বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সানাই’ (১৯৪০) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কবিতা হলো ‘অপঘাত’। এই কবিতায় বাংলার এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও আটপৌরে গ্রামীণ জীবনের চিত্রপট এঁকে, তার ঠিক শেষ মুহূর্তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলার এক নিদারুণ বৈপরীত্য ও আকস্মিক আঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামঅপঘাত
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসানাই
প্রকাশের বছর১৯৪০ (১৩৪৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপ্রকৃতি ও যুদ্ধবিরোধী আধুনিক কবিতা (Nature and Anti-war Modern Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতাটি রচনার সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে (বিশেষত ১৯৩৯ সালের শেষের দিকে ফিনল্যান্ডে সোভিয়েত রাশিয়ার আগ্রাসন)। শান্তিকামী রবীন্দ্রনাথ বিশ্বজুড়ে এই সাম্রাজ্যবাদী ধ্বংসলীলায় গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন। কবিতায় দেখা যায়, পড়ন্ত বিকেলে গ্রামের শান্ত পরিবেশ, গোরুর গাড়ি চলা, ছিপ ফেলে মাছ ধরা, দুই বন্ধুর গল্প করা এবং কোকিলের ডাকের মতো অত্যন্ত সাধারণ ও নির্মল গ্রামীণ চিত্র। কিন্তু কবিতার একেবারে শেষে হঠাৎ আসা একটি টেলিগ্রামের খবরে সেই শান্ত আবহ মুহূর্তেই চুরমার হয়ে যায়—সোভিয়েত ইউনিয়নের বোমায় ফিনল্যান্ড ধ্বংস হওয়ার সংবাদে। গ্রামীণ শান্তির স্নিগ্ধ পটভূমিতে আধুনিক সভ্যতার এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক আঘাতই হলো কবিতার মূল উপজীব্য ‘অপঘাত’।

অপঘাত – সম্পূর্ণ কবিতা

সূর্যাস্তের পথ হতে বিকালের রৌদ্র এল নেমে।

           বাতাস ঝিমিয়ে গেছে থেমে।

বিচালি-বোঝাই গাড়ি চলে দূর নদিয়ার হাটে

                   জনশূন্য মাঠে।

             পিছে পিছে

          দড়ি-বাঁধা বাছুর চলিছে।

      রাজবংশীপাড়ার কিনারে

          পুকুরের ধারে

      বনমালী পন্ডিতের বড়ো ছেলে

          সারাক্ষণ বসে আছে ছিপ ফেলে।

      মাথার উপর দিয়ে গেল ডেকে

          শুকনো নদীর চর থেকে

       কাজ্‌লা বিলের পানে

              বুনোহাঁস গুগ্‌লি-সন্ধানে।

       কেটে-নেওয়া ইক্ষুখেত, তারি ধারে ধারে

          দুই বন্ধু চলে ধীরে শান্ত পদচারে

               বৃষ্টিধোওয়া বনের নিশ্বাসে,

                    ভিজে ঘাসে ঘাসে।

                         এসেছে ছুটিতে–

     হঠাৎ গাঁয়েতে এসে সাক্ষাৎ দুটিতে,

          নববিবাহিত একজনা,

শেষ হতে নাহি চায় ভরা আনন্দের আলোচনা।

আশে-পাশে ভাঁটিফুল ফুটিয়া রয়েছে দলে দলে

       বাঁকাচোরা গলির জঙ্গলে,

          মৃদুগন্ধে দেয় আনি

                চৈত্রের ছড়ানো নেশাখানি।

           জারুলের শাখায় অদূরে

কোকিল ভাঙিছে গলা একেঘেয়ে প্রলাপের সুরে।

          টেলিগ্রাম এল সেই ক্ষণে

ফিন্‌ল্যান্ড্‌ চূর্ণ হল সোভিয়েট বোমার বর্ষণে।

 

Amar Rabindranath Logo

 

Romanized Version

Surjaster poth hote bikaler roudro elo neme.
Batash jhimiye gechhe theme.
Bichali-bozhai gari chole dur nodiyar hate
Jonoshunyo mathe.
Pichhe pichhe
Dori-bnadha bachhur cholichhe.
Rajbongshiparar kinare
Pukurer dhare
Bonomali ponditer boro chhele
Sharakkhon boshe achhe chhip phele.
Mathar upor diye gelo deke
Shukno nodir chor theke
Kajla biler pane
Bunohnash gugli-shondhane.
Kete-newa ikkhukhet, tari dhare dhare
Dui bondhu chole dhire shanto podochare
Brishtidhowa boner nishwase,
Bhije ghashe ghashe.
Eshechhe chhutite–
Hothat gnayete eshe shakkhat dutite,
Nobobibahito ekjona,
Shesh hote nahi chay bhora anonder alochona.
Ashe-pashe bhatiphul phutiya royechhe dole dole
Bnnakachora golir jonggole,
Mridugondhe dey ani
Choitrer chhorano neshakhani.
Jaruler shakhay odure
Kokil bhangichhe gola ekegheye prolaper shure.
Telegram elo shei khone

Finland churno holo Soviet bomar borshone.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • শান্ত ও আটপৌরে গ্রামীণ জীবন:
“সূর্যাস্তের পথ হতে বিকালের রৌদ্র এল নেমে। / বাতাস ঝিমিয়ে গেছে থেমে… বনমালী পণ্ডিতের বড়ো ছেলে / সারাক্ষণ বসে আছে ছিপ ফেলে।”
— কবিতার শুরুটা হয় বাংলার এক অত্যন্ত শান্ত, মন্থর ও রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলের ছবি দিয়ে। বাতাস থেমে গেছে, বিচালি-বোঝাই গাড়ি হাটের দিকে যাচ্ছে, আর পুকুর পাড়ে ছেলেটি নিবিষ্ট মনে ছিপ ফেলে মাছ ধরছে। এটি মানবজীবনের এক নিখাদ শান্তির চিত্র।
  • জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ ও প্রেম:
“দুই বন্ধু চলে ধীরে শান্ত পদচারে… নববিবাহিত একজনা, / শেষ হতে নাহি চায় ভরা আনন্দের আলোচনা।”
— সদ্য বিবাহিত এক বন্ধু ছুটিতে গ্রামে এসে আরেক বন্ধুর সাথে দেখা করেছে। ভিজে ঘাসে হাঁটতে হাঁটতে তাদের আনন্দের আড্ডা আর শেষ হতে চায় না। চারপাশে ভাঁটিফুলের গন্ধ আর কোকিলের ডাক এই গ্রামীণ রোমান্টিকতা ও জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে আরও গাঢ় করে।
  • আকস্মিক আঘাত বা ‘অপঘাত’:
“টেলিগ্রাম এল সেই ক্ষণে / ফিন্‌ল্যান্ড্‌ চূর্ণ হল সোভিয়েট বোমার বর্ষণে।”
— কবিতার একেবারে শেষ দুটি লাইনে আকস্মিক এক বজ্রপাত ঘটে। গ্রামের এই শান্ত, মন্থর ও রোমান্টিক জীবনের মাঝেই হঠাৎ টেলিগ্রামে খবর আসে বহুদূরের ইউরোপে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের। প্রকৃতির শান্তির পটভূমিতে আধুনিক সভ্যতার এই পাশবিকতার খবরটি এক নিদারুণ ‘অপঘাত’ বা ট্র্যাজেডি হয়ে দেখা দেয়।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সানাই কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের ইংরেজি অংশ পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন