আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থের ‘ইঁটের গাদার নিচে’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অদ্ভুত ও শ্লেষাত্মক ছড়ার সংকলন ‘খাপছাড়া’-র একটি অত্যন্ত লঘু চালের, দৃশ্যপটনির্ভর ও রূঢ় বাস্তবতার ব্যঙ্গাত্মক কবিতা হলো ‘ইঁটের গাদার নিচে’। এই কবিতায় ধ্বংসস্তূপ বা ভগ্নদশায় পরিণত একটি পরিবেশের টুকরো টুকরো ছবি এবং তার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠা নিঃস্বতার এক কৌতুকপূর্ণ ও মর্মান্তিক রূপ অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামইঁটের গাদার নিচে (খাপছাড়া)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থখাপছাড়া
প্রকাশের বছর১৯৩৭ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনব্যঙ্গাত্মক ছড়া-কবিতা / দৃশ্যপটনির্ভর শ্লেষ (Satirical Limerick / Descriptive Wit)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৭ সালে প্রকাশিত ‘খাপছাড়া’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথ জীবনের নানা ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া তুচ্ছ বা অবহেলিত দৃশ্যগুলোকে ছন্দের জাদুতে জীবন্ত করে তুলেছেন। ‘ইঁটের গাদার নিচে’ কবিতায় কোনো এক ক্ষয়প্রাপ্ত বাড়ি বা জনপদের ধ্বংসাবশেষের কিছু অবশিষ্টাংশের কথা বলা হয়েছে—যেখানে ঘড়ি, দেওয়ালের কড়ি কাঠ থেকে শুরু করে ভাঙা হুঁকো কিংবা গলার দড়ি পর্যন্ত পড়ে আছে। এই অসংলগ্ন ও নিঃস্বতার খণ্ডচিত্রের মধ্য দিয়ে কবি জীবনের চরম রিক্ততাকেও অত্যন্ত অনায়াসে ফুটিয়ে তুলেছেন।

ইঁটের গাদার নিচে কবিতা (সম্পূর্ণ)

ইঁটের-গাদার নিচে
ফটকের ঘড়িটা।
ভাঙা দেয়ালের গায়ে
হেলে-পড়া কড়িটা।
পাঁচিলটা নেই, আছে
কিছু ইঁট সুরকি।
নেই দই সন্দেশ,
আছে খই মুড়কি।
ফাটা হুঁকো আছে হাতে,
গেছে গড়গড়িটা।
গলায় দেবার মতো
বাকি আছে দড়িটা।

ইঁটের গাদার নিচে কবিতার Romanized Version:

Inter-gadar niche
Photoker ghorita.
Bhanga deyaler gaye
Hhele-pora korita.
Pachilta nei, ache
Kichhu int shurki.
Nei doi shondesh,
Ache khoi murki.
Fata hunko ache hate,
Geche gordhorita.
Golay debar moto
Baki ache dorita.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

ধ্বংসস্তূপ ও ভগ্নদশার চিত্র:
“ইঁটের-গাদার নিচে / ফটকের ঘড়িটা। / ভাঙা দেয়ালের গায়ে / হেলে-পড়া কড়িটা।”
— একটা সময় যেখানে আভিজাত্য বা বসতি ছিল, আজ তার চিহ্ন বলতে কেবল ইঁটের গাদার নিচে চাপা পড়া ফটকের ঘড়ি আর ভাঙা দেওয়ালে হেলে থাকা কড়ি কাঠ। সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর পড়ে থাকা অবশেষের এই চিত্রটি বেশ প্রতীকী।
প্রাচুর্যের অভাব ও রিক্ততার বাস্তব ছবি:
“পাঁচিলটা নেই, আছে / কিছু ইঁট সুরকি। / নেই দই সন্দেশ, / আছে খই মুড়কি।”
— বড় বড় পাঁচিল কিংবা ভালো খাবার (দই-সন্দেশ) আজ আর নেই; কেবল ইঁট-সুরকি আর সাধারণ খই-মুড়কির মতো দরিদ্র সম্বলটুকুই অবশিষ্ট রয়েছে।
শেষ সম্বল ও শ্লেষাত্মক সমাপ্তি:
“ফাটা হুঁকো আছে হাতে, / গেছে গড়গড়িটা। / গলায় দেবার মতো / বাকি আছে দড়িটা।”
— শৌখিন গড়গড়ি হারিয়ে যাওয়ার পর হাতে কেবল একটা ফাটা হুঁকো অবশিষ্ট আছে। আর জীবনের এই চরম রিক্ততা ও হতাশার শেষ প্রান্তে এসে যেন পরিহাসের সুরে কবি বলেছেন—গলায় দেওয়ার মতো কেবল ওই দড়িটুকুই এখন বাকি রয়েছে!
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, প্রাবন্ধিক, চিত্রকর, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় পরিচিত।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়। তাঁর ৯৫টি ছোটগল্প *গল্পগুচ্ছ* এবং ১,৯১৫টি গান *গীতবিতান* সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলি ৩২ খণ্ডে *রবীন্দ্র রচনাবলী* নামে সংকলিত হয়েছে। তাঁর পত্রসাহিত্যও *চিঠিপত্র* নামে ১৯ খণ্ডে এবং চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি চিত্রকলাতেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন; তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে *গীতাঞ্জলি* কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

https://amarrabindranath.com/

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত