বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের পড়ন্ত বেলায় রচিত ‘সানাই’ (১৯৪০) কাব্যগ্রন্থের একটি চমৎকার প্রকৃতি-দর্শন ও রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘অসময়’। এই কবিতায় প্রকৃতির রুক্ষতা ও বৈপরীত্যের মাঝেও এক চিরন্তন আশাবাদ ও আনন্দের কথা ফুটে উঠেছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামঅসময়
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসানাই
প্রকাশের বছর১৯৪০ (১৩৪৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপ্রকৃতি-দর্শন, রূপকধর্মী ও আশাবাদী গীতি-কবিতা (Philosophical Nature, Allegorical and Optimistic Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থে কবি প্রাত্যহিক জীবনের নানা অনুষঙ্গ ও প্রকৃতির বিচিত্র রূপ তুলে ধরেছেন। ‘অসময়’ কবিতায় বৈশাখ মাসের এক রুক্ষ, তপ্ত ও ফসলশূন্য বিকেলের চিত্র আঁকা হয়েছে। এমন এক শুষ্ক ও ধূসর পরিবেশে হঠাৎ করে একটি বুলবুলি পাখি এসে গান গায়, যা দৃশ্যত একেবারেই বেমানান বা ‘অসময়’-এর ঘটনা। কবির মনে হয়, পাখিটি হয়তো সকালের সুন্দর, স্নিগ্ধ আতিথ্যের স্মৃতি বুকে নিয়েই এই তপ্ত বিকেলে গান গাইতে এসেছে। সে জানে, ক্ষণিকের জন্য পাওয়া সকালের সেই ঐশ্বর্য বা সৌন্দর্য হারিয়ে গেলেও তার অন্তর্নিহিত আনন্দ বা সত্য কখনো হারিয়ে যায় না। সকালের পাখির বিকালের গানে মানবজীবনের সেই চিরন্তন আশাবাদই মূর্ত হয়েছে।

অসময় – সম্পূর্ণ কবিতা

বৈকালবেলা ফসল-ফুরানো

          শূন্য খেতে

বৈশাখে যবে কৃপণ ধরণী

          রয়েছে তেতে,

ছেড়ে তার বন জানি নে কখন

         কী ভুল ভুলি

শুষ্ক ধূলির ধূসর দৈন্যে

          এসেছিল বুল্‌বুলি।

সকালবেলার স্মৃতিখানি মনে

          বহিয়া বুঝি

তরুণ দিনের ভরা আতিথ্য

          বেড়ালো খুঁজি।

অরুণে শ্যামলে উজ্জ্বল সেই

          পূর্ণতারে

মিথ্যা ভাবিয়া ফিরে যাবে সে কি

          রাতের অন্ধকারে।

তবুও তো গান করে গেল দান

          কিছু না পেয়ে।

সংশয়-মাঝে কী শুনায়ে গেল

          কাহারে চেয়ে।

যাহা গেছে সরে কোনো রূপ ধ’রে

          রয়েছে বাকি,

এই সংবাদ বুঝি মনে মনে

          জানিতে পেরেছে পাখি।

প্রভাতবেলার যে ঐশ্বর্য

          রাখে নি কণা,

এসেছিল সে যে, হারায় না কভু

          সে সান্ত্বনা।

সত্য যা পাই ক্ষণেকের তরে

          ক্ষণিক নহে।

সকালের পাখি বিকালের গানে

          এ আনন্দই বহে।

 

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version

Boikalbela phoshol-phurano
Shunyo khete
Boishakhe jobe kripon dhoroni
Royechhe tete,
Chhere tar bon jani ne kokhon
Ki bhul bhuli
Shushko dhulir dhushor doinye
Eshechhilo bulbuli.
Shokalbelar smritikhani mone
Bohiya bujhi
Torun diner bhora atithyo
Beralo khnnuji.
Orune shyamole ujjwol shei
Purnotare
Mithya bhabiya phire jabe she ki
Rater ondhokare.
Tobuo to gan kore gelo dan
Kichhu na peye.
Shongshoy-majhe ki shunaye gelo
Kahare cheye.
Jaha gechhe shore kono rup dho’re
Royechhe baki,
Ei shongbad bujhi mone mone
Janite perechhe pakhi.
Probhatbelar je oishworjo
Rakhe ni kona,
Eshechhilo she je, haray na kobhu
She shantwona.
Shotyo ja pai khoneker tore
Khonik nohe.
Shokaler pakhi bikaler gane

E anondoi bohe.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • রুক্ষ প্রকৃতিতে বুলবুলির আগমন:
“বৈকালবেলা ফসল-ফুরানো / শূন্য খেতে / বৈশাখে যবে কৃপণ ধরণী / রয়েছে তেতে… শুষ্ক ধূলির ধূসর দৈন্যে / এসেছিল বুল্‌বুলি।”
— বৈশাখের প্রচণ্ড গরমে যখন চারপাশ রুক্ষ এবং খেত ফসলশূন্য, ঠিক সেই ধূসর ও শুষ্ক পরিবেশের মাঝে একটি বুলবুলি পাখির আগমন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করে।
  • সকালের স্মৃতির খোঁজ ও প্রতিদানহীন দান:
“সকালবেলার স্মৃতিখানি মনে / বহিয়া বুঝি / তরুণ দিনের ভরা আতিথ্য / বেড়ালো খুঁজি… তবুও তো গান করে গেল দান / কিছু না পেয়ে।”
— পাখিটি হয়তো সকালবেলার সেই সতেজ ও সুন্দর প্রকৃতির স্মৃতি মনে করে এই তপ্ত বিকেলেও আতিথ্য খুঁজছে। চারপাশের রুক্ষতা তাকে নিরাশ করতে পারেনি, বরং কোনো প্রতিদান না পেয়েও সে তার গান বিলিয়ে গেছে।
  • ক্ষণিকের সত্য ও চিরন্তন আনন্দ:
“সত্য যা পাই ক্ষণেকের তরে / ক্ষণিক নহে। / সকালের পাখি বিকালের গানে / এ আনন্দই বহে।”
— এটিই কবিতার মূল দর্শন। জীবনে আমরা ক্ষণিকের জন্য যে সৌন্দর্য বা সত্যকে পাই, তা আসলে সাময়িক নয়, তার রেশ চিরকাল থেকে যায়। সকালবেলার স্নিগ্ধতা হারিয়ে গেলেও সেই স্মৃতি বুকে নিয়ে পাখিটি যেমন বিকেলে গান গায়, তেমনি মানুষের জীবনেও ক্ষণিকের আনন্দ এক চিরস্থায়ী সান্ত্বনা হয়ে থেকে যায়।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সানাই কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে যাচাই করে আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের ইংরেজি অংশ এবং ‘অস’ময়’ শব্দের অনাকাঙ্ক্ষিত অ্যাপোস্ট্রফি পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন