বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শোককাব্য ‘স্মরণ’-এর একটি পরম আধ্যাত্মিক রূপান্তর, অন্তর্জীবন শোধন ও শুভ মিলনের চতুর্দশপদী (সনেটধর্মী) কবিতা হলো ‘সংসার সাজায়ে তুমি আছিলে রমণী’। কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর পর কবি তাঁর ফেলে যাওয়া পার্থিব গৃহিণী রূপটিকে অতিক্রম করে অন্তরের আধ্যাত্মিক পূজারিণী হিসেবে আহ্বান জানিয়েছেন—যাতে তিনি কবির সমগ্র জীবনকে সমস্ত তুচ্ছতা ও মলিনতা থেকে মুক্ত করে এক পবিত্র দেবমন্দিরে রূপায়িত করেন।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | সংসার সাজায়ে তুমি আছিলে রমণী (স্মরণ কাব্যের অন্তর্গত) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | স্মরণ (অনলাইন প্রতিলিপিতে উল্লিখিত ১৯৬১ সালটি রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের সংস্করণ নির্দেশ করে; মূল প্রকাশ ১৯০৩ সালে) |
| রচনাকাল/প্রথম প্রকাশ | ১৩০৯ বঙ্গাব্দ (১৯০২-১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দ) |
| কবিতার আঙ্গিক ও ধরন | চতুর্দশপদী সনেটধর্মী শোক-লিরিক ও আত্মশুদ্ধির সাধনাগাথা (Spiritual Elegiac Sonnet) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯০২ সালে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর প্রয়াণের পর রচিত ‘স্মরণ’ কাব্যে কবি কেবল বিচ্ছেদের আহাজারি করেননি, বরং সেই বিচ্ছেদকে অন্তর্জীবনের এক মহত্তর সাধনায় রূপান্তরিত করেছেন। জীবিতাবস্থায় কবিপত্নী ছিলেন গৃহের লক্ষ্মী; নিপুণ হাতে তিনি চারপাশের বাস্তব সংসার সাজিয়ে রাখতেন। মৃত্যুর পর কবি তাঁকে অনুরোধ করছেন—পার্থিব গৃহের মতোই তিনি যেন এবার কবির অন্তর্লোককে সাজিয়ে তোলেন। দীর্ঘদিনের আলস্য, অবহেলা ও প্রাত্যহিক জীবনের যত ক্ষুদ্রতা, আবর্জনা ও পাপ-কলঙ্ক জমেছে, প্রিয়তমা যেন তাঁর পবিত্র পরশে তা ধুয়ে মুছে সাফ করে দেন। অন্তরের যে নিভৃত পূজামন্দির রয়েছে, সেখানে মঙ্গলঘট ও তীর্থজলে শুভ অভিষেক ঘটিয়ে, নিজের হাতে তোলা পদ্ম দিয়ে পূজা সাজিয়ে তিনি যেন কবির পাশে আসন গ্রহণ করেন। এতে করে তাঁদের মিলন আর কোনো নশ্বর মর্ত্য-মিলন থাকবে না, তা হবে দেবতার চরণে একাসনে বসার চিরন্তন আত্মিক সম্মিলন।
সম্পূর্ণ কবিতা:
সংসার সাজায়ে তুমি আছিলে রমণী,
আমার জীবন আজি সাজাও তেমনি
নির্মল সুন্দর করে। ফেলি দাও বাছি
যেথা আছে যত ক্ষুদ্র তৃণকুটাগাছি–
অনেক আলস্যক্লান্ত দিনরজনীর
উপেক্ষিত ছিন্নখণ্ড যত। আনো নীর,
সকল কলঙ্ক আজি করো গো মার্জনা,
বাহিরে ফেলিয়া দাও যত আবর্জনা।
যেথা মোর পূজাগৃহ নিভৃত মন্দিরে
সেথায় নীরবে এসো দ্বার খুলি ধীরে–
মঙ্গলকনকঘটে পুণ্যতীর্থজল
সযত্নে ভরিয়া রাখো, পূজাশতদল
স্বহস্তে তুলিয়া আনো। সেথা দুইজনে
দেবতার সম্মুখেতে বসি একাসনে।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Shongshar sajaye tumi achhile romoni,
Amar jibon aji sajao temoni
Nirmol shundor kore. Pheli dao bachhi
Jetha achhe joto khudro trinokutagachhi–
Onek alosshoklanto dinrojonir
Upekkhito chhinnokhondo joto. Ano nir,
Shokol kolonko aji koro go marjona,
Bahire pheliya dao joto aborjona.
Jetha mor pujagriho nibhrito mondire
Sethay nirobe esho dwar khuli dhire–
Monggolokonokoghote punnotirtthojol
Shojotne bhoriya rakho, pujashotodol
Shwohoste tuliya ano. Setha duijone
Debotar shommukhete bosi ekashone.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- গৃহিণী থেকে অন্তর্লোকের সংস্কারক:“সংসার সাজায়ে তুমি আছিলে রমণী, / আমার জীবন আজি সাজাও তেমনি / নির্মল সুন্দর করে।”— জীবিতাবস্থায় গৃহের ধূলিমলিনতা দূর করে সংসারকে পরিপাটি ও সুন্দর রাখাই ছিল রমণীর স্বভাব। মৃত্যুর পর তাঁর সেই শুচিশুভ্র কল্যাণময়ী রূপকে কবি আহ্বান করছেন নিজের অন্তরাত্মাকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর করে তোলার জন্য।
- আত্মশুদ্ধি ও আবর্জনা বর্জন:“ফেলি দাও বাছি / যেথা আছে যত ক্ষুদ্র তৃণকুটাগাছি– / … সকল কলঙ্ক আজি করো গো মার্জনা, / বাহিরে ফেলিয়া দাও যত আবর্জনা।”— জীবনের বহু দিনের আলস্য, অবহেলা ও পার্থিব মোহ অন্তরে যে অনাবশ্যক আবর্জনা ও ক্ষুদ্রতা সৃষ্টি করেছে, কবি তা বিসর্জন দিতে চান। পুণ্যবারি এনে অন্তরের সকল কলঙ্ক ধুয়ে মুছে নির্মল করার এই আর্তি এক গভীর নৈতিক ও আত্মিক উত্তরণের পরিচয় দেয়।
- দেবতার চরণে একাসনে উপবেশন:“মঙ্গলকনকঘটে পুণ্যতীর্থজল / সযত্নে ভরিয়া রাখো, পূজাশতদল / স্বহস্তে তুলিয়া আনো। সেথা দুইজনে / দেবতার সম্মুখেতে বসি একাসনে।”— কবিতার সমাপ্তি ঘটে এক পরম ভক্তিময় সম্মিলনে। প্রেম যখন সমস্ত পার্থিব বাসনা ও ভোগকে অতিক্রম করে ঈশ্বরের চরণে নিবেদিত হয়, তখন তা অমরত্ব লাভ করে। অন্তরের মন্দিরে দেবতার সামনে যুগলে একাসনে বসার এই স্বপ্ন দাম্পত্যপ্রেমকে এক অলৌকিক ও চিরন্তন মহিমায় অভিষিক্ত করেছে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ (অনুলিপির মুদ্রণপ্রমাদ ‘ছিন্নক্ষণ্ড’-এর স্থলে প্রমিত ‘ছিন্নখণ্ড’ রূপসহ), ছন্দবিন্যাস ও ঐতিহাসিক সংকলন-তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (স্মরণ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।