বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পলাতকা’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর দার্শনিক ও মৃত্যুচেতনার কবিতা হলো ‘শেষ প্রতিষ্ঠা’। মানুষের দৃষ্টিতে আপাত-বিচ্ছেদ ও মৃত্যুর শোককে অতিক্রম করে ‘থাকা’ এবং ‘না-থাকা’র দ্বৈততার ওপারে এক অখণ্ড পূর্ণতায় বিলীন হওয়ার আর্তি এ কবিতায় অত্যন্ত সংহত ভাষায় রূপায়িত হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | শেষ প্রতিষ্ঠা |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পলাতকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৮ (১৩২৫ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক ও মৃত্যুচেতনার লিরিক কবিতা (Philosophical Lyric on Immortality) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯১৮ সালে প্রকাশিত ‘পলাতকা’ কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতা আখ্যানধর্মী হলেও ‘শেষ প্রতিষ্ঠা’ কবিতাটিতে ফুটে উঠেছে উপনিষদিক ভাবধারার এক শাশ্বত দর্শন। পার্থিব সংসারে কারও মৃত্যু ঘটলে লৌকিক দৃষ্টিতে আমরা বলি “গেছে চলে” বা “সে নাই”। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি অনুযায়ী, অস্তিত্বের এই বিনাশ বা অভাবের ধারণাটি মিথ্যা। মানুষের সীমাবদ্ধ ভাষায় যাওয়া ও আসার বিভাজন থাকে বলে তার প্রকাশ আধখানা সত্য বহন করে। কবি তাই তাঁর চৈতন্যকে সেই পরম সত্যের সমুদ্রে সমর্পণ করতে চান, যেখানে ভাব ও অভাব, জন্ম ও মৃত্যু, ‘আছে’ ও ‘নাই’ একাকার হয়ে চিরন্তন পূর্ণতায় প্রতিষ্ঠিত।
সম্পূর্ণ কবিতা:
এই কথা সদা শুনি, “গেছে চলে”, “গেছে চলে।”
তবু রাখি ব’লে
ব’লো না, “সে নাই।”
সে-কথাটা মিথ্যা, তাই
কিছুতেই সহে না যে,
মর্মে গিয়ে বাজে।
মানুষের কাছে
যাওয়া-আসা ভাগ হয়ে আছে।
তাই তার ভাষা
বহে শুধু আধখানা আশা।
আমি চাই সেইখানে মিলাইতে প্রাণ
যে-সমুদ্রে “আছে’ “নাই’ পূর্ণ হয়ে রয়েছে সমান।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Ei kotha shoda shuni, “Gechhe chole”, “Gechhe chole.”
Tobu rakhi bo’le
Bo’lo na, “She nai.”
She-kothata mithya, tai
Kichhutei shohe na je,
Morme giye baje.
Manusher kachhe
Jawa-asha bhag hoye achhe.
Tai tar bhasha
Bohe shudhu adhkhana asha.
Ami chai sheikhane milaite pran
Je-shomudre “achhe’ “nai’ purno hoye royechhe shoman.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- ‘নাই’-এর অস্বীকৃতি ও সত্যের সন্ধান:“এই কথা সদা শুনি, ‘গেছে চলে’, ‘গেছে চলে।’ / তবু রাখি ব’লে / ব’লো না, ‘সে নাই।’ / সে-কথাটা মিথ্যা, তাই / কিছুতেই সহে না যে, / মর্মে গিয়ে বাজে।”— প্রিয়জনের মহাপ্রয়াণে সংসার তাকে নিঃশেষ বলে ধরে নিলেও কবির অন্তরাত্মা তা অস্বীকার করে। চোখের দেখা থেকে আড়াল হওয়া মানেই পরম অস্তিত্ব থেকে মুছে যাওয়া নয়; তাই ‘সে নাই’ বলাটা কবির চৈতন্যে এক পরম অসত্য আঘাতের মতো বিঁধে থাকে।
- মানবভাষার সীমাবদ্ধতা ও আধখানা আশা:“মানুষের কাছে / যাওয়া-আসা ভাগ হয়ে আছে। / তাই তার ভাষা / বহে শুধু আধখানা আশা।”— মানুষ কাল ও স্থানের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বাঁধা বলে তার অভিজ্ঞতায় কেবল বিচ্ছেদ ও আগমন আলাদা হয়ে ধরা পড়ে। এই খণ্ডিত দৃষ্টির কারণে পার্থিব ভাষা কেবল অর্ধেক সত্য বা অপূর্ণ আশা প্রকাশ করতে পারে; অখণ্ড শাশ্বত সত্যকে ধারণ করতে পারে না।
- অদ্বৈত সমুদ্রে আত্মলীন হওয়া:“আমি চাই সেইখানে মিলাইতে প্রাণ / যে-সমুদ্রে ‘আছে’ ‘নাই’ পূর্ণ হয়ে রয়েছে সমান।”— কবিতার শেষ চরণে উপনিষদের পরম অদ্বৈত বোধ প্রস্ফুটিত হয়েছে। যেখানে সৃষ্টি ও লয়, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি, থাকা এবং না-থাকা আলাদা কোনো দ্বন্দ্ব নয়, বরং একই পরম চৈতন্যের অখণ্ড জোয়ার—কবি তাঁর আত্মাকে সেই মহাসমুদ্রে বিলীন করেই শাশ্বত জীবনের শেষ প্রতিষ্ঠা বা পরম আশ্রয় খুঁজে পেতে চান।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পলাতকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।


![পথহারা তুমি পথিক যেন গো [ প্রেম ৩৬২ ] Pothhara tumi pothik পথহারা তুমি পথিক , প্রেম ৩৬২ | Pothhara tumi pothik](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/11/পথহারা-তুমি-পথিক-1024x536.gif)


![শেষ গান shesh gan [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 2 শেষ গান shesh gan [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/শেষ-গান-shesh-gan-কবিতা--1024x536.gif)
![শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের ভোরের আলো-আঁধারে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভোরের আলো আঁধারে bhorer alo adhare [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভোরের-আলো-আঁধারে-bhorer-alo-adhare-কবিতা--1024x536.gif)
![তবু মনে রেখো – Tobu mone rekho [ রবীন্দ্রসঙ্গীত, প্রেম ১৫১ ] তবু মনে রেখো - Tobu mone rekho [ রবীন্দ্রসঙ্গীত, প্রেম ১৫১ ]](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/11/তবু-মনে-রেখো-1024x536.gif)
