মহুয়া কাব্যগ্রন্থের মহুয়া কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের নামকবিতা বা ভূমিকা-কবিতা হলো ‘মহুয়া’। ধ্রুপদী সাহিত্যের গতানুগতিক ফুলগুলির ক্লিশে বন্দনা পরিহার করে বুনো, অনাড়ম্বর ও স্বতঃস্ফূর্ত মহুয়া বৃক্ষের কাঠিন্য, পরোপকারী মহিমা এবং তার অন্তরে প্রচ্ছন্ন মদমত্ত যৌবনরসকে এ কবিতায় এক অনন্য রাজকীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামমহুয়া (নামকবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থমহুয়া
প্রকাশের বছর১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরননিসর্গপ্রধান রোমান্টিক লিরিক ও রূপকধর্মী কাব্যভাষ্য (Nature-Romantic Lyric / Titular Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৩৩৬ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থের আদি নাম ভাবা হয়েছিল ‘রক্তকরবী’ বা ‘নমিতা’, কিন্তু অবশেষে কবি সাঁওতাল পরগনার আদিম ও তেজস্বী প্রকৃতির প্রতীক ‘মহুয়া’ নামেই এর নামকরণ করেন। সংস্কৃত ও মধ্যযুগীয় কাব্যে কিংশুক, অশোক, বকুল বা মল্লিকার যে একঘেয়ে স্তুতি চলে আসছে, কবি তার ওপর প্রকাশ্য বিরক্তি প্রকাশ করেন। মহুয়া কোনো কৃত্রিম উদ্যানের বিলাস-পুষ্প নয়; সে রুক্ষ আরণ্যক বনস্পতির সমান মর্যাদায় উন্নতশির। কালবৈশাখীতে সে পাখিদের আশ্রয় দেয়, অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষের দিনে ফল-ফুলের অন্নে ক্ষুধার্তের প্রাণ বাঁচায়। আবার সেই কঠিন ও তপস্বী রূপের ভেতরেই সে ফাল্গুনে বহন করে আনে আদিম মাদকতা ও প্রাণের রক্তিম সুরা—যা বনবাসিনী নারীকে মাতায় পূর্ণিমার নৃত্যে। কাঠিন্য ও মাধুর্যের এই অপূর্ব মিলনের কারণেই কবি তাঁর ভবিষ্যতের বধূকে ভালোবেসে ডাকতে চান ‘মহুয়া’ নামে।

মহুয়া mahuya [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সম্পূর্ণ কবিতা:

বিরক্ত আমার মন কিংশুকের এত গর্ব দেখি।

          নাহি ঘুচিবে কি

অশোকের অতিখ্যাতি, বকুলের মুখর সম্মান।

          ক্লান্ত কি হবে না কবিগান

          মালতীর মল্লিকার

          অভ্যর্থনা রচি বারম্বার?

রে মহুয়া, নামখানি গ্রাম্য তোর, লঘু ধ্বনি তার,

          উচ্চশিরে তবু রাজকুলবনিতার

          গৌরব রাখিস ঊর্ধ্বে ধরে।

              আমি তো দেখেছি তোরে

          বনস্পতিগোষ্ঠী-মাঝে অরণ্যসভায়

              অকুণ্ঠিত মর্যাদায়

                   আছিস দাঁড়ায়ে;

              শাখা যত আকাশে বাড়ায়ে

শাল তাল সপ্তপর্ণ অশ্বত্থের সাথে

          প্রথম প্রভাতে

সূর্য-অভিনন্দনের তুলেছিস গম্ভীর বন্দন।

অপ্রসন্ন আকাশের ভ্রূভঙ্গে যখন

     অরণ্য উদ্‌বিগ্ন করি তোলে,

সেই কালবৈশাখীর ক্রুদ্ধ কলরোলে

          শাখাব্যূহে ঘিরে

আশ্বাস করিস দান শঙ্কিত বিহঙ্গ অতিথিরে।

     অনাবৃষ্টিক্লিষ্ট দিনে,

          বিশীর্ণ বিপিনে,

     বন্যবুভুক্ষুর দল ফেরে রিক্ত পথে,

দুর্ভিক্ষের ভিক্ষাঞ্জলি ভরে তারা তোর সদাব্রতে।

বহুদীর্ঘ সাধনায় সুদৃঢ় উন্নত

          তপস্বীর মতো

     বিলাসের চাঞ্চল্যবিহীন,

সুগম্ভীর সেই তোরে দেখিয়াছি অন্যদিন

          অন্তরে অধীরা

ফাল্গুনের ফুলদোলে কোথা হতে জোগাস মদিরা

          পুষ্পপুটে;

বনে বনে মৌমাছিরা চঞ্চলিয়া উঠে।

     তোর সুরাপাত্র হতে বন্যনারী

সম্বল সংগ্রহ করে পূর্ণিমার নৃত্যমত্ততারই।

          রে অটল, রে কঠিন,

     কেমনে গোপনে রাত্রিদিন

তরল যৌবনবহ্নি মজ্জায় রাখিয়াছিলি ভরে।

          কানে কানে কহি তোরে–

বধূরে যেদিন পাব, ডাকিব “মহুয়া’ নাম ধরে।

Amar Rabindranath Logo

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Birokto amar mon kingshuker eto gorbo dekhi.
Nahi ghuchibe ki
Oshoker otikhyati, bokuler mukhor shomman.
Klanto ki hobe na kobigan
Malotir mollikar
Obhhortthona rochi barombar?
Re mohuya, namkhani gramyo tor, loghu dhoni tar,
Uchchoshire tobu rajkulobonitar
Gowrob rakhish urdhwe dhore.
Ami to dekhechhi tore
Bonoshpotigoshthi-majhe oronnosobhay
Okunthito morjaday
Achhish danraye;
Shakha joto akashe baraye
Shal tal shoptoporno oshwotther shathe
Prothom probhate
Shurjo-obhinondoner tulechhish gombhir bondon.
Oproshonno akasher bhrubhongge jokhon
Oronyo udbigno kori tole,
Shei kalboishakhir kruddho kolorole
Shakhabjuhe ghire
Ashwash korish dan shonkito bihonggo otithire.
Onabrishtiklishto dine,
Bishirno bipine,
Bonyobubhukkhor dol phere rikto pothe,
Durbhikkher bhikkhanjoli bhore tara tor shodabrote.
Bohudirgho sadhonay shudridho unnoto
Toposhwir moto
Bilaser chanchollhobihin,
Shugombhir shei tore dekhiyachhi onyodin
Ontore odhira
Phalguner phuldole kotha hote jogash modira
Pushpopute;
Bone bone moumachhira choncholiya uthe.
Tor shurapatro hote bonyonari
Shombol shonggroho kore purnimar nrityomottotari.
Re otol, re kothin,
Kemone gopone ratridin
Torol joubonbohni mojjay rakhiyachhili bhore.
Kane kane kohi tore–
Bodhure jedin pabo, dakibo “Mohuya’ nam dhore.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • প্রচলিত সাহিত্যসংস্কারের প্রত্যাখ্যান:
    “বিরক্ত আমার মন কিংশুকের এত গর্ব দেখি। / নাহি ঘুচিবে কি / অশোকের অতিখ্যাতি, বকুলের মুখর সম্মান। / ক্লান্ত কি হবে না কবিগান / মালতীর মল্লিকার / অভ্যর্থনা রচি বারম্বার?”
    — বাংলা ও সংস্কৃত কাব্যে অশোক, কিংশুক ও মল্লিকার মতো ফুলগুলোর যে একাধিপত্য, কবি তা থেকে মুক্তি চেয়েছেন। অভিজাত প্রসাধনপ্রিয় ফুলের বিপরীতে বুনো মহুয়াকে সামনে এনে তিনি এক মৌলিক সৌন্দর্যচেতনার সূচনা করেন।
  • মহীরুহের আত্মমর্যাদা ও কল্যাণব্রত:
    “বনস্পতিগোষ্ঠী-মাঝে অরণ্যসভায় / অকুণ্ঠিত মর্যাদায় / আছিস দাঁড়ায়ে; / … দুর্ভিক্ষের ভিক্ষাঞ্জলি ভরে তারা তোর সদাব্রতে।”
    — মহুয়া কেবল ফুল নয়, সে শাল-তাল-অশ্বত্থের মতো বিশাল বনস্পতিদের সমান মর্যাদায় সূর্যের বন্দনা গায়। কালবৈশাখীর ঝড়ে পাখিদের বুকে আগলে রাখা এবং অনাবৃষ্টিতে দুর্ভিক্ষপীড়িত বনবাসীদের খাদ্য জুগিয়ে সে জীবনের অতন্দ্র আশ্রয়ে পরিণত হয়।
  • তপস্যার অন্তরালে যৌবনবহ্নি:
    “রে অটল, রে কঠিন, / কেমনে গোপনে রাত্রিদিন / তরল যৌবনবহ্নি মজ্জায় রাখিয়াছিলি ভরে। / কানে কানে কহি তোরে– / বধূরে যেদিন পাব, ডাকিব ‘মহুয়া’ নাম ধরে।”
    — বাইরে থেকে মহুয়া কঠোর ও অটল তপস্বীর মতো শান্ত হলেও ফাল্গুনে তার পুষ্পপুটে সঞ্চিত হয় তরল আগুনের মতো উন্মাদিনী সুরা, যা বন্য নারীর রক্তে নাচের নেশা জাগায়। নারীর আত্মমর্যাদাপূর্ণ সংযম এবং অন্তরের সুপ্ত প্রণয়োচ্ছ্বাসের এই সমন্বয়কেই কবি তাঁর প্রেমাস্পদের শ্রেষ্ঠ রূপ মনে করেন।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মহুয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন