স্মরণ কাব্যগ্রন্থের ‘তুমি মোর জীবনের মাঝে’ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত শোককাব্য ‘স্মরণ’-এর এক অনন্য মৃত্যুঞ্জয়ী ও অধ্যাত্ম-প্রণয়চেতনার কবিতা হলো ‘তুমি মোর জীবনের মাঝে’। কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর প্রয়াণজনিত শোককে কবি কেবল পার্থিব ক্ষতি হিসেবে দেখেননি; বরং প্রিয়তমার তিরোধান কীভাবে মৃত্যুর অন্ধকারকে মধুময় করে তুলেছে, মৃত্যুকে মঙ্গলে পরিণত করেছে এবং জন্ম ও মৃত্যুর মাঝের ব্যবধান ঘুচিয়ে একাকার করে দিয়েছে—এ কবিতায় তারই এক চিরন্তন রূপ প্রতিভাত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামতুমি মোর জীবনের মাঝে (স্মরণ কাব্যের ১৮ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থস্মরণ (অনলাইন প্রতিলিপিতে উল্লিখিত ১৯৬১ সালটি রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের বিশেষ সংস্করণ; মূল কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশ ১৯০৩ সালে)
রচনাকাল/প্রথম প্রকাশ১৩০৯ বঙ্গাব্দ (১৯০২-১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দ)
কবিতার ধরনশোক-স্মৃতিচারণ ও মৃত্যু-উত্তরণের লিরিক কবিতা (Elegiac Lyric of Transfiguration)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর আকস্মিক প্রয়াণে রচিত হয় ‘স্মরণ’ কাব্যের শোকগাথাগুলো। সাধারণ দৃষ্টিতে মৃত্যু ভয়াবহ ও বিচ্ছেদবেদনায় কাতর এক সমাপ্তি। কিন্তু কবির কাছে মনে হয়েছে, প্রিয়তমা তাঁর নিজের মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে কবির মর্ত্যজীবনের সমস্ত ভাবনাকে সূর্যাস্তের রঙে রাঙিয়ে দিয়ে গেছেন। যে মৃত্যু একসময় অজ্ঞাত ও ভয়াবহ ছিল, সেই মৃত্যুর ওপারে এখন প্রিয়তমা অবস্থান করছেন বলে মৃত্যুলোকও পরম আত্মীয় ও মঙ্গলময় হয়ে উঠেছে। পরপারের জানলায় তিনি জ্বালিয়ে রেখেছেন আশার প্রদীপ। এক বাহু দিয়ে জীবনকে এবং অন্য বাহু দিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে তিনি জন্ম ও মৃত্যুর অন্তরাল ঘুচিয়ে দিয়েছেন।

সম্পূর্ণ কবিতা:

তুমি মোর জীবনের মাঝে

    মিশায়েছ মৃত্যুর মাধুরী।

চিরবিদায়ের আভা দিয়া

রাঙায়ে গিয়েছ মোর হিয়া,

এঁকে গেছে সব ভাবনায়

    সূর্যাস্তের বরনচাতুরী।

জীবনের দিক্‌চক্রসীমা

লভিয়াছে অপূর্ব মহিমা,

অশ্রুধৌত হৃদয়-আকাশে

    দেখা যায় দূর স্বর্গপুরী।

তুমি মোর জীবনের মাঝে

    মিশায়েছ মৃত্যুর মাধুরী।

তুমি, ওগো কল্যাণরূপিণী,

    মরণেরে করেছ মঙ্গল।

জীবনের পরপার হতে

প্রতি ক্ষণে মর্ত্যের আলোতে

পাঠাইছ তব চিত্তখানি

    মৌনপ্রেমে সজলকোমল।

মৃত্যুর নিভৃত স্নিগ্ধ ঘরে

বসে আছ বাতায়ন-‘পরে–

জ্বালায়ে রেখেছ দীপখানি

    চিরন্তন আশায় উজ্জ্বল।

তুমি ওগো কল্যাণরূপিণী,

    মরণেরে করেছ মঙ্গল।

তুমি মোর জীবন মরণ

    বাঁধিয়াছ দুটি বাহু দিয়া।

প্রাণ তব করি অনাবৃত

মৃত্যু-মাঝে মিলালে অমৃত,

মরণেরে জীবনের প্রিয়

    নিজ হাতে করিয়াছ প্রিয়া।

খুলিয়া দিয়াছ দ্বারখানি,

যবনিকা লইয়াছ টানি,

জন্মমরণের মাঝখানে

    নিস্তব্ধ রয়েছ দাঁড়াইয়া।

তুমি মোর জীবন মরণ

    বাঁধিয়াছ দুটি বাহু দিয়া।

Amar Rabindranath Logo

 

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Tumi mor jiboner majhe
Mishayechho mrittur madhuri.
Chirobidayer abha diya
Rangaye giyechho mor hiya,
Enke gechhe shob bhabnay
Shurjastero boronchaturi.
Jiboner dik-chokroshima
Lobhiyachhe opurbo mohima,
Oshrudhouto hridoy-akashe
Dekha jay dur sworgopuri.
Tumi mor jiboner majhe
Mishayechho mrittur madhuri.
Tumi, ogo kollanrupini,
Moronere korechho monggol.
Jiboner poropar hote
Proti khone morter alote
Pathaichho tobo chittokhani
Mounopreme shojolokomol.
Mrittur nibhrito snigdho ghore
Bose achho batayon-‘pore–
Jwalaye rekhechho dipkhani
Chironton ashay ujjwol.
Tumi ogo kollanrupini,
Moronere korechho monggol.
Tumi mor jibon moron
Bandhiyachho duti bahu diya.
Pran tobo kori onabrito
Mrittu-majhe milale omrito,
Moronere jiboner priyo
Nijo hate koriyachho priya.
Khuliya diyachho dwarkhani,
Jobonika loyiyachho tani,
Jonmomoroner majhkhane
Nistobdho royechho danraiya.
Tumi mor jibon moron
Bandhiyachho duti bahu diya.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • মৃত্যুর মাধুর্য ও সূর্যাস্তের আভা:
    “তুমি মোর জীবনের মাঝে / মিশায়েছ মৃত্যুর মাধুরী। / চিরবিদায়ের আভা দিয়া / রাঙায়ে গিয়েছ মোর হিয়া, / এঁকে গেছে সব ভাবনায় / সূর্যাস্তের বরনচাতুরী।”
    — প্রয়াণ কোনো শূন্যতা তৈরি করেনি, বরং জীবনের ক্যানভাসে যোগ করেছে এক অলৌকিক গভীরতা। সূর্যাস্তের গোধূলির মতোই বিদায়ের রক্তিমাভা কবির মনের প্রতিটি ভাবনাকে বিষাদমধুর মহিমায় রাঙিয়ে দিয়েছে।
  • মরণকে মঙ্গলময় করে তোলা:
    “তুমি, ওগো কল্যাণরূপিণী, / মরণেরে করেছ মঙ্গল। / … মৃত্যুর নিভৃত স্নিগ্ধ ঘরে / বসে আছ বাতায়ন-‘পরে– / জ্বালায়ে রেখেছ দীপখানি / চিরন্তন আশায় উজ্জ্বল।”
    — মৃত্যুর ওপারে যদি প্রিয়জন না থাকে, তবে তা ভীতিপ্রদ অন্ধকার। কিন্তু সেখানে স্বয়ং কল্যাণী পত্নী উপস্থিত থাকায় মৃত্যুলোক আর ভয়ের জায়গা নয়; তা এক স্নিগ্ধ গৃহ, যার জানালায় তিনি পরম আশার প্রদীপ জ্বেলে পথ চেয়ে আছেন।
  • জীবন ও মৃত্যুর অখণ্ড সেতু:
    “তুমি মোর জীবন মরণ / বাঁধিয়াছ দুটি বাহু দিয়া। / … জন্মমরণের মাঝখানে / নিস্তব্ধ রয়েছ দাঁড়াইয়া।”
    — জীবিতাবস্থায় তিনি ছিলেন মর্ত্যজীবনের সঙ্গিনী, আর মৃত্যুর পর তিনি পরপারের অধিবাসী। দুই জগতের মাঝখানের পর্দাটি সরিয়ে দিয়ে তিনি এক হাতে জীবনকে এবং অন্য হাতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে অখণ্ড পরম মিলনের সেতু রচনা করেছেন।

 

তুমি মোর জীবনের মাঝে tumi mor jiboner majhe [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, স্তবকবিন্যাস ও ঐতিহাসিক সংকলন-তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (স্মরণ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন