বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’র একটি অন্যতম প্রকৃতি-প্রেমমূলক ও শারদীয় লিরিক কবিতা হলো ‘আমার নয়ন ভুলানো এলে’। ১৯১০ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় কবি শরতের অপূর্ব স্নিগ্ধ ও মোহময়ী রূপের আগমনী বার্তা, শিউলি ফুলের সুবাস এবং প্রকৃতির মাঝে এক অতীন্দ্রিয় পরম সত্তার উপস্থিতির কথা অত্যন্ত সুমধুর সুরে ফুটিয়ে তুলেছেন।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | আমার নয়ন ভুলানো এলে |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | গীতাঞ্জলি |
| প্রকাশের বছর | ১৯১০ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | প্রকৃতি-প্রেমমূলক, শারদীয় ও ভক্তিমূলক লিরিক কবিতা (Nature, Autumnal and Devotional Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯১০ সালে প্রকাশিত ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রসাহিত্যের এক অমূল্য রত্ন। এই কাব্যগ্রন্থে প্রকৃতি ও পরম সত্তা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ‘আমার নয়ন ভুলানো এলে’ কবিতাটি মূলত শরতের আগমনী গান হিসেবে সুপরিচিত। শিউলিতলার পথে, শিশির ভেজা ঘাসে এবং আলো-ছায়ার খেলায় প্রকৃতির যে অপরূপ মোহময়ী রূপের প্রকাশ ঘটে, কবি তাকেই ‘নয়ন ভুলানো’ রূপ হিসেবে বর্ণনা করে গভীর ভক্তি ও মুগ্ধতার সাথে বরণ করে নিয়েছেন।
আমার নয়ন ভুলানো এলে – সম্পূর্ণ কবিতা
আমার নয়ন ভুলানো এলে।
আমি কী হেরিলাম হৃদয় মেলে।
শিউলিতলার পাশে পাশে
ঝরা ফুলের রাশে রাশে
শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে
অরুণ-রাঙা-চরণ ফেলে
নয়ন-ভুলানো এলে।
আলোছায়ার আঁচলখানি
লুটিয়ে পড়ে বনে বনে,
ফুলগুলি ওই মুখে চেয়ে
কী কথা কয় মনে মনে।
তোমায় মোরা করব বরণ,
মুখের ঢাকা করো হরণ,
ওই টুকু ওই মেঘাবরণ
দু হাত দিয়ে ফেলো ঠেলে।
নয়ন-ভুলানো এলে।
বনদেবীর দ্বারে দ্বারে
শুনি গভীর শঙ্খধ্বনি,
আকাশবীণার তারে তারে
জাগে তোমার আগমনী।
কোথায় সোনার নূপুর বাজে,
বুঝি আমার হিয়ার মাঝে,
সকল ভাবে সকল কাজে
পাষাণ-গালা সুধা ঢেলে–
নয়ন-ভুলানো এলে।
Romanized Version
Amar noyon bhulano ele.
Ami ki herilam hridoy mele.
Shiulitolar pashe pashe
Jhora phuler rashe rashe
Shishir-bheja ghashe ghashe
Orun-ranga-choron phele
Noyon-bhulano ele.
Alo-chhayar ancholkhani
Lutiye pore bone bone,
Phulguli oi mukhe cheye
Ki kotha koy mone mone.
Tomay mora korbo boron,
Mukher dhaka koro horon,
Oi tuku oi meghaboron
Du hat diye phelo thele.
Noyon-bhulano ele.
Bonodebir dware dware
Shuni gobhir shongkhodhoni,
Akashbinar tare tare
Jage tomar agomoni.
Kothay shonar nupur baje,
Bujhi amar hiyar majhe,
Shokol bhabe shokol kaje
Pashan-gala shudha dhele–
Noyon-bhulano ele.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- শরতের মোহময়ী আগমন:
“শিউলিতলার পাশে পাশে / ঝরা ফুলের রাশে রাশে / শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে / অরুণ-রাঙা-চরণ ফেলে / নয়ন-ভুলানো এলে।”— শরতের স্নিগ্ধ সকালে শিউলি ফুল, শিশির ভেজা ঘাস এবং ভোরের লালচে রৌদ্রের মাঝে প্রকৃতির এক অপরূপ, নয়ন-ভোলানো রূপের আগমন এখানে চিত্রিত হয়েছে।
- প্রকৃতির বরণ ও মেঘাবরণ হরণ:
“তোমায় মোরা করব বরণ, / মুখের ঢাকা করো হরণ, / ওই টুকু ওই মেঘাবরণ / দু হাত দিয়ে ফেলো ঠেলে।”— শরতের আকাশ মাঝে মাঝে খণ্ড মেঘে ঢাকা থাকে। কবি মেঘের সেই আবরণকে সরিয়ে প্রকৃতির সেই অনিন্দ্যসুন্দর রূপটিকে পূর্ণরূপে বরণ করে নেওয়ার আকুলতা প্রকাশ করেছেন।
- হৃদয়ে আগমনী ও সুধা বর্ষণ:
“কোথায় সোনার নূপুর বাজে, / বুঝি আমার হিয়ার মাঝে, / সকল ভাবে সকল কাজে / পাষাণ-গালা সুধা ঢেলে–“— শরতের এই আগমনী ধ্বনি কেবল বাইরের প্রকৃতিতে নয়, কবির অন্তরেও বেজে উঠেছে। পাষাণ-গলানো সুধা বা অমিয় ধারা ঢেলে দিয়ে এই রূপ কবির সমগ্র চেতনা ও প্রাত্যহিক কর্মকে পূর্ণ করে তুলেছে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।