আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

এ কী সুধারস , প্রেম পর্যায়, ১১৮ | রবীন্দ্রসঙ্গীত

Table of Content

প্রেমের অমলিন মাধুর্য এবং বিশ্বপ্রকৃতির সাথে মানবহৃদয়ের মিলনের এক অনাবিল আনন্দোচ্ছ্বাস প্রকাশ পেয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেম পর্বের গান “এ কী সুধারস আনে”-তে। এখানে প্রেম কোনো আবদ্ধ স্থূল অনুভূতি নয়, বরং চিরন্তন অথচ নিত্যনতুন এক দিব্য অমৃতধারা—যা মন ও প্রাণকে অপার্থিব তৃপ্তিতে সিক্ত করে। বহুকাল স্তব্ধ থাকা পুরাতন বীণায় যেমন হারিয়ে যাওয়া সুর হঠাৎ নতুন করে জেগে ওঠে, তেমনি প্রিয়জনের অদৃশ্য স্পর্শে নীল আকাশ ও শ্যামল ধরণী এক পরম সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
শিরোনামএ কী সুধারস আনে
পর্যায়প্রেম পর্যায় (গান সংখ্যা: ১১৮)
উপ-পর্যায়প্রেম-বৈচিত্র্য
রাগবেহাগ-খাম্বাজ
তালকাহারবা (আট মাত্রা: ৪+৪)
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ)পৌষ, ১৩২৯ বঙ্গাব্দ
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ)ডিসেম্বর, ১৯২২ / জানুয়ারি, ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ
রচনাস্থানশান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকারদিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল উপজীব্যপ্রেমের অমিয় ধারা, চিরন্তনতার মাঝে নতুনত্ব, প্রকৃতির রূপান্তর ও সুপ্ত সুরের পুনর্জাগরণ

এ কী সুধারস:

এ কী সুধারস আনে

আজি মম মনে প্রাণে॥

সে যে চিরদিবসেরই, নূতন তাহারে হেরি–

বাতাস সে মুখ ঘেরি মাতে গুঞ্জনগানে॥

পুরাতন বীণাখানি ফিরে পেল হারা বাণী।

নীলাকাশ শ্যামধরা পরশে তাহারি ভরা–

ধরা দিল অগোচরা নব নব সুরে তানে॥

এ কী সুধারস — Romanized Version

E ki sudharas ane
aji mom mone prane॥

Se je chiradiboser-i, nuton tahare heri—
batas se mukh gheri mate gunjon-gane॥

Puraton binakhani phire pel hara bani।
Nilakash shyamdhera poroshe tahari bhora—
dhora dil agochora nab nab sure tane॥

গানের মূল ভাব

“এ কী সুধারস আনে” গানটির মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসার সঞ্জীবনী শক্তি ও চিরন্তন সৌন্দর্যের চিরনবীন রূপ। রবীন্দ্র-দর্শনে প্রেম একই সাথে প্রাচীন এবং চিরনতুন। প্রিয় সত্তা মূলত আবহমান কালের এক চিরচেনা রূপ, কিন্তু ভালোবাসার স্পর্শে প্রতিবার দর্শনেই সে এক অভূতপূর্ব রূপে আবির্ভূত হয়।
গানটিতে প্রেমাস্পদকে প্রকৃতির মধ্য দিয়ে অনুভব করা হয়েছে। প্রেমিকমন যখন এই অমৃতরসের আস্বাদ পায়, তখন সমস্ত জড়তা কেটে যায়। হৃদয়ের বহুদিনের অব্যক্ত স্তব্ধতা ভেঙে জেগে ওঠে জীবনের আসল গান। আকাশ ও মাটির রূপময়তায় অগোচর সেই পরম সৌন্দর্য যেন দৃশ্যমান ও মূর্ত হয়ে ওঠে।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. অমৃতরস ও অন্তরের জাগরণ

  • “এ কী সুধারস আনে আজি মম মনে প্রাণে…”
    গানটির শুরুতেই এক বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতাবোধ ফুটে ওঠে। জাগতিক ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে এই প্রেম আত্মাকে এক পরম তৃপ্তি ও স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে দেয়।

২. চিরন্তনের নবীন রূপ ও প্রকৃতির উল্লাস

  • “সে যে চিরদিবসেরই, নূতন তাহারে হেরি / বাতাস সে মুখ ঘেরি মাতে গুঞ্জনগানে…”
    প্রেমের শাশ্বত রূপের প্রকাশ। মানুষ যাকে ভালোবাসে সে যুগ-যুগান্তরের চিরচেনা, তবু প্রেমের চোখ দিয়ে তাকে দেখলে মনে হয় এই প্রথম তার দেখা মিলল। প্রকৃতির বাতাসও যেন সেই মোহময় রূপের চারপাশ ঘিরে আনন্দের গুঞ্জন তোলে।

৩. পুরাতন বীণায় সুরের প্রত্যাবর্তন

  • “পুরাতন বীণাখানি ফিরে পেল হারা বাণী…”
    হৃদয়কে কবি প্রায়শই বীণার সাথে তুলনা করেছেন। অনাদরে বা দীর্ঘ বিরহে যে হৃদয়যন্ত্র স্তব্ধ হয়ে বাণী হারিয়ে ফেলেছিল, প্রিয় স্পর্শের পরশে তা আবার নিজের অন্তর্নিহিত সুর ফিরে পায়।

৪. বিশ্বপ্রকৃতির সাথে একাত্মতা

  • “নীলাকাশ শ্যামধরা পরশে তাহারি ভরা / ধরা দিল অগোচরা নব নব সুরে তানে…”
    ঊর্ধ্বের নীল আকাশ এবং নিম্নের সবুজ ধরণী—সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতি যেন প্রেমের এক অদৃশ্য পরশে স্পন্দিত। এতদিন যা অধরা ও অদৃশ্য ছিল, প্রেমের নতুন সুর ও তানের ভেতর দিয়ে তা আত্মপ্রকাশ করে।

বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন

গানটিতে প্রত্যক্ষভাবে মিলনের সুধারস মুখ্য হলেও, রবীন্দ্র-কাব্যের অন্তর্নিহিত স্তরে মিলনের উল্লাস জন্ম নেয় অতীতের দীর্ঘ নীরবতা ও বিরহের পটভূমি থেকে। ‘পুরাতন বীণা’র স্তব্ধ হয়ে থাকা এবং ‘হারা বাণী’র উল্লেখ স্মরণ করিয়ে দেয় যে অতীতে আশাহীন নয়নে অপেক্ষা করার এক ক্লান্তিকর অধ্যায় ছিল। সেই দীর্ঘ বিচ্ছেদের আঘাত ও রিক্ততাই বর্তমানের এই অমৃত আস্বাদনকে এত বেশি গভীর, তীব্র ও অর্থবহ করে তুলেছে।

সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য

  • চিরন্তন বনাম নবীনতার চমৎকার দ্বৈততা: ‘চিরদিবসেরই’ এবং ‘নূতন তাহারে হেরি’—এই পরস্পরবিরোধী অনুভূতির মেলবন্ধন প্রেমের চিরন্তনতাকে নতুন মাত্রা দেয়।
  • ইন্দ্রিয়ানুভূতির প্রাচুর্য: স্বাদ (সুধারস), স্পর্শ (পরশে ভরা), শ্রবণ (গুঞ্জনগান, বীণার বাণী) এবং দৃষ্টি (নীলাকাশ, শ্যামধরা)—এই বহুবিধ অনুভূতির অপূর্ব সমন্বয় গানটিতে ঘটেছে।
  • ছন্দময় প্রবহমানতা: কাহারবা তালের চার-চার মাত্রার দোলায় রচিত পঙ্‌ক্তিগুলো নদীর তরঙ্গের মতো সহজে প্রবহমান।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা

  • বেহাগ-খাম্বাজ রাগের মাধুর্য: গানটির সুর তৈরি হয়েছে বেহাগ ও খাম্বাজ রাগের মিশ্রণে। বেহাগের অন্তর্মুখী স্নিগ্ধতা এবং খাম্বাজের উচ্ছ্বল উজ্জ্বলতা গানটির স্থায়ী ও অন্তরার ভেতর আনন্দের এক অপূর্ব সুষম আবহ তৈরি করে।
  • কাহারবা তালের সাবলীল লয়: আট মাত্রার কাহারবা তালের গতিশীল দোলা গানের ছন্দকে একটি সহজ ও সাবলীল নৃত্যময়তা দান করেছে।
  • স্বরলিপির বিশুদ্ধতা: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগৃহীত স্বরলিপি অনুসারে সুরের তান ও স্বরের মীড়গুলো গানের ভাবকে প্রগাঢ় করে তোলে।

শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগে (পৌষ ১৩২৯) শান্তিনিকেতনের মুক্ত পরিবেশে কবি এই গানটি রচনা করেন। বিশ্বভারতীর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যস্ততার মধ্যেও প্রকৃতির সাথে আত্মার সংযোগের এই রূপ কবির গানে নিত্য প্রকাশিত হয়েছে।
  • দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৮২–১৯৩৫): রবীন্দ্রনাথের গানের প্রধান সুর-সংরক্ষক ও স্বরভাণ্ডারী। তাঁর নিখুঁত স্বরলিপির মাধ্যমেই এই গানটির আদি সুরবিন্যাস অবিকৃতভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে।

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

“এ কী সুধারস আনে” রবীন্দ্রসংগীতের এমন একটি সৃষ্টি যা মানুষের মনে জীবনের প্রতি গভীর আশাবাদ ও সৌন্দর্যানুভূতি জাগিয়ে তোলে। নিরাশা ও স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন করে বাঁচতে এবং ভালোবাসার আনন্দে জীবনকে উদ্ভাসিত করতে গানটি বিভিন্ন মার্জিত অনুষ্ঠানে পরম শ্রদ্ধার সাথে গীত হয়।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
  2. স্বরবিতান (পঞ্চচত্বারিংশ খণ্ড), বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
  3. রবীন্দ্রসংগীত কোষ, অনাদিকুমার দস্তিদার।

Share

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, প্রাবন্ধিক, চিত্রকর, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় পরিচিত।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়। তাঁর ৯৫টি ছোটগল্প *গল্পগুচ্ছ* এবং ১,৯১৫টি গান *গীতবিতান* সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলি ৩২ খণ্ডে *রবীন্দ্র রচনাবলী* নামে সংকলিত হয়েছে। তাঁর পত্রসাহিত্যও *চিঠিপত্র* নামে ১৯ খণ্ডে এবং চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি চিত্রকলাতেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন; তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে *গীতাঞ্জলি* কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

https://amarrabindranath.com/

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত