পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের ‘যুদ্ধের দামামা উঠল বেজে’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য রচনার অন্ত্যপর্বের একটি অন্যতম শক্তিশালী, যুদ্ধবিরোধী ও তীক্ষ্ণ সমাজচেতনামূলক সৃষ্টি হলো ‘যুদ্ধের দামামা উঠল বেজে’। ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত এই কবিতায় যুদ্ধের উন্মাদনা, ধর্মের আড়ালে চলা ভণ্ডামি এবং ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার পৈশাচিক রূপকে অত্যন্ত নিপুণ ও ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামযুদ্ধের দামামা উঠল বেজে
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপত্রপুট
প্রকাশের বছর১৩৪৩ বঙ্গাব্দ / ১৯৩৬ খ্রীস্টাব্দ (পত্রপুট গ্রন্থাকারে)
কবিতার ধরনযুদ্ধবিরোধী ও বক্রোক্তিভিত্তিক লিরিক কবিতা (Anti-war and Satirical Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থটি তাঁর অন্ত্যপর্বের একটি অনন্য বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি, যেখানে গদ্যছন্দের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতার সংকট ও বিশ্বরাজনীতির রূপ প্রতিফলিত হয়েছে। ‘যুদ্ধের দামামা উঠল বেজে’ কবিতায় কবি বিশ্বযুদ্ধের উন্মাদনা এবং মানুষের ভেতরকার হিংস্রতার নির্মম চিত্র এঁকেছেন। মানুষ যখন একে অপরকে হত্যা করতে এবং ধ্বংসলীলা চালাতে বের হয়, তখন তারা অহিংসার প্রতীক বুদ্ধদেবের মন্দিরে আশীর্বাদ চাইতে যায়—এই দ্বিচারিতা ও ভণ্ডামিকে কবি পরম খোঁচায় উন্মোচন করেছেন।

যুদ্ধের দামামা উঠল বেজে – সম্পূর্ণ কবিতা

যুদ্ধের দামামা উঠল বেজে।
ওদের ঘাড় হোলো বাঁকা, চোখ হোলো রাঙা,
কিড়মিড় করতে লাগল দাঁত।
মানুষের কাঁচা মাংসে যমের ভোজ ভরতি করতে
বেরোল দলে দলে।
সবার আগে চলল দয়াময় বুদ্ধের মন্দিরে
তাঁর পবিত্র আশীর্বাদের আশায়।
বেজে উঠল তুরী ভেরী গরগর শব্দে,
কেঁপে উঠল পৃথিবী।
ধূপ জ্বলল, ঘণ্টা বাজল, প্রার্থনার রব উঠল আকাশে,
করুণাময়, সফল হয় যেন কামনা—
কেননা ওরা যে জাগাবে মর্মভেদী আর্তনাদ
অভ্রভেদ ক’রে,
ছিঁড়ে ফেলবে ঘরে ঘরে ভালবাসার বাঁধনসূত্র,
ধ্বজা তুলবে লুপ্তপল্লীর ভস্মস্তূপে,
দেবে ধুলোয় লুটিয়ে বিদ্যানিকেতন,
দেবে চুরমার ক’রে সুন্দরের আসনপীঠ।
তাইতে চলেছে ওরা দয়াময় বুদ্ধের নিতে আশীর্বাদ।
বেজে উঠল তুরী ভেরী গরগর শব্দে,
কেঁপে উঠল পৃথিবী।
ওরা হিসাব রাখবে ম’রে পড়ل [পড়ল] কত মানুষ,
পঙ্গু হয়ে গেল কয়জনা।
তারি হাজার সংখ্যার তালে তালে
ঘা মারবে জয়ডঙ্কায়।
পিশাচের অট্টহাসি জাগিয়ে তুলবে
শিশু আর নারীদেহের ছেঁড়া টুকরোর ছড়াছড়িতে।
ওদের এই মাত্র নিবেদন, যেন বিশ্বজনের কানে পারে
মিথ্যামন্ত্র দিতে,
যেন বিষ পারে মিশিয়ে দিতে নিঃশ্বাসে।
সেই আশায় চলেছে ওরা দয়াময় বুদ্ধের মন্দিরে
নিতে তাঁর প্রসন্ন মুখের আশীর্বাদ।
বেজে উঠছে তূরী ভেরী গরগর শব্দে,
কেঁপে উঠছে পৃথিবী॥
শান্তিনিকেতন পৌষ, ১৩৪৪

Romanized Version

Yuddher damama utlo beje.
Oder ghaar holo bānka, chokh holo rānka,
Kirmir korte laglo dānt.
Manuser kāncha māngse jomer bhoj bhorti korte
Berolo dole dole.
Sobar age chollo doyomoy buddher mondire
Tār pobitro ashirbader āshay.
Beje uthlo turi bheri gorgor shobde,
Kẽpe uthlo prithibi.
Dhup jwollo, ghontā bajlo, prarthanar rob uthlo akashe,
Korunamoy, sofol hoy jeno kamonā—
Keno-na ora je jagabe mormobhedi artonād
Obhrobhed kore,
Chhĩre felbe ghore ghore bhalobasar bandhosutro,
Dhwojā tulbe lupto-pollir bhasmastupe,
Debe dhuloy lutiye bidyaniketon,
Debe churmar kore sundorer asonpith.
Taite choleche ora doyomoy buddher nite ashirbād.
Beje uthlo turi bheri gorgor shobde,
Kẽpe uthlo prithibi.
Ora hisāb rakhbe more porlo koto manush,
Pongu hoye gelo koyjonā.
Tari hājār shongkhār tale tale
Ghā marbe joydonkay.
Pishacher ottohasi jagiye tulbe
Shishu ar narideher chhẽrā tukror chhorachhorite.
Oder ei matro nibedon, jeno bishwojoner kane pare
Mithyamantro dite,
Jeno bish pare mishiye dite nihshwase.
Sei ashay choleche ora doyomoy buddher mondire
Nite tār prosanno mukher ashirbād.
Beje uthchhe turi bheri gorgor shobde,
Kẽpe uthchhe prithibi.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও যুদ্ধের প্রস্তুতি:
“সবার আগে চলল দয়াময় বুদ্ধের মন্দিরে / তাঁর পবিত্র আশীর্বাদের আশায়।”

— হিংসা ও ধ্বংসের পথে নামার আগে অহিংসার মূর্ত প্রতীক বুদ্ধদেবের আশীর্বাদ চাইতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে কবি মানবসভ্যতার এক চরম কপটতা ও হিপোক্রসিকে তুলে ধরেছেন।

  • যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ও পৈশাচিক উল্লাস:

“ওরা হিসাব রাখবে ম’রে পড়ল কত মানুষ, / পঙ্গু হয়ে গেল কয়জনা। / তারি হাজার সংখ্যার তালে তালে / ঘা মারবে জয়ডঙ্কায়।”

— মানুষের জীবন ও মৃত্যুকে নিছক সংখ্যার হিসেবে মাপা এবং শিশু-নারীর রক্তপাতের ওপর দাঁড়িয়ে বিজয়ের উল্লাস করার নিষ্ঠুর মানসিকতাকে এখানে তীব্রভাবে আক্রমণ করা হয়েছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পত্রপুট কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন