‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থের ‘মনে পড়া’ কবিতাটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অনবদ্য সৃষ্টি। মাতৃহীন এক শিশুর অবচেতন মনে তার মায়ের স্মৃতি কীভাবে প্রকৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অনুষঙ্গের মাঝে বেঁচে থাকে, তা এই কবিতায় অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। শিশুমনস্তত্ত্বের সাথে গভীর বেদনার এমন অপূর্ব মেলবন্ধন এই কবিতাকে অনন্য করে তুলেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | মনে পড়া |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শিশু ভোলানাথ |
| প্রকাশের বছর | ১৯২২ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | শিশুতোষ ও স্মৃতিচারণমূলক কবিতা |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থটি মূলত শিশুদের মনস্তত্ত্ব, খেলাধুলা ও কল্পনার জগৎকে কেন্দ্র করে রচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও শৈশবে তাঁর মাকে হারিয়েছিলেন। ‘মনে পড়া’ কবিতায় মাতৃহীন শিশুর সেই অস্পষ্ট স্মৃতিকাতরতা ও অবচেতন মনের অনুভূতির মাঝে কবির নিজের জীবনেরই এক প্রচ্ছন্ন প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। শিশুটি তার মাকে স্পষ্টভাবে মনে করতে না পারলেও, খেলার সুর, শিউলি ফুলের সুবাস এবং নীল আকাশের অসীম বিস্তৃতির মাঝে মায়ের স্নেহময় উপস্থিতি প্রতিনিয়ত অনুভব করে।
সম্পূর্ণ কবিতা:
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু কখন খেলতে গিয়ে
হঠাৎ অকারণে
একটা কী সুর গুনগুনিয়ে
কানে আমার বাজে,
মায়ের কথা মিলায় যেন
আমার খেলার মাঝে।
মা বুঝি গান গাইত, আমার
দোলনা ঠেলে ঠেলে;
মা গিয়েছে, যেতে যেতে
গানটি গেছে ফেলে।
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন আশ্বিনেতে
ভোরে শিউলিবনে
শিশির-ভেজা হাওয়া বেয়ে
ফুলের গন্ধ আসে,
তখন কেন মায়ের কথা
আমার মনে ভাসে?
কবে বুঝি আনত মা সেই
ফুলের সাজি বয়ে,
পুজোর গন্ধ আসে যে তাই
মায়ের গন্ধ হয়ে।
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন বসি গিয়ে
শোবার ঘরের কোণে;
জানলা থেকে তাকাই দূরে
নীল আকাশের দিকে
মনে হয়, মা আমার পানে
চাইছে অনিমিখে।
কোলের ‘পরে ধরে কবে
দেখত আমায় চেয়ে,
সেই চাউনি রেখে গেছে
সারা আকাশ ছেয়ে।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Make amar pore na mone.
Shudhu kokhon khelte giye
Hothat okarone
Ekta ki shur gunguniye
Kane amar baje,
Mayer kotha milay jeno
Amar khelar majhe.
Ma bujhi gan gaito, amar
Dolna thele thele;
Ma giyeche, jete jete
Ganti geche phele.
Make amar pore na mone.
Shudhu jokhon ashwinete
Bhore shiulibone
Shishir-bheja hawa beye
Phuler gondho ashe,
Tokhon keno mayer kotha
Amar mone bhashe?
Kobe bujhi anoto ma shei
Phuler shaji boye,
Pujor gondho ashe je tai
Mayer gondho hoye.
Make amar pore na mone.
Shudhu jokhon boshi giye
Shobar ghorer kone;
Janla theke takai dure
Nil akasher dike
Mone hoy, ma amar pane
Chaichhe onimikhe.
Koler ‘pore dhore kobe
Dekhto amay cheye,
Shei chauni rekhe geche
Shara akash chheye.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- খেলার সুরে মায়ের স্মৃতি:“মা বুঝি গান গাইত, আমার / দোলনা ঠেলে ঠেলে; / মা গিয়েছে, যেতে যেতে / গানটি গেছে ফেলে।”— শিশুটি তার মাকে স্পষ্ট মনে করতে পারে না, কিন্তু খেলার সময় আপন মনে গুনগুন করা সুরের মাঝে সে তার মায়ের দোলনা ঠেলে গাওয়া ঘুমপাড়ানি গানের আবেশ খুঁজে পায়। মায়ের ফেলে যাওয়া সুর যেন তার খেলার সঙ্গী।
- প্রকৃতির সুবাসে মায়ের উপস্থিতি:“পুজোর গন্ধ আসে যে তাই / মায়ের গন্ধ হয়ে।”— আশ্বিন মাসের শিশির ভেজা শিউলি ফুলের পবিত্র সুবাসে শিশুটির মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। তার মনে হয়, এই শরতের পূজার ফুলের সুবাস যেন তারই স্নেহময়ী মায়ের শরীরের চেনা গন্ধ।
- নীল আকাশে মায়ের স্নেহদৃষ্টি:“কোলের ‘পরে ধরে কবে / দেখত আমায় চেয়ে, / সেই চাউনি রেখে গেছে / সারা আকাশ ছেয়ে।”— বিশাল নীল আকাশের দিকে তাকালে শিশুর মনে হয়, তার মা যেন ঠিক আগের মতোই তাকে পরম মমতায় একদৃষ্টে দেখছে। মায়ের সেই স্নেহময় ও শান্ত দৃষ্টি যেন সারা আকাশ জুড়ে অনন্তকাল ধরে ছড়িয়ে আছে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।