Table of Contents
শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের তখন বয়স ছিল কাঁচা কবিতা
শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের তখন বয়স ছিল কাঁচা কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | তখন বয়স ছিল কাঁচা (১০ সংখ্যক কবিতা) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শেষ সপ্তক |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধুনিক গদ্যকবিতা ও মনস্তাত্ত্বিক স্মৃতিচারণমূলক লিরিক (Prose Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের তখন বয়স ছিল কাঁচা সম্পূর্ণ কবিতা:
তখন বয়স ছিল কাঁচা;
কতদিন মনে মনে এঁকেছি নিজের ছবি,
বুনো ঘোড়ার পিঠে সওয়ার,
জিন নেই, লাগাম নেই,
ছুটেছি ডাকাত-হানা মাঠের মাঝখান দিয়ে
ভরসন্ধ্যেবেলায়;
ঘোড়ার খুরে উড়ছে ধুলো
ধরণী যেন পিছু ডাকছে আঁচল দুলিয়ে।
আকাশে সন্ধ্যার প্রথম তারা
দূরে মাঠের সীমানায় দেখা যায়
একটিমাত্র ব্যগ্র বিরহী আলো একটি কোন্ ঘরে
নিদ্রাহীন প্রতীক্ষায়।
যে ছিল ভাবীকালে
আগে হতে মনের মধ্যে
ফিরছিল তারি আবছায়া,
যেমন ভাবী আলোর আভাস আসে
ভোরের প্রথম কোকিল-ডাকা অন্ধকারে।
তখন অনেকখানি সংসার ছিল অজানা,
আধ্জানা।
তাই অপরূপের রাঙা রঙটা
মনের দিগন্ত রেখেছিলে রাঙিয়ে;
আসন্ন ভালোবাসা
এনেছিল অঘটন-ঘটনার স্বপ্ন।
তখন ভালোবাসার যে কল্পরূপ ছিল মনে
তার সঙ্গে মহাকাব্যযুগের
দুঃসাহসের আনন্দ ছিল মিলিত।
এখন অনেক খবর পেয়েছি জগতের,
মনে ঠাওরেছি
সংসারের অনেকটাই মার্কামারা খবরের
মালখানা।
মনের রসনা থেকে
অজানার স্বাদ গেছে মরে,
অনুভবে পাইনে
ভালোবাসায় সম্ভবের মধ্যে
নিয়তই অসম্ভব,
জানার মধ্যে অজানা,
কথার মধ্যে রূপকথা।
ভুলেছি প্রিয়ার মধ্যে আছে সেই নারী,
যে থাকে সাত সমুদ্রের পারে,
সেই নারী আছে বুঝি মায়ার ঘুমে,
যার জন্যে খুঁজতে হবে সোনার কাঠি।
শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের তখন বয়স ছিল কাঁচা সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- তারুণ্যের দুঃসাহসিক রূপকথা:“বুনো ঘোড়ার পিঠে সওয়ার, / জিন নেই, লাগাম নেই, / ছুটেছি ডাকাত-হানা মাঠের মাঝখান দিয়ে / ভরসন্ধ্যেবেলায়;”— কাঁচা বয়সের মন কোনো বাস্তব বাধা বা সামাজিক শৃঙ্খল মানে না। লাগামহীন ঘোড়ায় চড়ে বিপদসংকুল পথে ছুটে যাওয়া এবং দূর দিগন্তের বিরহী আলোর পানে অভিসার—তারুণ্যের প্রেমকে মহাকাব্যের রোমাঞ্চকর বীরত্বে ভূষিত করেছিল।
- অজানার সৌন্দর্য ও অঘটন-ঘটন ভাবনা:“তখন অনেকখানি সংসার ছিল অজানা, / আধ্জানা। / তাই অপরূপের রাঙা রঙটা / মনের দিগন্ত রেখেছিলে রাঙিয়ে;”— জীবনের সমস্ত তথ্য না জানার ফলেই তরুণ মন অজানার রঙে কল্পনার দিগন্ত রাঙিয়ে তুলতে পারে। সেই অপূর্ণ জানাই ছিল সকল অলৌকিক কল্পনা ও তীব্র অনুভূতির প্রধান উৎস।
- বাস্তবতার মালখানা ও রূপকথার অবলুপ্তি:“সংসারের অনেকটাই মার্কামারা খবরের / মালখানা। / … ভুলেছি প্রিয়ার মধ্যে আছে সেই নারী, / যে থাকে সাত সমুদ্রের পারে, / সেই নারী আছে বুঝি মায়ার ঘুমে, / যার জন্যে খুঁজতে হবে সোনার কাঠি।”— পরিপক্ক বয়সে এসে পার্থিব জগতের কার্যকারণ ও তথ্যের ভারে মন তার কল্পনাশূন্য রূপ ধারণ করে। প্রাত্যহিক চেনা প্রিয়ার মাঝে সাত সমুদ্র পারের মায়াময় রূপকথার রাজকন্যাকে খুঁজে পাওয়ার সেই দুর্লভ প্রেরণা আজ বাস্তবতার ভিড়ে বিস্মৃত।