বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেলজয়ী কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি-র একটি অত্যন্ত সুকোমল, মরমি ও পরলোকমুখী সুরের গান/লিরিক কবিতা হলো ‘ওরে মাঝি, ওরে আমার’ (গীতাঞ্জলির ৯২ সংখ্যক গান)। জীবনের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে পারাপারের কাণ্ডারিকে সম্বোধন করে অনন্তকালের ঘাটে তরণী ভেড়ানো এবং মর্ত্যজীবনের বাছাই করা অক্ষত স্মৃতি ও অর্ঘ্য সাজিয়ে পরপারের পরমেশ্বরের উদ্দেশে নিবেদনের এক শান্ত আকুলতা এ রচনায় ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | ওরে মাঝি, ওরে আমার (গীতাঞ্জলির ৯২ সংখ্যক রচনা) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | গীতাঞ্জলি (পরবর্তীতে ‘গীতবিতান’-এর পূজা পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত) |
| প্রকাশের বছর | ১৯১০ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ) |
| রাগ ও তাল | সুর: বাউল-ভাটিয়ালি অঙ্গ; তাল: দাদরা |
| কবিতার ধরন | আধ্যাত্মিক মরমী লিরিক ও জীবনসায়াহ্নের পারঘাট-সঙ্গীত (Mystical Devotional Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
ওরে মাঝি, ওরে আমার
মানবজন্মতরীর মাঝি,
শুনতে কি পাস দূরের থেকে
পারের বাঁশি উঠছে বাজি।
তরী কি তোর দিনের শেষে
ঠেকবে এবার ঘাটে এসে।
সেথায় সন্ধ্যা-অন্ধকারে
দেয় কি দেখা প্রদীপরাজি।
যেন আমার লাগছে মনে,
মন্দমধুর এই পবনে
সিন্ধুপারের হাসিটি কার
আঁধার বেয়ে আসছে আজি।
আসার বেলায় কুসুমগুলি
কিছু এনেছিলেম তুলি,
যেগুলি তার নবীন আছে
এইবেলা নে সাজিয়ে সাজি।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- জীবনের তরণী ও পরপারের বাঁশি:“ওরে মাঝি, ওরে আমার / মানবজন্মতরীর মাঝি, / শুনতে কি পাস দূরের থেকে / পারের বাঁশি উঠছে বাজি।”— মানবজীবন এক দীর্ঘ জলযাত্রা। কবি তাঁর অন্তরের চালিকাশক্তি মাঝিকে সতর্ক করে জিজ্ঞেস করছেন—ওপারের ডাক কি তার কানে পৌঁছেছে? এই বাঁশির সুর কোনো বিচ্ছেদের কান্না নয়, বরং পারাপারের এক প্রশান্ত ও আধ্যাত্মিক আহ্বান।
- সিন্ধুপারের আলো ও আশ্বাস:“সেথায় সন্ধ্যা-অন্ধকারে / দেয় কি দেখা প্রদীপরাজি। / যেন আমার লাগছে মনে, / মন্দমধুর এই পবনে / সিন্ধুপারের হাসিটি কার / আঁধার বেয়ে আসছে আজি।”— পার্থিব জীবনের সমাপ্তি কোনো নিরেট অন্ধকার নয়। সিন্ধুপারে প্রদীপ জ্বলছে এবং সেই দূরের তীর থেকে যেন পরম দেবতার করুণাময় হাসি মৃদু বাতাসের সাথে ভেসে আসছে। মৃত্যুভয় এখানে পরমেশ্বরের সাথে পুনর্মিলনের এক মধুর আশ্বাসে রূপান্তরিত হয়েছে।
- নবীন কুসুমের শেষ অঞ্জলি:“আসার বেলায় কুসুমগুলি / কিছু এনেছিলেম তুলি, / যেগুলি তার নবীন আছে / এইবেলা নে সাজিয়ে সাজি।”— জীবনের জন্মলগ্নে মানুষ নিষ্পাপ অনুভূতির অনেক কুসুম নিয়ে আসে; কিন্তু সংসারের ধূলিঝড়ে বহু ফুল ম্লান হয়ে যায়। কবি চান, তরী ঘাটে ভেড়ার আগেই অন্তরের যে কয়টি অনুভূতি এখনও নিষ্কলঙ্ক ও অমলিন রয়েছে, সেগুলোকে পূজার সাজিতে সাজিয়ে ওপারের দেবতার উদ্দেশে সমর্পণ করতে।