পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের ‘উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য রচনার অন্ত্যপর্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিবাদী, মানবতাবাদী ও ঐতিহাসিক চেতনাসমৃদ্ধ সৃষ্টি হলো ‘উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে’ (যা সাধারণত ‘আফ্রিকা’ কবিতা নামেই সর্বাধিক পরিচিত)। ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত এই কবিতায় আফ্রিকার আদিম সৃষ্টিলগ্ন, ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের নিষ্ঠুর শোষণ, তথাকথিত সভ্যতার বর্বরতা এবং মানবতাবিরোধী অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক দীপ্তিময় প্রতিবাদ ও যুগান্তরের কবির অন্তিম ক্ষমা প্রার্থনার বাণী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামউদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে (আফ্রিকা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপত্রপুট
প্রকাশের বছর১৩৪৩ বঙ্গাব্দ / ১৯৩৬ খ্রীস্টাব্দ (পত্রপুট গ্রন্থাকারে; কবিতাটি রচিত: ২৮ মাঘ, ১৩৪৩)
কবিতার ধরনমানবতাবাদী, প্রতিবাদী ও ঐতিহাসিক লিরিক কবিতা (Humanistic and Anti-colonial Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থটি তাঁর কাব্যজীবনের অন্ত্যপর্বের একটি অনন্য রূপময় ও চিন্তনশীল সৃষ্টি। এসময়ের কবিতায় গদ্যছন্দের অবাধ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বিশ্বরাজনীতির সংকট, উপনিবেশবাদের নিষ্ঠুর রূপ এবং শোষিত মানুষের প্রতি কবির গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ পেয়েছে। ‘উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে’ কবিতায় কবি আফ্রিকার ওপর ইউরোপীয় শক্তিগুলোর ঔপনিবেশিক আগ্রাসন, দাস ব্যবসা এবং শেতাঙ্গদের বর্বরোচিত শোষণকে অত্যন্ত তীব্র ভাষায় ধিক্কার জানিয়েছেন। একই সাথে সভ্যতার অহংকার ও তার ভেতরের অমানুষিক রূপকে উন্মোচন করে কবি মানবতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে – সম্পূর্ণ কবিতা

উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে
স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে
নতুন সৃষ্টিকে বার-বার করছিলেন বিধ্বস্ত,
তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা-নাড়ার দিনে
রুদ্র সমুদ্রের বাহু
প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে, আফ্রিকা,
বাঁধলে তোমাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায়
কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে।
সেখানে নিভৃত অবকাশে তুমি
সংগ্রহ করছিলে দুর্গমের রহস্য,
চিনছিলে জলস্থল আকাশের দুর্বোধ সংকেত,
প্রকৃতির সৃষ্টি-অতীত জাদু
মন্ত্র জাগাচ্ছিল তোমার চেতনাতীত মনে।
বিদ্রূপ করছিলে ভীষণকে
বিরূপের ছদ্মবেশে,
শঙ্কাকে চাচ্ছিলে হার মানাতে
আপনাকে উগ্র ক’রে বিভীষিকার প্রচণ্ড মহিমায়
তাণ্ডবের দুন্দুভি নিনাদে।
হায় ছায়াবৃতা,
কালো ঘোমটার নিচে
অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ
উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে।
এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে
নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে,
এল মানুষ-ধরার দল,
গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।
সভ্যের বর্বর লোভ
নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।
তোমার ভাষাহীন ক্রন্দনে বাষ্পাকুল অরণ্যপথে
পঙ্কিল হোলো ধূলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে;
দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায়
বীভৎস কাদার পিণ্ড
চিরচিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে॥
সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই তাদের পাড়ায় পাড়ায়
মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘণ্টা
সকালে সন্ধ্যায়, দয়াময় দেবতার নামে;
শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে;
কবির সংগীতে বেজে উঠছিল
সুন্দরের আরাধনা।
আজ যখন পশ্চিম দিগন্তে
প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাবাতাসে রুদ্ধশ্বাস,
যখন গুপ্তগহ্বর থেকে পশুরা বেরিয়ে এল,
অশুভ ধ্বনিতে ঘোষণা করল দিনের অন্তিমকাল,
এসো যুগান্তরের কবি
আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে
দাঁড়াও ঐ মান-হারা মানবীর দ্বারে,
বলো, ক্ষমা করো,—
হিংস্র প্রলাপের মধ্যে
সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।

Romanized Version

Udbhranto shei adim juge
Sroshta jokhon nijer proti osontoshe
Noton srishtike bar-bar korchhilen dhongsho,
Tar shei odhordhoye ghono-ghono matha-narar dine
Rudro shomudrer bahu
Prachi dhoritrir buker theke
Chhiniye niye gelo tomake, Afrika,
Bandhle tomake bonospotir nibiro paharay
Kripon alor ontopure.
Sekhane nihvrito obokashe tumi
Songroho chhilen durgomer rohosyo,
Chinchhile jol-sthol akasher durbodh shongket,
Prokritir srishti-atito jadu
Montro jagachchhelo tomar chetonatito mone.
Bidrup korchhile bhishonke
Biruper chhadmobeshe,
Shonkake chachchhile har manate
Apanake ugra kore vibhishikar prochondo mohimay
Tandober dunduvi ninade.
Haye chhayabruta,
Kalo ghomatar niche
Oporichito chhilo tomar manborup
Upekhar abil drishtite.
Elo ora lohar hathkori niye
Nokh jader tikshno tomar nekoder cheye,
Elo manush-dharar dol,
Gorbe jara ondho tomar shurjohara oronyer cheye.
Shobhyer borbor lobh
Nogno korlo apon nirlajjo anushota.
Tomar bhashahin krondone bashpakul oronyopothe
Ponkil holo dhuli tomar rokte oshrutite mishe;
Doshsyu-payer kanta-mara jutotor tolay
Bivotsho kadar pindo
Chirochihno diye gelo tomar opomanito itihashe॥
Shomudra-pare shei muhurtei tader paray paray
Mondire bajchhilo pugar ghonta
Sokale shondhyay, doyomoy debatar name;
Shishura khelechhilo mayer kole;
Kobir shongite beje uthchhilo
Shundorer aradhona.
Aji jokhon pashchim digonte
Prodoshrkal jhonjhabatase ruddho-shash,
Jokhon guptogohbor theke poshura beriye elo,
Oshubh dhonite ghoshona korlo diner ontimkal,
Esho jugantorer kobi
Ashonno shondhyar shesh roshmipate
Danrao oi man-hara manabir dware,
Bolo, khoma koro,—
Hingsro prolaper modhye

Sei hok tomar shobhyatar shesh punyobani.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • আফ্রিকার সৃষ্টি ও দুর্গম রহস্য:

“উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে / স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে / নতুন সৃষ্টিকে বার-বার করছিলেন বিধ্বস্ত…”

— স্রষ্টার আদিম অসন্তোষ ও রুদ্র সমুদ্রের পটভূমিতে আফ্রিকার সৃষ্টি এবং দুর্গম অরণ্যের অন্তপুরে তার আত্মগোপন ও প্রকৃতির রহস্যময় জাদুর রূপায়ণ দিয়ে কবিতার সূচনা।

  • সভ্যতার বর্বর লোভ ও শোষণ:

“এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে / নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে, / এল মানুষ-ধরার দল…”

— ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীরা সভ্যতার মুখোশ পরে আফ্রিকার নিরীহ মানুষের ওপর যে পৈশাচিক অত্যাচার, রক্তপাত ও দাস ব্যবসা চালিয়েছিল, তার এক মর্মান্তিক ও বাস্তব চিত্র এখানে অঙ্কিত হয়েছে।

  • ইউরোপের দ্বিচারিতা ও কবির ক্ষমা প্রার্থনা:

“সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই তাদের পাড়ায় পাড়ায় / মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘণ্টা… / এসো যুগান্তরের কবি / দাঁড়াও ঐ মান-হারা মানবীর দ্বারে, / বলো, ক্ষমা করো…”

— একদিকে ইউরোপে ধর্মের নামে পূজার ঘণ্টা এবং অন্যদিকে আফ্রিকার বুকে মানবতা ধ্বংসের উল্লাস—এই চরম দ্বিচারিতা তুলে ধরে কবি আধুনিক সভ্যতার পতনলগ্নে ‘যুগান্তরের কবি’-কে আফ্রিকার মানহারা মানবীর দ্বারে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পত্রপুট কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন