স্মরণ কাব্যগ্রন্থের ‘ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যাম ধরা’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম মরমী ও গভীর শোকলগ্নের প্রেমের কবিতা হলো ‘ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যাম ধরা’। এই কবিতায় প্রিয়জনের প্রয়াণের পর তাঁর প্রকৃতিপ্রীতি, স্মৃতি এবং বেঁচে থাকা মানুষটির মনের ভেতর তাঁর অস্তিত্বের এক পরম ও আধ্যাত্মিক রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যাম ধরা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থস্মরণ
কবিতার ধরনশোকগাথা ও স্মৃতিকাতর লিরিক কবিতা (Elegy and Reflective Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থটি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোক ও বেদনার পটভূমিতে রচিত। প্রিয়জনের প্রয়াণের পর কবির মন যে শূন্যতা ও আকুলতার মুখোমুখি হয়েছিল, তারই সুক্ষ্ম রূপায়ণ এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে দেখা যায়। ‘ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যাম ধরা’ কবিতায় কবি অনুভব করেছেন যে প্রয়াণের পরেও প্রিয়জনের আত্মা যেন এই পৃথিবীর সবুজ প্রকৃতি, শীতের আলো ও চারপাশের নিসর্গের মাঝে এবং কবির নিজের চোখের দৃষ্টি ও প্রাণের মাঝে বেঁচে রয়েছে।

ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যাম ধরা – সম্পূর্ণ কবিতা

ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যাম ধরা,
তোমার হাসিটি ছিল বড়ো সুখে ভরা
মিলি নিখিলের স্রোতে
জেনেছিলে খুশি হতে,
হৃদয়টি ছিল তাই হৃদিপ্রাণহরা।
তোমার আপন ছিল এই শ্যাম ধরা।
আজি এ উদাস মাঠে আকাশ বাহিয়া
তোমার নয়ন যেন ফিরিছে চাহিয়া।
তোমার যে হাসিটুক,
সে চেয়ে-দেখার সুখ
সবারে পরশি চলে বিদায় গাহিয়া
এই তালবন গ্রাম প্রান্তর বাহিয়া।
তোমার সে ভালো-লাগা মোর চোখে আঁকি
আমার নয়নে তব দৃষ্টি গেছ রাখি।
আজি আমি একা-একা
দেখি দু-জনের দেখা–
তুমি করিতেছ ভোগ মোর মনে থাকি
আমার তারায় তব মুগ্ধ দৃষ্টি আঁকি।
এই-যে শীতের আলো শিহরিছে বনে,
শিরীষের পাতাগুলি ঝরিছে পবনে–
তোমার আমার মন
খেলিতেছে সারাক্ষণ
এই ছায়া-অলোকের আকুল কম্পনে
এই শীতমধ্যাহ্নের মর্মরিত বনে।
আমার জীবন তুমি বাঁচো, ওগো বাঁচো।
তোমার কামনা মোর চিত্ত দিয়ে যাচো–
যেন আমি বুঝি মনে
অতিশয় সংগোপনে
তুমি আজি মোর মাঝে আমি হয়ে আছ।
আমারি জীবনে তুমি বাঁচো, ওগো বাঁচো!

Romanized Version

Bhalo tumi besechhile ei shyam dhora,
Tomar hashiti chhilo boro sukhe vora
Mili nikhiler srote
Jenechhile khushi hote,
Hridoyti chhilo tai hridi-pranhara.
Tomar apon chhilo ei shyam dhora.
Aji e udash mathe akash bahiya
Tomar noyon jeno firiche chahiya.
Tomar je hashituk,
Se cheye-dekhar sukh
Sorbare porshi chole biday gahiya
Ei talbon gram prantor bahiya.
Tomar se bhalo-laga mor chokhe anki
Amar noyone tobo drishti gechho rakhi.
Aji ami eka-eka
Dekhi du-joner dekha–
Tumi koritecho bhog mor mone thaki
Amar taray tobo mugdho drishti anki.
Ei-je shiter alo shihriche bone,
Shirisher pataguli jhoriche pobone–
Tomar amar mon
Kheliteche sharakkhon
Ei chhaya-aloker akul kompone
Ei sheet-modhhyahner mormorito bone.
Amar jibon tumi bacho, ogo bacho.
Tomar kamona mor chitto diye jacho–
Jeno ami bujhi mone
Atishoy shongopone
Tumi aji mor majhe ami hoye achho.
Amari jibone tumi bacho, ogo bacho!

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • প্রকৃতির মাঝে প্রিয়জনের উপস্থিতি:
“ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যাম ধরা, / তোমার হাসিটি ছিল বড়ো সুখে ভরা…”
— পৃথিবী ও প্রকৃতির প্রতি মৃত প্রিয়জনের যে গভীর ভালোবাসা ছিল, কবি আজ তা নিখিলের স্রোতে ও চারপাশের নিসর্গে অনুভব করছেন।
  • চোখে ও প্রাণে সংযোগ:
“তোমার সে ভালো-লাগা মোর চোখে আঁকি / আমার নয়নে তব দৃষ্টি গেছ রাখি।”
— প্রিয়জন আজ শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি ও ভালোলাগা যেন কবির চোখের তারায় এবং হৃদয়ের গভীরে চিরকালের মতো অর্পিত হয়ে আছে।
  • জীবনের ভেতর পুনরুজ্জীবন:
“আমার জীবন তুমি বাঁচো, ওগো বাঁচো। / … তুমি আজি মোর মাঝে আমি হয়ে আছ।”
— কবিতার শেষাংশে কবি প্রিয়জনকে নিজের জীবনের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর কামনা ও সত্তা কবির চিত্তের সাথে একাত্ম হয়ে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক মিলন ঘটিয়েছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (স্মরণ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন