে খসি।
অতি নিরিবিলি, নিরালায় দেখ
না মিশিয়া কোলাহলে
ললিতা হোথায়, পতি সাথে তার
বসি আছে গলে গলে।
অজিতের গলে বাঁধি বাহুপাশ
বুকেতে মাথাটি রাখি,
ঢলঢল তনু, গল’গল’ করা
ঢুলুঢুলু দুটি আঁখি।
আধো আধো হাসি অধরে জড়িত,
সুখের নাহি যে ওর,
প্রণয়বিভল প্রাণের মাঝারে
লেগেছে ঘুমের ঘোর।
পরশিছে দেহ নিশীথের বায়ু
অতি ধীর মৃদুশ্বাসে,
লহরীরা আসি করে কলরব
তরণীর আশে-পাশে।
মধুর মধুর সকলি মধুর,
মধুর আকাশ ধরা,
মধুরজনীর মধুর অধর
মধু জোছনায় ভরা।
যেতেছে দিবস, চলেছে তরণী
অনুকূল বায়ুভরে।
ছোট ছোট ঢেউ মাথাগুলি তুলি
টলমল করি পড়ে।
প্রণয়ীর কাল যেতেছে, তুলিয়া
শত বরণের পাখা,
মৃদুবায়ুভরে লঘু মেঘ যেন
সাঁঝের-কিরণ-মাখা।
আদরে ভাসিয়া গাহিছে অজিত
চাহি ললিতার পানে
মরম-গলানো সোহাগের গীত
আবেশ-অবশ প্রাণে।–
গান
পাগলিনী তোর লাগি কি আমি করিব বল্?
কোথায় রাখিব তোরে খুঁজে না পাই ভূমণ্ডল!
আদরের ধন তুমি আদরে রাখিব আমি,
আদরিণী, তোর লাগি পেতেছি এ বক্ষস্থল।
আয় তোরে বুকে রাখি, তুমি দেখ আমি দেখি–
শ্বাসে শ্বাস মিশাইব আঁখিজলে আঁখিজল।
হরষে কভু বা গাইছে ললিতা
অজিতের হাত ধরি,
মুখপানে তার চাহিয়া চাহিয়া
প্রেমে আঁখি দুটি ভরি।–
গান
ওই কথা বল সখা, বল আর বার,
ভালবাসো মোরে তাহা বল বার-বার!
কতবার শুনিয়াছি তবুও আবার যাচি,
ভালোবাসো মোরে তাহা বল গো আবার!
…
সান্ধ্য দিক্বধূ স্তব্ধ ভয়ভারে,
একটি নিশ্বাস পড়ে না তার;
ঈশান-গগনে করিছে মন্ত্রণা
মিলিয়া অযুত জলদভার।
তড়িতছুরিতে বিঁধিয়া বিঁধিয়া
ফেলিছে আঁধারে শতধা করি,
দূর ঝটিকার রথচক্ররব
ঘোষিছে অশনি ত্রিলোক ভরি।
সহসা উঠিল ঘোর গরজন,
প্রলয়ঝটিকা আসিছে ছুটে।
ছিন্ন মেঘজাল দিগ্বিদিকে ধায়,
ফেনিল তরঙ্গ আকুলি উঠে।
পাগলের মত তরীযাত্রী যত
হেথা হোথা ছুটে তরণী-‘পরে–
ছিঁড়িতেছে কেশ,হানিতেছে বুক,
করে হাহাকার কাতর স্বরে!
ছিন্ন-তার বীণা যায় গড়াগড়ি,
অধীরে ভাঙ্গিয়া ফেলেছে বাঁশি–
ঝটিকার স্বর দিতেছে ডুবায়ে
শতেক কণ্ঠের বিলাপরাশি।
তরণীর পাশে নীরব অজিত,
ললিতা অবাক্-হিয়া
মাথাটি রাখিয়া অজিতের কাঁধে
রহিয়াছে দাঁড়াইয়া।
কি ভয় মরণে, এক সাথে যবে
মরিবে দুজনে মিলি?
মুকুতাশয়নে সাগরের তলে
ঘুমাইবে নিরিবিলি!
দুইটি প্রণয়ী বাঁধা গলে গলে
কাছাকাছি পাশাপাশি,
পশিবে না সেথা দ্বেষ কোলাহল,
কুটিল কঠোর হাসি।
ঝটিকার মুখে হীনবল তরী
করিতেছে টলমল্–
উঠিছে, নামিছে আছাড়ি পড়িছে,
ভিতরে পশিছে জল।
বাঁধিল ললিতা অজিতের বাহু
দৃঢ়তর বাহুডোরে,
আদরে অজিত ললিতা-অধর
চুমিল হৃদয় ভ’রে।
ললিতা-কপোলে বাহিয়া পড়িল
নয়নের জল দুটি–
নবীন সুখের স্বপন, হায় রে,
মাঝখানে গেল টুটি।
“আয় সখি আয়” কহিল অজিত–
হাত ধরাধরি করি
দুজনে মিলিয়া ঝাঁপায়ে পড়িল
আকুল সাগর-‘পরি।
…
দ্বিতীয় সর্গ
নবরবি সুবিমল কিরণ ঢালিয়া
নিশার আঁধাররাশি ফেলিল ক্ষালিয়া।
ঝটিকার অবসানে প্রকৃতি সহাস,
সংযত করিছে তার এলোথেলো বাস।
খেলায়ে খেলায়ে শ্রান্ত সারাটি যামিনী,
মেঘকোলে ঘুমাইয়া পড়েছে দামিনী।
থেকে থেকে স্বপনেতে চমকিয়া চায়,
ক্ষীণ হাসিখানি হেসে আবার ঘুমায়।
শান্ত লহরীরা এবে শ্রান্ত পদক্ষেপে
তীর-উপলের ‘পরে পড়ে কেঁপে কেঁপে।
দ্বীপের শৈলের শির প্লাবিত করিয়া,
অজস্র কনকধারা পড়িছে ঝরিয়া।
মেঘ, দ্বীপ, জল, শৈল, সব সুরঞ্জিত–
সমস্ত প্রকৃতি গায় স্বর্ণ-ঢালা গীত।
বহু দিন হতে এক ভগ্নতরী জন
করিছে বিজন দ্বীপে জীবনযাপন।
বিজনতাভারে তার অবসন্ন বুক,
কত দিনে দেখে নাই মানুষের মুখ।
এত দিন মৌন আছে না পেয়ে দোসর,
শুনিলে চমকি উঠে আপনার স্বর।
সুরেশ প্রভাতে আজি ছাড়িয়া কুটীর
ভ্রমিতে ভ্রমিতে এল সাগরের তীর।
বিমল প্রভাতে আজি শান্ত সমীরণ
ধীরে ধীরে করে তার দেহ আলিঙ্গন।
নীরবে ভ্রমিছে কত– একি রে– একি রে–
সুমুখে কি দেখিতেছি সাগরের তীরে?
রূপসী ললনা এক রয়েছে শয়ান,
প্রভাতকিরণ তার চুমিছে বয়ান–
মূদিত নয়ন দুটি, শিথিলিত কায়,
সিক্ত কেহ এলোথেলো শুভ্র বালুকায়।
প্রতিক্ষণে লহরীরা ঢলিয়া বেলায়
এলানো কুন্তল ল’য়ে কত না খেলায়!
বহু দিন পরে যথা কারামুক্ত জন
হর্ষে অধীরিয়া উঠে হেরিয়া তপন,
বহু দিন পরে হেরি মানুষের মুখ
উচ্ছ্বসি উঠিল সুখে সুরেশের বুক।
দেখিল এখনো বহে নিশ্বাসসমীর,
এখনো তুষারহিম হয় নি শরীর।
যতনে লইল তারে বাহুতে তুলিয়া,
কেশপাশ চারি পাশে পড়িল খুলিয়া।
সুকুমার মুখখানি রাখি স্কন্ধোপরে,
দ্রুত পদে প্রবেশিল কুটীরভিতরে।
কতক্ষণ-পরে তবে লভিয়া চেতন
ললিতা সুধীরে অতি মেলিল নয়ন।
দেখিল যুবক এক রয়েছে আসীন,
বিশাল নয়ন তার নিমেষবিহীন–
কুঞ্চিত কুন্তলরাশি গৌর গ্রীবা-‘পরে
এলাইয়া পড়ি আছে অতি অনাদরে।
চমকি উঠিল বালা বিস্ময়ে বিহ্বল,
সরমে সম্বরে তার শিথিল অঞ্চল।
ভয়েতে অবশ দেহ, দুরু দুরু হিয়া–
আকুল হইয়া কিছু না পায় ভাবিয়া।
সহসা তাহার মনে পড়িল সকলি —
সহসা উঠিল বসি নববলে বলী।
সুরেশের মুখপানে চাহিয়া চাহিয়া
পাগলের মত বালা উঠিল কহিয়া,
“কেন বাঁচাইলে মোরে কহ মোরে কহ–
দুই প্রণয়ীর কেন ঘটালে বিরহ?
অনন্ত মিলন যবে হইল অদূর–
দ্বার হতে ফিরাইয়া আনিলে নিষ্ঠুর!
দায় কর একটুকু দুখিনীর প্রতি,
দিও না তাপসবর বাধা এক রতি–
মরিব– নিভাব প্রাণ সাগরের জলে,
মিলিব সখার সাথে নীলসিন্ধুতলে,
উপরে উঠিবে ঝড়, উর্ম্মি শৈলাকার,
নিম্নে কিছু পশিবে না কোলাহল তার!”
…
তৃতীয় সর্গ
মরমের ভার বহি– দারুণ যাতনা সহি
ললিতা সে কাটাইছে দিন।
নয়নে নাই সে জ্যোতি– হৃদয় অবশ অতি,
শরীর হইয়া গেছে ক্ষীণ।
আলুথালু কেশপাশ, বাঁধিতে নাহিক আশ,
উড়িয়া পড়িছে থাকি থাকি।
কি করুণ মুখখানি, একটি নাইক বাণী,
কেঁদে কেঁদে-শ্রান্ত দুটি আঁখি।
যে দিকে চরণ ধায়, সে দিকে চলেছে হায়,
কিছুতে ভ্রূক্ষেপ নাই মনে,
গাছের কাঁটার ধার, ছিঁড়িছে আঁচল তার,
লতাপাশ বাঁধিছে চরণে।
একাকী আপনমনে ভ্রমিতে ভ্রমিতে বনে
যাইত সে তটিনীর তীরে–
লতায় পাতায় গাছে– আঁধার করিয়া আছে,
সেইখানে শুইত সুধীরে।
জলকলরবরাশি, প্রাণের ভিতরে আসি
ঢালিত কি বিষাদের ধারা!
ফাটিয়া যাইত বুক, বাহুতে ঢাকিয়া মুখ
কাঁদিয়া কাঁদিয়া হ’ত সারা।
কাননশৈলের পায়ে, মধ্যাহ্নে গাছের ছায়ে
মলিন অঞ্চলে রাখি মাথা
কত কি ভাবিত হায়, উচ্ছ্বসি উঠিত বায়,
ঝরিয়া পড়িত শুষ্ক পাতা।
গভীর নীরব রাতে উঠিয়া শৈলের মাথে
বসিয়া রহিত একাকিনী–
তারা-পানে চেয়ে চেয়ে, কত-কি ভাবিত মেয়ে,
পড়িত কি বিষাদকাহিনী!
কি করিলে ললিতার– ঘুচিবে হৃদয়ভার
সুরেশ না পাইত ভাবিয়া–
কাতর হইয়া কত যুবা তারে শুধাইত,
আগ্রহে অধীর তার হিয়া–
“রাখ কথা, শুন সখি, একবার বল দেখি
কি করিব তোমার লাগিয়া?
কি চাও, কি দিব বালা,বল গো কিসের জ্বালা?
কি করিলে জুড়াবে ও হিয়া?”
করুণ মমতা পেয়ে– সুরেশের মুখ চেয়ে
অশ্রু উচ্ছ্বসিত দরদরে–
ললিতা কাতর রবে রুদ্ধকণ্ঠে কহে তবে,
“সখা গো ভেব না মোর তরে!
আমারে দিও না দেখা, বিজনে রহিব একা
বিজনেই নিপাতিব দেহ।
এ দগ্ধ জীবন মোর, কাঁদিয়া করিব ভোর,
জানিতেও পারিবে না কেহ!”
সুরেশ ব্যথিতহিয়া, একেলা বিজনে গিয়া
ভাবিত, কাঁদিত আনমনে–
প্রাণপণ করি তার তবুও ত ললিতার
পারিল না অশ্রুবিমোচনে।
সুরেশ প্রভাতে উঠি– সারাটি কানন লুটি
তুলিয়া আনিত ফুলভার,
ফুলগুলি বাছি বাছি গাঁথি লয়ে মালাগাছি
ললিতারে দিত উপহার।
নির্ঝরে লইত জল, তুলিয়া আনিত ফল
আহারের তরে বালিকার।
যতন করিয়া কত– পর্ণশয্যা বিছাইত,
গুছাইত ঘরখানি তার।
…
শীতের তীব্রতা সহি, তপনকিরণে দহি–
করিয়া শতেক অত্যাচার,
মনের ভাবনা-ভরে অবসন্ন কলেবরে
পীড়া অতি হল ললিতার।
অনলে দহিছে বুক, শুকায়ে যেতেছে মুখ,
শুষ্ক অতি রসনা তৃষায়–
নিশ্বাস অনলময়, শয্যা অগ্নি মনে হয়,
ছটফট করে যাতনায়।
ত্যজিয়া আহার পান সারা-রাত্রি-দিনমান
সুরেশ করিছে তার সেবা,
তৃষার্ত্ত অধরে তার ঢালিছে সলিলধার,
ব্যজন করিছে রাত্রি দিবা।
নিশীথে সে রুগ্নঘরে একটি শিলার-‘পরে
দীপশিখা নিভ’নিভ’ বায়ে–
জ্যোতি অতি ক্ষীণতর, দু পা হয়ে অগ্রসর
অন্ধকারে যেতেছে হারায়ে।
আকুল নয়ন মেলি কাতর নিশ্বাস ফেলি,
একটিও কথা না কহিয়া,
শিয়রের সন্নিধানে সুরেশ সে মুখপানে
একদৃষ্টে রহিত চাহিয়া।
বিকারে ললিতা যত বকিত পাগল-মত,
ছটফট করিত শয়ানে–
ততই সুরেশ-হিয়া উঠিত গো ব্যাকুলিয়া,
অশ্রুধারা পূরিত নয়নে।
যখনি চেতনা পেয়ে, ললিতা উঠিত চেয়ে,
দেখিত সে শিয়রের কাছে
ম্লানমুখ করি নত– নিস্তব্ধ ছবির মত
সুরেশ নীরবে বসি আছে।
মনে তার হত তবে, এ বুঝি দেবতা হবে,
অসহায়া অবলা বালারে
করুণাকোমল প্রাণে এ ঘোর বিজন স্থানে
রক্ষা করে নিশার আঁধারে।
অশ্রুধারা দরদরি কপোলে পড়িত ঝরি,
সুরেশের ধরি হাতখানি
কৃতজ্ঞতাপূর্ণ প্রাণে, আঁখি তুলি মুখপানে
নীরবে কহিত কত বাণী!
রোগের অনলজ্বালা সহিতে না পারি বালা
করিতে সে এ-পাশ ও-পাশ,
হেরিয়ে করুণাময় সুরেশের আঁখিদ্বয়–
অনেক যাতনা হ’ত হ্রাস।
ফল-মূল-অন্বেষণে– যুবা যবে যেত বনে
একেলা ঠেকিত ললিতার।
চাহিত উৎসুকহিয়া প্রতি শব্দে চমকিয়া,
সমীরণে নড়িলে দুয়ার।
বনে বনে বিহরিয়া– ফুল ফল আহরিয়া
সুরেশ আসিত যবে ফিরে–
আঁখি পাতা বিমুদিত– অতি মৃদু উঠাইত,
হাসিটি উঠিত ফুটি ধীরে।
দিন রাত্রি নাহি মানি– বনৌষধি তুলি আনি
সুরেশ করিছে সেবা তার।
রোগ চলি গেল ধীরে,বল ক্রমে পেলে ফিরে,
সুস্থ হ’ল দেহ ললিতার।
রোগশয্যা তেয়াগিয়া– মুক্ত সমীরণে গিয়া,
মনসুখে বনে বনে ফিরি
পাখীর সঙ্গীত শুনি– সিন্ধুর তরঙ্গ গুনি
জীবনে জীবন এল ফিরি।
…
চতুর্থ সর্গ
বসন্তসমীর আসি, কাননের কানে কানে
প্রাণের উচ্ছ্বাস ঢালে নব যৌবনের গানে।
এক ঠাঁই পাশাপাশি ফুটে ফুল রাশি রাশি–
গলাগলি ফুলে ফুলে, গায়ে গায়ে ঢলাঢলি।
খেলি প্রতি ফুল-‘পরে সুরভিরাশির ভরে
শ্রান্ত সমীরণ পড়ে প্রতি পদে টলি টলি।
কোথায় ডাকিছে পাখী, খুঁজিয়া না পায় আঁখি–
বনে বনে চারি দিকে হাসিরাশি বাদ্যগান।
দুরগম শৈল যত, ঢাকা লতা গুল্মে শত
তাদের হরিত হৃদে তিল মাত্র নাই স্থান।
ললিতার আঁখি হতে শুকায়েছে অশ্রুধার,
বসন্তগীতের সাথে বাজিছে হৃদয় তার।
পুরাণো পল্লব ত্যজি নবকিশলয়ে যথা
চারি দিকে বনে বনে সাজিয়াছে তরুলতা,
তেমনি গো ললিতার হৃদয়লতাটি ঘিরে
নবীন হরিতপ্রেম বিকশিছে ধীরে ধীরে।
ললিতা সে সুরেশের হাতে হাত জড়াইয়া
বসন্তহসিত বনে, ভ্রমিত হরষমনে,
করুণ চরণক্ষেপে ফুলরাশি মাড়াইয়া।
একটি দুর্গম শৈল সাগরের পড়েছে ঝুঁকি–
অতি ক্লেশে সেথা উঠি বসিয়া রহিত দুটি,
সায়াহ্নকিরণ জলে করিত গো ঝিকিমিকি।
লহরীরা শৈল-‘পরে, শৈবালগুলির তরে
দিন রাত্রি খুদিতেছে নিকেতন শিলাসার।
ফুল-ভরা গুল্মগুলি সলিলে পড়েছে ঝুলি,
তরঙ্গের সাথে সাথে ওঠে পড়ে শতবার।
বিভলা মেদিনীবালা জোছনামদিরা-পানে,
হাসিছে সরসীখানি কাননের মাঝখানে,
সুরেশ যতনে অতি বাঁধি তরুশাখাগুলি
নৌকা নিরমিয়া এক সরসে দিয়াছে খুলি–
চড়ি সে নৌকার ‘পরে, জ্যোৎস্নাসুপ্ত সরোবরে
সুরেশ মনের সুখে ভ্রমিত গো ফিরি ফিরি,
ললিতা থাকিত শুয়ে কোলে তার মাথা থুয়ে,
কখন বা মধুমাখা গান গেয়ে ধীরি ধীরি।
কখন বা সায়াহ্নের বিষণ্ণ কিরণজালে,
অথবা জোছনা যবে কাঁপে বকুলের ডালে,
মৃদু মৃদু বসন্তের স্নিগ্ধ সমীরণ লাগি,
সহসা ললিতাহৃদি আকুলি উঠিত যদি,
সহসা দুয়েক কথা স্মরণে উঠিত জাগি,
সহসা একটি শ্বাস বাহিরিত আনমনে,
দুইটি অশ্রুর রেখা দেখা দিত দুনয়নে–
অমনি সুরেশ আসি ধরি তার মুখখানি
কহিত করুণ স্বরে কত আদরের বাণী।
মুছাইত আঁখিধারা যতন করিয়া অতি,
শরতমেঘের মত হৃদয়-আঁধার যত
মূহূর্ত্তে ছুটিত আর ফুটিত হাসির জ্যোতি।
অমনি সে সুরেশের কাঁধে মুখ লুকাইয়া
আধো কাঁদি আধো হাসি হৃদয়ের ভাররাশি
সোহাগের পারাবারে দিত সব বিসর্জ্জিয়া।
…
পঞ্চম সর্গ
নারিকেল-তরুকুঞ্জে” বসিয়া দোঁহায়
একদা সেবিতেছিল প্রভাতের বায়–
সহসা দেখিল চাহি প্রাণপণে দাঁড় বাহি
তরণী আসিছে এক সে দ্বীপের পানে,
দেখিয়া দোঁহার হিয়া উঠিল গো উথলিয়া
বিস্ময়হরষ আর নাহি ধরে প্রাণে!
হরষে ভাবিল দোঁহে দেশে যাবে ফিরে,
কুটীর বাঁধিবে এক বিপাশার তীরে।
দুখ শোক ভুলি গিয়া– একত্রে দুইটি হিয়া
সুখে জীবনের পথে করিবে ভ্রমণ,
একত্রে দেখিবে দোঁহে সুখের স্বপন।
উঠিল তরণী-‘পরে, অনুকুলবায়ুভরে
স্বদেশে করিল আগমন–
বাঁধিয়া পরণশালা না জানিয়া কোন্ জ্বালা
করিতেছে জীবনযাপন।
নির্ঝর কানন নদী, দ্বীপের কুটীর যদি
তাহাদের পড়িত স্মরণে,
দুটিতে মগন হয়ে, অতীতের কথা লয়ে
ফুরাতে নারিত সারাক্ষণে।
আধ’ ঘুমঘোরে প্রাতে, পল্লবমর্ম্মর-সাথে
শুনি বিপাশার কলস্বর–
স্বপনে হইত মনে দূর সে দ্বীপের বনে
শুনিতেছে নির্ঝরঝর্ঝর!
দ্বীপের কুটীরখানি কল্পনায় মনে আনি
ভাবিত সে শূন্য আছে পড়ি,
ভগ্ন ভিতে উঠে লতা, গৃহসজ্জা হেথা হোথা
প্রাঙ্গণে যেতেছে গড়াগড়ি,
হয়ত গো কাঁটাগাছে এত দিনে ঘিরিয়াছে
ললিতার সাধের কানন–
এত দিনে শাখা জুড়ি ফুটেছে মালতীকুঁড়ি
দেখিবার নাই কোন জন।
সেই যে শৈলেতে উঠি বসিয়া রহিত দুটি,
নারিকেলকুঞ্জটির কাছে–
চারি দিকে শিলারাশি, ছড়াছড়ি পাশাপাশি
তাহারা তেমনি রহিয়াছে।
মজিয়া কল্পনামোহে, কত কি ভাবিত দোঁহে,
মাঝে মাঝে উঠিত নিশ্বাস,
অতীত আসিত ফিরে, গায়ে যেন ধীরে ধীরে
লাগিত সে দ্বীপের বাতাস।
একদা চাঁদিনী রাতি, দুজনে প্রমোদে মাতি
গেছে এক বিজন কাননে–
ভ্রমিতে ভ্রমিতে তথা, কহিতে কহিতে কথা
কত দূরে গেল আন্মনে।
সহসা যে বিভাবরী, আইল আঁধার করি–
গগনে উঠিল মেঘরাশি,
পথ নাহি দেখা যায়, ক্ষণে ক্ষণে ঝলকায়
বিদ্যুতের পরিহাসহাসি।
প্রতি ব্রজগরজনে, ললিতা শঙ্কিতমনে
সুরেশে জড়ায় দৃঢ়তর।
অবসন্ন পদ তায়, প্রতি পদে বাধা পায়,
তরাসেতে তনু থর থর।
ঝলিল বিদ্যুৎ-শিখা, ভগ্ন এক অট্টালিকা
অদূরেতে প্রকাশিল তথা–
কক্ষ এক হতে তার, মুমূর্ষ আলোকধার
কহে কি রহস্যময় কথা!
