স্মরণ কাব্যগ্রন্থের ‘আজিকে তুমি ঘুমাও, আমি জাগিয়া রব দুয়ারে’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর শোকাবহ, অন্তিম নিবেদন ও প্রেমের লিরিক কবিতা হলো ‘আজিকে তুমি ঘুমাও, আমি জাগিয়া রব দুয়ারে’। এই কবিতায় প্রিয়জনের চিরবিদায় বা অন্তিম ঘুমের পর তার প্রতি অনন্ত জাগরণ, সেবা এবং স্মৃতির অমরত্ব রক্ষা করার এক পরাধীন ও করুণ রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামআজিকে তুমি ঘুমাও, আমি জাগিয়া রব দুয়ারে
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থস্মরণ
কবিতার ধরনশোকগাথা ও আত্মনিবেদিত লিরিক কবিতা (Elegy and Dedicated Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থটি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোক ও বেদনার পটভূমিতে রচিত। প্রিয়জনের প্রয়াণের পর কবির মন যে শূন্যতা ও আকুলতার মুখোমুখি হয়েছিল, তারই সুক্ষ্ম রূপায়ণ এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে দেখা যায়। ‘আজিকে তুমি ঘুমাও, আমি জাগিয়া রব দুয়ারে’ কবিতায় কবি মৃত বা ঘুমে আচ্ছন্ন প্রিয়জনের পাহারায় সারাজীবন জেগে থাকার এবং তার স্মরণে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করার এক অপূর্ব প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।

আজিকে তুমি ঘুমাও, আমি জাগিয়া রব দুয়ারে – সম্পূর্ণ কবিতা

আজি-কে তুমি ঘুমাও, আমি জাগিয়া রব দুয়ারে–
রাখিব জ্বালি আলো।
তুমি তো ভালো বেসেছ, আজি একাকী শুধু আমারে
বাসিতে হবে ভালো।
আমার লাগি তোমারে আর হবে না কভু সাজিতে,
তোমার লাগি আমি
এখন হতে হৃদয়খানি সাজায়ে ফুলরাজিতে
রাখিব দিনযামী।
তোমার বাহু কত-না দিন শ্রান্তি-দুখ ভুলিয়া
গিয়েছে সেবা করি,
আজিকে তারে সকল তার কর্ম হতে তুলিয়া
রাখিব শিরে ধরি।
এবার তুমি তোমার পূজা সাঙ্গ করি চলিলে
সঁপিয়া মনপ্রাণ,
এখন হতে আমার পূজা লহো গো আঁখিসলিলে–
আমার স্তবগান।

Romanized Version

Ajike tumi ghumao, ami jagiya rob duyare–
Rakhib jwali alo.
Tumi to bhalo besecho, aji ekaki shudhu amare
Basite hobe bhalo.
Amar lagi tomare ar hobe na kobu sajite,
Tomar lagi ami
Ekhon hote hridoykhani sajaye phulrajite
Rakhib dinjyami.
Tomar bahu koto-na din shranti-dukh bhuliya
giyeche sheba kori,
Ajike tare shokol tar kormo hote tuliya
rakhib shire dhori.
Ebar tumi tomar puja shango kori cholile
sonpiya mon-pran,
Ekhon hote amar puja laho go akhishlile–
amar stobogan.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • অনন্ত জাগরণ ও পাহারা:
“আজি-কে তুমি ঘুমাও, আমি জাগিয়া রব দুয়ারে– / রাখিব জ্বালি আলো।”
— প্রিয়জনের চিরনিদ্রার বিপরীতে কবি নিজে জাগরণের ব্রত নিয়েছেন। জীবনের সমস্ত অন্ধকারে প্রদীপ জ্বেলে সেই ঘুমন্ত প্রিয়জনকে পাহারা দেওয়ার এক আকুল ব্যাকুলতা এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
  • সেবা ও পূজার রূপান্তর:
“তোমার বাহু কত-না দিন শ্রান্তি-দুখ ভুলিয়া / গিয়েছে সেবা করি, / আজিকে তারে সকল তার কর্ম হতে তুলিয়া / রাখিব শিরে ধরি।”
— এতদিন যিনি সেবা করে গেছেন, আজ তাঁর বিশ্রামের পালা। আর কবি তাঁর সেই ক্লান্ত হাত ও স্মৃতিকে নিজের মাথায় তুলে নিয়ে আজীবন পূজা করে যাওয়ার পণ করেছেন। অশ্রুজল ও স্তবগানের মধ্য দিয়ে এই নিবেদন এক পরম আধ্যাত্মিক উচ্চতা লাভ করেছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (স্মরণ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন