Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | ভোরের আলো-আঁধারে (শেষ সপ্তক কাব্যের ১১ সংখ্যক কবিতা) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শেষ সপ্তক |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার আঙ্গিক ও ধরন | আধুনিক মুক্ত গদ্যকবিতা ও দৃশ্যচিত্রধর্মী অনুধ্যানমূলক রচনা (Free-verse Prose Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের ভোরের আলো-আঁধারে কবিতা সম্পূর্ণ কবিতা:
ভোরের আলো-আঁধারে
থেকে থেকে উঠছে কোকিলের ডাক
যেন ক্ষণে ক্ষণে শব্দের আতশবাজি।
ছেঁড়া মেঘ ছড়িয়েছে আকাশে
একটু একটু সোনার লিখন নিয়ে।
হাটের দিন,
মাঠের মাঝখানকার পথে
চলেছে গোরুর গাড়ি।
কলসীতে নতুন আখের গুড়, চালের বস্তা,
গ্রামের মেয়ে কাঁখের ঝুড়িতে নিয়েছে
কচুশাক, কাঁচা আম, শজনের ডাঁটা।
ছটা বাজল ইস্কুলের ঘড়িতে।
ঐ ঘণ্টার শব্দ আর সকাল বেলাকার কাঁচা রোদ্দুরের রঙ
মিলে গেছে আমার মনে।
আমার ছোটো বাগানের পাঁচিলের গায়ে
বসেছি চৌকি টেনে
করবীগাছের তলায়।
পুবদিক থেকে রোদ্দুরের ছটা
বাঁকা ছায়া হানছে ঘাসের ‘পরে।
বাতাসে অস্থির দোলা লেগেছে
পাশাপাশি দুটি নারকেলের শাখায়।
মনে হচ্ছে যমজ শিশুর কলরবের মতো।
কচি দাড়িম ধরেছে গাছে
চিকন সবুজের আড়ালে।
চৈত্রমাস ঠেকল এসে শেষ হপ্তায়।
আকাশে ভাসা বসন্তের নৌকোয়
পাল পড়েছে ঢিলে হয়ে।
দূর্বাঘাস উপবাসে শীর্ণ;
কাঁকর-ঢালা পথের ধারে
বিলিতি মৌসুমি চারায়
ফুলগুলি রঙ হারিয়ে সংকুচিত।
হাওয়া দিয়েছে পশ্চিম দিক থেকে,–
বিদেশী হাওয়া চৈত্রমাসের আঙিনাতে।
গায়ে দিতে হল আবরণ অনিচ্ছায়।
বাঁধানো জলকুণ্ডে জল উঠছে শিরশিরিয়ে,
টলমল করছে নালগাছের পাতা,
লাল মাছ কটা চঞ্চল হয়ে উঠল।
নেবুঘাস ঝাঁকড়া হয়ে উঠেছে
খেলা-পাহাড়ের গায়ে।
তার মধ্যে থেকে দেখা যায়
গেরুয়া পাথরের চতুর্মুখ মূর্তি।
সে আছে প্রবহমান কালের দূর তীরে
উদাসীন;
ঋতুর স্পর্শ লাগে না তার গায়ে।
শিল্পের ভাষা তার,
গাছপালার বাণীর সঙ্গে কোনো মিল নেই।
ধরণীর অন্তঃপুর থেকে যে শুশ্রূষা
দিনে রাতে সঞ্চারিত হচ্ছে
সমস্ত গাছের ডালে ডালে পাতায় পাতায়,
ঐ মূর্তি সেই বৃহৎ আত্মীয়তার বাইরে।
মানুষ আপন গূঢ় বাক্য অনেক কাল আগে
যক্ষের মৃত ধনের মতো
ওর মধ্যে রেখেছে নিরুদ্ধ ক’রে,
প্রকৃতির বাণীর সঙ্গে তার ব্যবহার বন্ধ।
সাতটা বাজল ঘড়িতে।
ছড়িয়ে-পড়া মেঘগুলি গেছে মিলিয়ে।
সূর্য উঠল প্রাচীরের উপরে,
ছোটো হয়ে গেল গাছের যত ছায়া।
খিড়কির দরজা দিয়ে
মেয়েটি ঢুকল বাগানে।
পিঠে দুলছে ঝালরওআলা বেণী,
হাতে কঞ্চির ছড়ি;
চরাতে এনেছে
একজোড়া রাজহাঁস,
আর তার ছোটো ছোটো ছানাগুলিকে।
হাঁস দুটো দাম্পত্য দায়িত্বের মর্যাদায় গম্ভীর,
সকলের চেয়ে গুরুতর ঐ মেয়েটির দায়িত্ব
জীবপ্রাণের দাবি স্পন্দমান
ছোট ঐ মাতৃমনের স্নেহরসে।
আজকের এই সকালটুকুকে
ইচ্ছে করেছি রেখে দিতে।
ও এসেছে অনায়াসে,
অনায়াসেই যাবে চলে।
যিনি দিলেন পাঠিয়ে
তিনি আগেই এর মূল্য দিয়েছেন শোধ ক’রে
আপন আনন্দ-ভাণ্ডার থেকে।
Bhorer alo-andhare kobitar Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- প্রাত্যহিকতার জীবন্ত রূপ ও ঋতুসন্ধি:“ভোরের আলো-আঁধারে / থেকে থেকে উঠছে কোকিলের ডাক / যেন ক্ষণে ক্ষণে শব্দের আতশবাজি। / … চৈত্রমাস ঠেকল এসে শেষ হপ্তায়। / আকাশে ভাসা বসন্তের নৌকোয় / পাল পড়েছে ঢিলে হয়ে।”— কোকিলের ডাককে শব্দের আতশবাজির সঙ্গে তুলনা করে কবি ভোরের সূচনা এঁকেছেন। একই সাথে চৈত্রান্তের আগমনে বসন্তের বিদায়লগ্নের রুক্ষতা—শুকনো বাতাস, রোদ ও ফুলের সংকুচিত রূপ—প্রকৃতির রূপান্তরের বাস্তব ছবি তুলে ধরে।
- শিল্প বনাম জীবন্ত প্রকৃতির বৈপরীত্য:“গেরুয়া পাথরের চতুর্মুখ মূর্তি। / সে আছে প্রবহমান কালের দূর তীরে / উদাসীন; / ঋতুর স্পর্শ লাগে না তার গায়ে। / শিল্পের ভাষা তার, / গাছপালার বাণীর সঙ্গে কোনো মিল নেই।”— পাথরের চতুর্মুখ ভাস্কর্যটি কালের ঊর্ধ্বে চিরস্থায়ী হলেও তা মৃত, স্থবির। প্রকৃতির শিরা-উপশিরায় যে প্রাণরস ও শুশ্রূষা প্রতিনিয়ত প্রবাহিত হচ্ছে, পাথরটি সেই সজীব আত্মীয়তার বাইরে। মানবনির্মিত শিল্প অনেক সময় প্রকৃতির অবারিত প্রাণধারার সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে একা হয়ে পড়ে।
- প্রাণের সহজ মাধুর্য ও অহৈতুকী আনন্দ:“জীবপ্রাণের দাবি স্পন্দমান / ছোট ঐ মাতৃমনের স্নেহরসে। / আজকের এই সকালটুকুকে / ইচ্ছে করেছি রেখে দিতে। / … যিনি দিলেন পাঠিয়ে / তিনি আগেই এর মূল্য দিয়েছেন শোধ ক’রে / আপন আনন্দ-ভাণ্ডার থেকে।”— হাঁসের ছানাদের পাহারা দেওয়া ছোট্ট মেয়েটির মাতৃস্নেহের মধ্য দিয়ে জীবনের সহজ ধারাটি সবচেয়ে গভীরভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। সকালের এই সুন্দর মুহূর্তগুলো কোনো বৈষয়িক লেনদেনের অধীন নয়; পরম স্রষ্টা তাঁর অসীম আনন্দের অংশ হিসেবে নিখরচায় এ উপহার মানুষকে দান করেছেন।
![শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের ভোরের আলো-আঁধারে কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 ভোরের আলো আঁধারে bhorer alo adhare [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভোরের-আলো-আঁধারে-bhorer-alo-adhare-কবিতা-.gif)