চলিল আলয়-পানে, দোঁহে আশ্বাসিত প্রাণে,
সহসা জাগিল নীরবতা–
উঠিল সঙ্গীতস্বর বালার হৃদয়-‘পর
প্রবেশিল দু-একটি কথা–
“পাগলিনী, তোর লাগি কি আমি করিব বল্।
কোথায় রাখিব তোরে খুঁজে না পাই ভূমণ্ডল।”
কাঁপিছে বালার বুক, নীল হয়ে গেছে মুখ,
কপোলে বহিছে ঘর্ম্মজল–
ঘুরিছে মস্তক তার, চরণ চলে না আর,
শরীরে নাইক বিন্দুবল।
তবুও অবশমনে অলক্ষিত আকর্ষণে
চলিল সে ভীষণ আলয়ে–
অঙ্গন হইয়া পার খুলি এক জীর্ণ দ্বার
গৃহে পদার্পিল ভয়ে ভয়ে।
ভগ্ন ইষ্টকের ‘পরে, দীপ মিট্ মিট্ করে,
বিদ্যুৎ ঝলকে বাতায়নে–
ভেদি গৃহভিত্তি যত, বটমূল শত শত
হেথা হোথা পড়িছে নয়নে।
বিছানো শুকানো পাতা, শুয়ে আছে রাখি মাথা,
পুরুষ একটি শ্রান্তকায়–
অতি শীর্ণদেহ তার, এলোথেলো জটাভার,
মুখশ্রী বিবর্ণ অতি ভায়।
জ্যোতিহীন নেত্র তাঁর, পাতাটিও তুলিবার
নাই যেন আঁখির শকতি–
দ্বারে শুনি পদধ্বনি হৃদয়ে বিস্ময় গণি
তুলে মুখ ধীরে ধীরে অতি।
সহসা নয়নে তার জ্বলিল অনল,
সহসা মুহূর্ত্ততরে দেহে এল বল।
“ললিতা” “ললিতা” বলি করিয়া চীৎকার–
দু-পা হয়ে অগ্রসর কম্পবান কলেবর
শ্রান্ত হয়ে ভুমিতলে পড়িল আবার।
করুণ নয়নে অতি– ললিতা-মুখের প্রতি
অজিত রহিল স্তব্ধ একদষ্টে চাহি–
দীপশিখা অতি স্থির, স্তব্ধ গৃহ সুগভীর
চারি দিকে একটুকু সাড়াশব্দ নাহি।
দুই হাতে আঁখি চাপি, থর থর কাঁপি কাঁপি
মূর্চ্ছিয়া ললিতা বালা পড়িল অমনি!
বাহিরে উঠিল ঝড়, গর্জ্জিল অশনি–
জীর্ণ গৃহ কাঁপাইয়া– ভগ্ন বাতায়ন দিয়া
প্রবেশিল বায়ুচ্ছ্বাস গৃহের মাঝারে,
নিভিল প্রদীপ, গৃহ পূরিল অঁধারে।
Shaishab Sangeet Kabyagranther ‘Bhagnatari’ Kobita — Rabindranath Tagore
Gatha
Prothom Sarga
Dubichhe topon, asichhe andhar,
Diba holo oboshan—
Ghumay sanjher sagor, koriya
Konok-kiron pan.
Olos lohori toter charone
Ghume poritechhe dhuli,
E uhar gaye porechhe elaye
Bhangachora meghguli.
Konok-solile lohori tuliya
Toroni bhasia jay—
Uriyachhe pal, nachichhe nishan,
Bohe onukul bay.
Shoto kontho hote sanjher akashe
Uthichhe sukher geet,
Tale tale tar poritechhe dar,
Dhonitechhe chari bhit.
Bajitechhe bina, bajitechhe banshi,
Bajitechhe bheri koto—
Keho dey tali, keho dhore tan,
Keho nache gyanohoto.
Taroka uthichhe phutiya phutiya,
Akashe uthichhe shoshi,
Uchchholi uchchholi uthichhe sagor,
Jochhona porichhe khosi.
Oti niribili, nir alay dekh
Na mishiya kolahole,
Lolita hothay, poti sathe tar
Boshi achhe gole gole.
Ajiter gole bandhi bahupash
Bukete mathati rakhi,
Dholodhol tonu, gol’gol’ kora
Dhulu dhulu duti ankhi.
Adho adho hashi adhore jorito,
Sukher nahi je or,
Pronoy-bibhol praner majhare
Legechhe ghumer ghor.
Poroshichhe deho nishither bayu
Oti dhir mridushwase,
Lohorira ashi kore kolorob
Toronir ashe-pashe.
Modhur modhur sokoli modhur,
Modhur akash dhora,
Modhurojonir modhur odhor
Modhu jochhonay bhora.
Jetechhe dibos, cholechhe toroni
Onukul bayubhore.
Chhoto chhoto dheu mathaguli tuli
Tolmol kori pore.
Pronoyir kal jetechhe, tuliya
Shoto boroner pakha,
Mridubayubhore loghu megh jeno
Sanjher-kiron-makha.
Adore bhasia gahichhe Ajit
Chahi Lolitar pane
Morom-golano sohager geet
Abesh-obosh prane—
Gaan
Pagolini tor lagi ki ami koribo bol,
Kothay rakhib tore khunje na pai bhumondol!
Adorer dhon tumi, adore rakhib ami,
Adorini, tor lagi pethechhi e bokkhosthol.
Ay tore buke rakhi, tumi dekh ami dekhi—
Shwase shwash mishhaib ankhi-jole ankhi-jol.
Horoshe kobhu ba gaichhe Lolita
Ajiter hat dhori,
Mukhpane tar chahiya chahiya
Preme ankhi duti bhori—
Gaan
Oi kotha bolo sokha, bolo ar bar,
Bhalobasho more taha bolo bar-bar!
Kotobar shuniyachhi tobuo abar yachi,
Bhalobasho more taha bolo go abar!
…
Sandhya dikbodhu stobdho bhoybhare,
Ekti nishwash pore na tar;
Ishan-gogone korichhe montrona
Miliya ayuto jolodbhar.
Torito-chhurite bindhiya bindhiya
Phelichhe andhare shotodha kori,
Dur jhotikar rothochokrorob
Ghoshichhe oshoni trilok bhori.
Shohosa uthilo ghor gorjon,
Proloy-jhotika asichhe chhute.
Chhinno meghjal digbidike dhay,
Phenil torongo akuli uthe.
Pagoler moto torijatri joto
Hetha hotha chhute toroni-‘pore—
Chhiritechhe kesh, hanitechhe buk,
Kore hahakar kator shore!
Chhinno-tar bina jay goragori,
Adhire bhangiya phelechhe banshi—
Jhotikar swor diteche dubaye
Shotek konther bilap-rashi.
Toronir pashe nirob Ajit,
Lolita obak-hiya,
Mathati rakhia Ajiter kandhe
Rohiyachhe daraiya.
Ki bhoy morone, ek sathe jobe
Moribe dujone mili?
Mukuta-shayone sagorer tole
Ghumaibe niribili!
Duti pronoyi bandha gole gole
Kachhakachhi pasapashi,
Pashibe na setha dwesh kolahol,
Kutil kothor hashi.
Jhotikar mukhe hinbol tori
Koritechhe tolmol—
Uthichhe, namichhe achhari porichhe,
Bhitore pashichhe jol.
Bandhilo Lolita Ajiter bahu
Drirhotoro bahudore,
Adore Ajit Lolita-odhor
Chumilo hridoy bhore.
Lolita-kopole bahia porilo
Noyoner jol duti—
Nobin sukher swopon, hay re,
Majhkhane gelo tuti.
“Ay sokhi ay” kohilo Ajit—
Hat dhoradhori kori
Dujone miliya jhapiye porilo
Akul sagor-‘pori.
…
Ditiyo Sarga
Noborobi subimol kiran dhaliya
Nishar andhar-rashi phelilo kshaliya.
Jhotikar obosane prokriti sohas,
Songjoto korichhe tar elothelo bash.
Khelaye khelaye shranto sarati yamini,
Meghkole ghumaiya porechhe damini.
Theke theke swoponete chomkiya chay,
Kshin hashikhani hese abar ghumay.
Shanto lohorira ebe shranto podokkhepe
Tir-upoler ‘pore pore kempe kempe.
Diper shoiler shir plabito koriya,
Ojosro konokdhara porichhe jhoriya.
Megh, dip, jol, shoil, shob suronjito—
Somosto prokriti gay sworno-dhala geet.
Bohu din hote ek bhognatari jon
Korichhe bijon dipe jibonjapon.
Bijonota-bhare tar obosonno buk,
Koto dine dekhe nai manusher mukh.
Eto din moun achhe na peye doshor,
Shunile chomki uthe aponar swor.
Suresh probhate aji chhariya kutir
Bhramite bhramite elo sagorer tir.
Bimol probhate aji shanto somiron
Dhire dhire kore tar deho alingon.
Nirobe bhramichhe koto—eki re—eki re—
Sumukhe ki dekhitechhi sagorer tire?
Ruposhi lolona ek royechhe shoyan,
Probhato-kiron tar chumichhe boyan—
Mudito noyon duti, shithilito kay,
Sikto keha elothelo shubhra balukay.
Protikshone lohorira dhaliya belay
Elano kuntol lo’ye koto na khelay!
Bohu din pore jotha karamukto jon
Horshe odhiriya uthe heriya topon,
Bohu din pore heri manusher mukh
Uchchhoshi uthilo sukhe Suresher buk.
Dekhil ekhono bohe nishwash-somir,
Ekhono tusharhim hoy ni shorir.
Jotone loilo tare bahute tuliya,
Keshpash chari pashe porilo khuliya.
Sukumor mukhkhani rakhi skandhopore,
Druto pode probeshilo kutir-bhitore.
Kotokkhan-pore tobe lobhiya cheton
Lolita sudhire oti melilo noyon.
Dekhil jubok ek royechhe asin,
Bishal noyon tar nimeshbihin—
Kunchito kuntol-rashi gour griba-‘pore
Elaiya pori achhe oti onadore.
Chomki uthilo bala bismoye bihbol,
Shorome shombore tar shithil onchol.
Bhoyete obosh deho, duru duru hiya—
Akul hoiya kichhu na pay bhabiya.
Shohosa tahar mone porilo sokoli—
Shohosa uthilo bosi nobobole boli.
Suresher mukhpane chahiya chahiya
Pagoler moto bala uthilo kohiya,
“Keno bachhaile more koh more koh—
Dui pronoyir keno ghotaile biroho?
Ononto milon jobe hoilo odur—
Dwar hote phiraiya anile nishthur!
Daya kor ektuku dukhiniro proti,
Diyo na taposhor badha ek roti—
Morib—nibhab pran sagorer jole,
Milib sokhar sathe niloshindhutole,
Upore uthibe jhor, urmi shoilakar,
Nimne kichhu pashibe na kolahol tar!”
…
Tritiyo Sarga
Moromer bhar bohi— darun jatona sohi
Lolita se kataichhe din.
Noyone nai se jyoti— hridoy obosh oti,
Shorir hoiya gechhe khin.
Aluthalu keshpash, bandhite nahik ash,
Uriya porichhe thaki thaki.
Ki korun mukhkhani, ekti naik bani,
Kende kende-shranto duti ankhi.
Je dike choron dhay, se dike cholechhe hay,
Kichhute bhrukkhep nai mone,
Gachher kantar dhar, chhirichhe anchol tar,
Lotapash bandhichhe chorone.
Ekaki aponmone bhramite bhramite bone
Yaito se totinir tire—
Lotay patay gachhe— andhar koriya achhe,
Seikhane shuyit sudhire.
Jolkolorob-rashi, praner bhitore ashi
Dhalit ki bishader dhara!
Phatiya jaito buk, bahute dhakiya mukh
Kandiya kandiya hoto shara.
Kanon-shoiler paye, modhyahne gachher chhaye
Molin anchole rakhi matha
Koto ki bhabito hay, uchchhoshi uthito bay,
Jhoriya porito shushko pata.
Gobhir nirob rate uthiya shoiler mathe
Bosiya rohit ekakini—
Tara-pane cheye cheye, koto-ki bhabito meye,
Porito ki bishad-kahini!
Ki korile Lolitar— ghuchibe hridoybhar
Suresh na pait bhabiya—
Kator hoiya koto juba tare shudhait,
Agrohe odhir tar hiya—
“Rakho kotha, shono sokhi, ekbar bolo dekhi
Ki korib tomar lagiya?
Ki chao, ki dib bala, bolo go kisher jwala?
Ki korile jurabe o hiya?”
Korun momota peye— Suresher mukh cheye
Ashru uchchhoshito dordore—
Lolita kator robe ruddhokonthe kohe tobe,
“Sokha go bhebo na mor tore!
Amare dio na dekha, bijone rohib eka,
Bijonei nipatib deho.
E dogdho jibon mor, kandiya korib bhor,
Janiteo paribe na keho!”
Suresh byathito-hiya, ekela bijone giya
Bhabito, kandito anmone—
Pranpon kori tar tobuo to Lolitar
Parilo na ashru-bimochone.
Suresh probhate uthi— sarati kanon luti
Tuliya anito phulbhar,
Phulguli bachhi bachhi ganthi lo’ye malagachhi
Lolitare dito upohar.
Nirjhore loito jol, tuliya anito phol
Aharer tore balikar.
Jotno koriya koto— porno-shojja bichhait,
Guchhait ghorokhani tar.
…
Shiter tibrota sohi, toponkirone dahi—
Koriya shotek otyachar,
Moner bhabna-bhore obosonno kolebore
Pira oti holo Lolitar.
Onole dahichhe buk, shukaiye jetechhe mukh,
Shushko oti roshona trishay—
Nishwash onolmoy, shojja ogni mone hoy,
Chhotphot kore jatonay.
Tyajiya ahar pan sararatri-dinman
Suresh korichhe tar sheba,
Trisharto adhore tar dhalichhe solildhar,
Byajon korichhe ratri-diba.
Nishithe se rugnoghore ekti shilar-‘pore
Dipshikha nibh’nibh’ baye—
Jyoti oti khinotor, du pa hoye ogrosor
Andhokare jetechhe haraye.
Akul noyon meli kator nishwash pheli,
Ektio kotha na kohiya,
Shiyorer sannidhane Suresh se mukhpane
Ekdrishte rohit chahiya.
Bikare Lolita joto bokit pagol-moto,
Chhotphot korit shoyane—
Totoi Suresh-hiya uthit go byakuliya,
Ashrudhara purito noyone.
Jokhoni chetona peye, Lolita uthit cheye,
Dekhit se shiyorer kachhe
Mlanmukh kori noto— nistobdho chhobir moto
Suresh nirobe bosi achhe.
Mone tar hoto tobe, e bujhi debota hobe,
Oshohaya obola balare
Koruna-komol prane e ghor bijon sthane
Rokkha kore nishar andhare.
Ashrudhara dordori kopole porito jhori,
Suresher dhori hathkhani
Kritoggotapurno prane, ankhi tuli mukhpane
Nirobe kohito koto bani!
Rog-er onolojwala sohoite na pari bala
Korite se e-pash o-pash,
Her iye korunamoy Suresher ankhidwoy—
Onek jatona hoto hrash.
Phol-mul-onneshone— juba jobe jeto bone
Ekela thekito Lolitar.
Chahito utsuk-hiya proti shobde chomkiya,
Somirane norile duar.
Bone bone bihoriya— phul phol ahoriya
Suresh asito jobe phire—
Ankhipata bimudito— oti mridu uthaito,
Hashiti uthito phuti dhire.
Din ratri nahi mani— bonoushodhi tuli ani
Suresh korichhe sheba tar.
Rog choli gelo dhire, bol krrome pele phire,
Sustho holo deho Lolitar.
Rogshojja tyagiy a— mukto somirone giya,
Monsukhe bone bone phiri
Pakhir sangeet shuni— sindhur torongo guni
Jibone jibon elo phiri.
…
Choturtho Sarga
Bosonto-somir ashi, kanoner kane kane
Praner uchchhash dhale nobojouboner gane.
Ek thain pasapashi phote phul rashi rashi—
Golagoli phule phule, gaye gaye dholadholi.
Kheli proti phul-‘pore shurobhi-rashir bhore
Shranto somiron pore proti pode toli toli.
Kothay dakichhe pakhi, khunjiya na pay ankhi—
Bone bone chari dike hashi-rashi badyogan.
Durgom shoil joto, dhaka lota-gulme shot
Tader horit hrid-e til matro nai sthan.
Lolitar ankhi hote shukayechhe ashru-dhar,
Bosonto-giter sathe bajichhe hridoy tar.
Purano pallob tyaji nobokisholoye jotha
Chari dike bone bone sajiyachhe torulota,
Temni go Lolitar hridoy-lotati ghire
Nobin horit-prem bikoshichhe dhire dhire.
Lolita se Suresher hate hat joraiya
Bosonto-hoshito bone, bhramito horoshmone,
Korun choronkshepe phul-rashi maraiya.
Ekti durgom shoil sagorer porechhe jhuki—
Oti kleshe setha uthi bosiya rohit duti,
Sayahnokiron jole korito go jhiki-miki.
Lohorira shoil-‘pore, shoibalgulir tore
Din ratri khuditichhe niketon shilashar.
Phul-bhora gulmguli solile porechhe jhuli,
Toronger sathe sathe othe pore shotobar.
Bibhola medinibala jochhona-modira-pane,
Hashichhe sorosikhani kanoner majhkhane,
Suresh jotone oti bandhi torushakhaguli
Nouka nirmiya ek sorose diyachhe khuli—
Chori se noukar ‘pore, jyotsna-supto sorobore
Suresh moner sukhe bhramito go phiri phiri,
Lolita thakito shuye kole tar matha thuye,
Kokhono ba modhumakha gan geye dhiri dhiri.
Kokhono ba sayahner bishonno kiron-jale,
Othoba jochhona jobe kape bokuler dale,
Mridu mridu bosonter snigdho somiron lagi,
Shohosa Lolita-hridi akuli uthito jodi,
Shohosa duyek kotha smorone uthito jagi,
Shohosa ekti shwash bahirito anmone,
Duti ashru-r rekha dekha dito dunoyone—
Omoni Suresh ashi dhori tar mukhkhani
Kohito korun swore koto ador-er bani.
Muchhait ankhidhara jotno koriya oti,
Shorot-megher moto hridoy-andhar joto
Muhurte chhutito ar phutito hashir jyoti.
Omoni se Suresher kandhe mukh lukaiya
Adho kandi adho hashi hridoyer bhar-rashi
Sohager parabare dito shob bisorjiya.
…
Ponchom Sarga
Narikel-torukunje bosiya donhay
Ekoda sebitachhilo probhater bay—
Shohosa dekhilo chahi pranpone dar bahi
Toroni asichhe ek se diper pane,
Dekhiya donhar hiya uthilo go utholiya
Bismoy-horosh ar nahi dhore prane!
Horoshe bhabil donhe deshe jabe phire,
Kutir bandh ibe ek Bipashar tire.
Dukh shok bhuli giya— ekotre duiti hiya
Sukhe jiboner pothe koribe bhramon,
Ekotre dekhibe donhe sukher swopon.
Uthilo toroni-‘pore, onukul-bayubhore
Swodeshe korilo agomon—
Bandhiya pornosala na janiya kon jwala
Koritechhe jibonjapon.
Nirjhor kanon nodi, diper kutir jodi
Tahader porito smorone,
Dutite mogno hoye, otiter kotha lo’ye
Phurate narito sarakkhone.
Adh’ ghumghore prate, pallob-mormor-sathe
Shuni Bipashar koloswor—
Swopone hoito mone dur se diper bone
Shunitechhe nirjhor-jhorjhor!
Diper kutirkhani kolponay mone ani
Bhabito se shunyo achhe pori,
Bhogno bhite uthe lota, grihoshajja hetha hotha
Prangone jetechhe goragori,
Hoyto go kantagachhe et dine gheriyachhe
Lolitar shader kanon—
Et dine shakha juri phutechhe maloti-kuri
Dekhibar nai kon jon.
Sei je shoilete uthi bosiya rohit duti,
Narikel-kun j tir kachhe—
Chari dike shilarashi, chorachori pasapashi
Tah ara temni roiyachhe.
Majiya kolpona-mohe, koto ki bhabito donhe,
Majhe majhe uthito nishwash,
Otit asito phire, gaye jeno dhire dhire
Lagit se diper batas.
Ekoda chandini rati, dujone promode mati
Geche ek bijon kanone—
Bhramite bhramite tatha, kohite kohite kotha
Koto dure gelo anmone.
Shohosa je bibhabori, ail andhar kori—
Gogone uthilo megh-rashi,
Poth nahi dekha jay, khone khone jholokay
Bidyuter porihash-hashi.
Proti brojo-gorjone, Lolita shonkito-mone
Sureshe joray drirhotor.
Obosonno pod t ay, proti pode badha pay,
Trash ete tonu thor thor.
Jholil bidyut-shikha, bhogno ek ottalika
Odurete prokashilo tatha—
Kokkho ek hote tar, mumurshu alok-dhar
Kohe ki rohosshomoy kotha!
Cholil aloy-pane, donhe ashwasito prane,
Shohosa jagil nirobota—
Uthil sangeet-swor balar hridoy-‘por
Probeshil du-ekti kotha—
“Pagolini, tor lagi ki ami korib bol,
Kothay rakhib tore khunje na pai bhumondol.”
Kampichhe balar buk, nil hoye gechhe mukh,
Kopole bahichhe ghormojol—
Ghurichhe mostok tar, choron chole na ar,
Shorire naik bindubol.
Tobu o oboshmone olokkhyito akorshone
Cholil se bhishon aloye—
Angon hoiya par khuli ek jirno dwar
Grihe podarpil bhoye bhoye.
Bhogno ishtoker ‘pore, dip mitmit kore,
Bidyut jholoke batayone—
Bhedi grihobhittyo joto, botmul shot shot
Hetha hotha porichhe noyone.
Bichhano shukano pata, shuye achhe rakhi matha,
Purush ekti shranto-kay—
Oti shirnodeho tar, elothelo jotabhar,
Mukhshri biborno oti bhay.
Jyotihin netro tar, patati-o tulibar
Nai jeno ankhir shokti—
Dware shuni pododhoni hridoye bismoy goni
Tule mukh dhire dhire oti.
Shohosa noyone tar jwolil onol,
Shohosa muhurttotore dehe elo bol.
“Lolita” “Lolita” boli koriya chitkar—
Du-pa hoye ogrosor kompoman kolebor
Shranto hoye bhumital e porilo abar.
Korun noyone oti— Lolita-mukher proti
Ajit rohil stobdho ekdrishte chahi—
Dipshikha oti sthir, stobdho griho sugobhir,
Chari dike ektuku sarashobdo nahi.
Dui hate ankhi chapi, thor thor kampi kampi
Murchhiya Lolita bala porilo omoni!
B ahire uthilo jhor, gorj jilo oshoni—
Jirno griho kampaiya— bhogno batayon diya
Probeshil bayuchchhash griher majhare,
Nibhilo prodip, griho purilo andhare.

![লীলা কবিতা [ রবীন্দ্রনাথের সকল কাব্যগ্রন্থের লীলা নামের কবিতার সংকলন ] লীলা কবিতা [ রবীন্দ্রনাথের সকল কাব্যগ্রন্থের লীলা নামের কবিতার সংকলন ]](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/লীলা-কবিতা-1024x536.gif)


![শৈশব সঙ্গীত কাব্যগ্রন্থের 'ভগ্নতরী' কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 ভগ্নতরী bhagnatari [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভগ্নতরী-bhagnatari-কবিতা--1024x536.gif)

![শৈশব সঙ্গীত কাব্যগ্রন্থের 'পথিক' কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 2 পথিক pothik [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/পথিক-pothik-কবিতা--1024x536.gif)
![গান সমাপন কবিতা [ Gaan Samaapan ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 3 গান সমাপন কবিতা [ Gaan Samaapan ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/গান-সমাপন-কবিতা-1024x536.jpg)

