স্মরণ কাব্যগ্রন্থের ‘জাগো রে জাগো রে চিত্ত’ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত শোককাব্য ‘স্মরণ’-এর একটি ব্যতিক্রমী, গতিময়, সমুদ্র-অনুষঙ্গী ও অনন্ত যাত্রার লিরিক কবিতা হলো ‘জাগো রে জাগো রে চিত্ত’ (স্মরণ কাব্যের ২৭ সংখ্যক কবিতা)। কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর প্রয়াণে তৈরি হওয়া তীব্র ব্যক্তিগত শোক ও অশ্রুরাশিকে কবি নিষ্ক্রিয় আহাজারিতে আবদ্ধ রাখেননি; বরং সেই অশ্রুর মহাসমুদ্রে জোয়ার এনে তিনি চিত্তকে অন্ধ ধরণীর মোহবন্ধন ছিঁড়ে অজানার উদ্দেশে তরণী ভাসিয়ে দেওয়ার ডাক দিয়েছেন।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামজাগো রে জাগো রে চিত্ত (স্মরণ কাব্যের ২৭ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থস্মরণ (অনলাইন প্রতিলিপিতে উল্লিখিত ১৯৬১ সালটি রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের সংস্করণ নির্দেশ করে; মূল গ্রন্থ ১৯০৩ সালে প্রকাশিত)
রচনাকাল/প্রথম প্রকাশ১৩০৯ বঙ্গাব্দ (১৯০২-১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দ)
কবিতার আঙ্গিক ও ধরনশোকোত্তরণ ও গতিময় অধ্যাত্ম-যাত্রার লিরিক (Elegiac Transcendental Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে পত্নী মৃণালিনী দেবীর অকালমৃত্যুর পর রচিত ‘স্মরণ’ কাব্যের অধিকাংশ কবিতাই সনেটধর্মী ও স্তব্ধ স্মৃতিচারণায় নিমগ্ন হলেও, ‘জাগো রে জাগো রে চিত্ত’ কবিতাটিতে ফুটে উঠেছে এক বাঁধভাঙা গতিবেগ। কবি উপলব্ধি করেছেন, বিয়োগব্যথা কেবল এক কোণে বসে কাঁদার জন্য নয়। চোখের জল যখন উপচে পড়ে, তখন তা যেন এক কূলহীন অশ্রুর মহাসমুদ্র হয়ে ওঠে। সেই অশ্রু-সাগরের উত্তাল তরঙ্গে কবির জীবনতরী নাচতে শুরু করেছে। শোক এখানে অন্ধ জড়তায় কবিকে আটকে রাখে না, বরং এক মহামন্ত্রে দীক্ষিত করে অজানা পরলোকের পানে তরী ভাসানোর তাগিদ দেয়। অন্ধ ধরণীর নশ্বর সংসারকে আঁকড়ে না ধরে, বন্ধ তরী খুলে দিয়ে অনন্তলোকের স্বর্ণকূলের সন্ধানে পাড়ি জমানোই এই কবিতার মূল সুর।

সম্পূর্ণ কবিতা:

জাগো রে জাগো রে চিত্ত জাগো রে,
জোয়ার এসেছে অশ্রু-সাগরে।
কূল তার নাহি জানে,
বাঁধ আর নাহি মানে,
তাহারি গর্জনগানে জাগো রে।
তরী তোর নাচে অশ্রু-সাগরে।
আজি এ ঊষার পুণ্য লগনে
উঠেছে নবীন সূর্য গগনে।
দিশাহারা বাতাসেই
বাজে মহামন্ত্র সেই।
অজানা যাত্রার এই লগনে
দিক হতে দিগন্তের গগনে।
জানি না উদার শুভ্র আকাশে
কী জাগে অরুণদীপ্ত আভাসে।
জানি না কিসের লাগি
অতল উঠেছে জাগি,
বাহু তোলে কারে মাগি আকাশে–
পাগল কাহার দীপ্ত আভাসে।
শূন্য মরুময় সিন্ধু-বেলাতে
বন্যা মাতিয়াছে রুদ্র খেলাতে।
হেথায় জাগ্রত দিন
বিহঙ্গের গীতহীন,
শূন্য এ বালুকালীন বেলাতে,
এই ফেন তরঙ্গের খেলাতে।
দুলে রে দুলে রে অশ্রু দুলে রে
আঘাত করিয়া বক্ষ-কূলে রে।
সম্মুখে অনন্ত লোক,
যেতে হবে যেথা হোক–
অকূল আকুল শোক দুলে রে,
ধায় কোন্‌ দূর স্বর্ণ-কূলে রে।
আঁকড়ি থেকো না অন্ধ ধরণী,
খুলে দে খুলে দে বন্ধ তরণী।
অশান্ত পালের ‘পরে
বায়ু লাগে হাহা ক’রে
দূরে তোর থাক্‌ পড়ে ধরণী।
আর না রাখিস রুদ্ধ তরণী।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Jago re jago re chitto jago re,
Joyar eshechhe oshru-sagore.
Kul tar nahi jane,
Bandh ar nahi mane,
Tahari gorjongane jago re.
Tori tor nache oshru-sagore.
Aji e ushar punno logone
Uthechhe nobin shurjo gogone.
Dishahara batashei
Baje mohamontro shei.
Ojana jatrar ei logone
Dik hote digonter gogone.
Jani na udar shubhro akashe
Ki jage orundipto abhashe.
Jani na kisher lagi
Otol uthechhe jagi,
Bahu tole kare magi akashe–
Pagol kahar dipto abhashe.
Shunno morumoy shindhu-belate
Bonna matiyachhe rudro khelate.
Hethay jagroto din
Bihongger githin,
Shunno e balukalin belate,
Ei phen torongger khelate.
Dule re dule re oshru dule re
Aghat koriya bokkho-kule re.
Shommukhe ononto lok,
Jete hobe jetha hok–
Okul akul shok dule re,
Dhay kon dur sworno-kule re.
Ankori theko na ondho dhoroni,
Khule de khule de bondho toroni.
Oshanto paler ‘pore
Bayu lage haha ko’re
Dure tor thak pore dhoroni.
Ar na rakhish ruddho toroni.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • অশ্রু-সাগরের উত্তাল রূপ ও জাগরণ:
    “জাগো রে জাগো রে চিত্ত জাগো রে, / জোয়ার এসেছে অশ্রু-সাগরে। / কূল তার নাহি জানে, / বাঁধ আর নাহি মানে, / তাহারি গর্জনগানে জাগো রে।”
    — চোখের জলকে কবি কোনো দুর্বলতা ভাবেননি। শোকের তীব্রতা যখন সব বাঁধন ভেঙে সাগরের মতো গর্জন করে ওঠে, তখন চিত্তের মোহাচ্ছন্নতা ভেঙে পরম জাগরণ ঘটে। এই অশ্রু-সাগরের উত্তাল তরঙ্গে জীবনের তরী নতুন যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়।
  • অজানা যাত্রার পুণ্য লগন ও রুদ্র লীলা:
    “আজি এ ঊষার পুণ্য লগনে / উঠেছে নবীন সূর্য গগনে। / … শূন্য মরুময় সিন্ধু-বেলাতে / বন্যা মাতিয়াছে রুদ্র খেলাতে।”
    — নিরাশাময় রাতের অবসান ঘটিয়ে ঊষার আকাশে নবীন সূর্যের উদয় হয়েছে। বাতাসের হাহাকারে বাজছে অজানার পানে যাত্রার মহামন্ত্র। পাখির গানহীন শূন্য বালুকাবেলায় শোকের রুদ্র বন্যা সমস্ত স্থবিরতাকে চূর্ণ করে এগিয়ে চলে।
  • ধরণীর মোহমুক্তি ও অনন্তের পানে তরীভাসা:
    “আঁকড়ি থেকো না অন্ধ ধরণী, / খুলে দে খুলে দে বন্ধ তরণী। / অশান্ত পালের ‘পরে / বায়ু লাগে হাহা ক’রে / দূরে তোর থাক্‌ পড়ে ধরণী। / আর না রাখিস রুদ্ধ তরণী।”
    — কবিতার অন্তিমে ফুটে উঠেছে তীব্র বৈরাগ্য ও মুক্তির জয়গান। এই পার্থিব ধরণী অন্ধ ও সীমাবদ্ধ; তাকে আঁকড়ে ধরে থাকলে আত্মিক মুক্তি অসম্ভব। তাই কবি নিজের আত্মাকে নির্দেশ দিচ্ছেন সমস্ত রুদ্ধ দুয়ার খুলে দিতে। অশান্ত বাতাসে পাল তুলে দিয়ে অনন্তের স্বর্ণকূলের সন্ধানে পাড়ি জমানোই শোকোত্তরণের চরম পরিণতি।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দোময় পঙ্‌ক্তিমালা ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (স্মরণ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন