বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সানাই’ (১৯৪০) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কবিতা হলো ‘অপঘাত’। এই কবিতায় বাংলার এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও আটপৌরে গ্রামীণ জীবনের চিত্রপট এঁকে, তার ঠিক শেষ মুহূর্তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলার এক নিদারুণ বৈপরীত্য ও আকস্মিক আঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | অপঘাত |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | সানাই |
| প্রকাশের বছর | ১৯৪০ (১৩৪৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | প্রকৃতি ও যুদ্ধবিরোধী আধুনিক কবিতা (Nature and Anti-war Modern Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
অপঘাত – সম্পূর্ণ কবিতা
সূর্যাস্তের পথ হতে বিকালের রৌদ্র এল নেমে।
বাতাস ঝিমিয়ে গেছে থেমে।
বিচালি-বোঝাই গাড়ি চলে দূর নদিয়ার হাটে
জনশূন্য মাঠে।
পিছে পিছে
দড়ি-বাঁধা বাছুর চলিছে।
রাজবংশীপাড়ার কিনারে
পুকুরের ধারে
বনমালী পন্ডিতের বড়ো ছেলে
সারাক্ষণ বসে আছে ছিপ ফেলে।
মাথার উপর দিয়ে গেল ডেকে
শুকনো নদীর চর থেকে
কাজ্লা বিলের পানে
বুনোহাঁস গুগ্লি-সন্ধানে।
কেটে-নেওয়া ইক্ষুখেত, তারি ধারে ধারে
দুই বন্ধু চলে ধীরে শান্ত পদচারে
বৃষ্টিধোওয়া বনের নিশ্বাসে,
ভিজে ঘাসে ঘাসে।
এসেছে ছুটিতে–
হঠাৎ গাঁয়েতে এসে সাক্ষাৎ দুটিতে,
নববিবাহিত একজনা,
শেষ হতে নাহি চায় ভরা আনন্দের আলোচনা।
আশে-পাশে ভাঁটিফুল ফুটিয়া রয়েছে দলে দলে
বাঁকাচোরা গলির জঙ্গলে,
মৃদুগন্ধে দেয় আনি
চৈত্রের ছড়ানো নেশাখানি।
জারুলের শাখায় অদূরে
কোকিল ভাঙিছে গলা একেঘেয়ে প্রলাপের সুরে।
টেলিগ্রাম এল সেই ক্ষণে
ফিন্ল্যান্ড্ চূর্ণ হল সোভিয়েট বোমার বর্ষণে।

Romanized Version
Finland churno holo Soviet bomar borshone.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- শান্ত ও আটপৌরে গ্রামীণ জীবন:
“সূর্যাস্তের পথ হতে বিকালের রৌদ্র এল নেমে। / বাতাস ঝিমিয়ে গেছে থেমে… বনমালী পণ্ডিতের বড়ো ছেলে / সারাক্ষণ বসে আছে ছিপ ফেলে।”— কবিতার শুরুটা হয় বাংলার এক অত্যন্ত শান্ত, মন্থর ও রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলের ছবি দিয়ে। বাতাস থেমে গেছে, বিচালি-বোঝাই গাড়ি হাটের দিকে যাচ্ছে, আর পুকুর পাড়ে ছেলেটি নিবিষ্ট মনে ছিপ ফেলে মাছ ধরছে। এটি মানবজীবনের এক নিখাদ শান্তির চিত্র।
- জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ ও প্রেম:
“দুই বন্ধু চলে ধীরে শান্ত পদচারে… নববিবাহিত একজনা, / শেষ হতে নাহি চায় ভরা আনন্দের আলোচনা।”— সদ্য বিবাহিত এক বন্ধু ছুটিতে গ্রামে এসে আরেক বন্ধুর সাথে দেখা করেছে। ভিজে ঘাসে হাঁটতে হাঁটতে তাদের আনন্দের আড্ডা আর শেষ হতে চায় না। চারপাশে ভাঁটিফুলের গন্ধ আর কোকিলের ডাক এই গ্রামীণ রোমান্টিকতা ও জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে আরও গাঢ় করে।
- আকস্মিক আঘাত বা ‘অপঘাত’:
“টেলিগ্রাম এল সেই ক্ষণে / ফিন্ল্যান্ড্ চূর্ণ হল সোভিয়েট বোমার বর্ষণে।”— কবিতার একেবারে শেষ দুটি লাইনে আকস্মিক এক বজ্রপাত ঘটে। গ্রামের এই শান্ত, মন্থর ও রোমান্টিক জীবনের মাঝেই হঠাৎ টেলিগ্রামে খবর আসে বহুদূরের ইউরোপে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের। প্রকৃতির শান্তির পটভূমিতে আধুনিক সভ্যতার এই পাশবিকতার খবরটি এক নিদারুণ ‘অপঘাত’ বা ট্র্যাজেডি হয়ে দেখা দেয়।
