প্রেমের অমলিন মাধুর্য এবং বিশ্বপ্রকৃতির সাথে মানবহৃদয়ের মিলনের এক অনাবিল আনন্দোচ্ছ্বাস প্রকাশ পেয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেম পর্বের গান “এ কী সুধারস আনে”-তে। এখানে প্রেম কোনো আবদ্ধ স্থূল অনুভূতি নয়, বরং চিরন্তন অথচ নিত্যনতুন এক দিব্য অমৃতধারা—যা মন ও প্রাণকে অপার্থিব তৃপ্তিতে সিক্ত করে। বহুকাল স্তব্ধ থাকা পুরাতন বীণায় যেমন হারিয়ে যাওয়া সুর হঠাৎ নতুন করে জেগে ওঠে, তেমনি প্রিয়জনের অদৃশ্য স্পর্শে নীল আকাশ ও শ্যামল ধরণী এক পরম সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | এ কী সুধারস আনে |
| পর্যায় | প্রেম পর্যায় (গান সংখ্যা: ১১৮) |
| উপ-পর্যায় | প্রেম-বৈচিত্র্য |
| রাগ | বেহাগ-খাম্বাজ |
| তাল | কাহারবা (আট মাত্রা: ৪+৪) |
| রচনাকাল (বঙ্গাব্দ) | পৌষ, ১৩২৯ বঙ্গাব্দ |
| রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ) | ডিসেম্বর, ১৯২২ / জানুয়ারি, ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ |
| রচনাস্থান | শান্তিনিকেতন |
| স্বরলিপিকার | দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল উপজীব্য | প্রেমের অমিয় ধারা, চিরন্তনতার মাঝে নতুনত্ব, প্রকৃতির রূপান্তর ও সুপ্ত সুরের পুনর্জাগরণ |
এ কী সুধারস:
এ কী সুধারস আনে
আজি মম মনে প্রাণে॥
সে যে চিরদিবসেরই, নূতন তাহারে হেরি–
বাতাস সে মুখ ঘেরি মাতে গুঞ্জনগানে॥
পুরাতন বীণাখানি ফিরে পেল হারা বাণী।
নীলাকাশ শ্যামধরা পরশে তাহারি ভরা–
ধরা দিল অগোচরা নব নব সুরে তানে॥
এ কী সুধারস — Romanized Version
E ki sudharas ane
aji mom mone prane॥
Se je chiradiboser-i, nuton tahare heri—
batas se mukh gheri mate gunjon-gane॥
Puraton binakhani phire pel hara bani।
Nilakash shyamdhera poroshe tahari bhora—
dhora dil agochora nab nab sure tane॥
গানের মূল ভাব
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. অমৃতরস ও অন্তরের জাগরণ
- “এ কী সুধারস আনে আজি মম মনে প্রাণে…”গানটির শুরুতেই এক বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতাবোধ ফুটে ওঠে। জাগতিক ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে এই প্রেম আত্মাকে এক পরম তৃপ্তি ও স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে দেয়।
২. চিরন্তনের নবীন রূপ ও প্রকৃতির উল্লাস
- “সে যে চিরদিবসেরই, নূতন তাহারে হেরি / বাতাস সে মুখ ঘেরি মাতে গুঞ্জনগানে…”প্রেমের শাশ্বত রূপের প্রকাশ। মানুষ যাকে ভালোবাসে সে যুগ-যুগান্তরের চিরচেনা, তবু প্রেমের চোখ দিয়ে তাকে দেখলে মনে হয় এই প্রথম তার দেখা মিলল। প্রকৃতির বাতাসও যেন সেই মোহময় রূপের চারপাশ ঘিরে আনন্দের গুঞ্জন তোলে।
৩. পুরাতন বীণায় সুরের প্রত্যাবর্তন
- “পুরাতন বীণাখানি ফিরে পেল হারা বাণী…”হৃদয়কে কবি প্রায়শই বীণার সাথে তুলনা করেছেন। অনাদরে বা দীর্ঘ বিরহে যে হৃদয়যন্ত্র স্তব্ধ হয়ে বাণী হারিয়ে ফেলেছিল, প্রিয় স্পর্শের পরশে তা আবার নিজের অন্তর্নিহিত সুর ফিরে পায়।
৪. বিশ্বপ্রকৃতির সাথে একাত্মতা
- “নীলাকাশ শ্যামধরা পরশে তাহারি ভরা / ধরা দিল অগোচরা নব নব সুরে তানে…”ঊর্ধ্বের নীল আকাশ এবং নিম্নের সবুজ ধরণী—সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতি যেন প্রেমের এক অদৃশ্য পরশে স্পন্দিত। এতদিন যা অধরা ও অদৃশ্য ছিল, প্রেমের নতুন সুর ও তানের ভেতর দিয়ে তা আত্মপ্রকাশ করে।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- চিরন্তন বনাম নবীনতার চমৎকার দ্বৈততা: ‘চিরদিবসেরই’ এবং ‘নূতন তাহারে হেরি’—এই পরস্পরবিরোধী অনুভূতির মেলবন্ধন প্রেমের চিরন্তনতাকে নতুন মাত্রা দেয়।
- ইন্দ্রিয়ানুভূতির প্রাচুর্য: স্বাদ (সুধারস), স্পর্শ (পরশে ভরা), শ্রবণ (গুঞ্জনগান, বীণার বাণী) এবং দৃষ্টি (নীলাকাশ, শ্যামধরা)—এই বহুবিধ অনুভূতির অপূর্ব সমন্বয় গানটিতে ঘটেছে।
- ছন্দময় প্রবহমানতা: কাহারবা তালের চার-চার মাত্রার দোলায় রচিত পঙ্ক্তিগুলো নদীর তরঙ্গের মতো সহজে প্রবহমান।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- বেহাগ-খাম্বাজ রাগের মাধুর্য: গানটির সুর তৈরি হয়েছে বেহাগ ও খাম্বাজ রাগের মিশ্রণে। বেহাগের অন্তর্মুখী স্নিগ্ধতা এবং খাম্বাজের উচ্ছ্বল উজ্জ্বলতা গানটির স্থায়ী ও অন্তরার ভেতর আনন্দের এক অপূর্ব সুষম আবহ তৈরি করে।
- কাহারবা তালের সাবলীল লয়: আট মাত্রার কাহারবা তালের গতিশীল দোলা গানের ছন্দকে একটি সহজ ও সাবলীল নৃত্যময়তা দান করেছে।
- স্বরলিপির বিশুদ্ধতা: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগৃহীত স্বরলিপি অনুসারে সুরের তান ও স্বরের মীড়গুলো গানের ভাবকে প্রগাঢ় করে তোলে।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগে (পৌষ ১৩২৯) শান্তিনিকেতনের মুক্ত পরিবেশে কবি এই গানটি রচনা করেন। বিশ্বভারতীর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যস্ততার মধ্যেও প্রকৃতির সাথে আত্মার সংযোগের এই রূপ কবির গানে নিত্য প্রকাশিত হয়েছে।
- দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৮২–১৯৩৫): রবীন্দ্রনাথের গানের প্রধান সুর-সংরক্ষক ও স্বরভাণ্ডারী। তাঁর নিখুঁত স্বরলিপির মাধ্যমেই এই গানটির আদি সুরবিন্যাস অবিকৃতভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
- স্বরবিতান (পঞ্চচত্বারিংশ খণ্ড), বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
- রবীন্দ্রসংগীত কোষ, অনাদিকুমার দস্তিদার।











