বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ, দার্শনিক ও পৌরাণিক রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘হে জনসমুদ্র, আমি ভাবিতেছি মনে’। হিন্দু পুরাণের সমুদ্রমন্থনের বিখ্যাত কাহিনীর আদলে কবি এই কবিতায় মানবসমাজের যুগ যুগ ধরে চলা সুখ-দুঃখ, পাপ-পুণ্য ও দ্বন্দ্বের এক অসামান্য রূপক তৈরি করেছেন।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামহে জনসমুদ্র, আমি ভাবিতেছি মনে
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থউৎসর্গ
প্রকাশের বছর১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপৌরাণিক রূপকধর্মী ও দার্শনিক কবিতা (Mythological Allegorical and Philosophical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থে কবি মানবজীবন ও প্রকৃতির নানা রূপের মাঝে এক আধ্যাত্মিক সত্যের সন্ধান করেছেন। হিন্দু পুরাণে আছে, দেব ও অসুররা মিলে অমৃত ও রত্ন লাভের আশায় বাসুকি নাগকে দড়ি করে একসময় সমুদ্রমন্থন করেছিল, যেখান থেকে উঠে এসেছিলেন দেবী লক্ষ্মী। ‘হে জনসমুদ্র, আমি ভাবিতেছি মনে’ কবিতায় কবি মানবসমাজকে সেই আদিম সমুদ্রের সাথে তুলনা করেছেন। যুগ যুগ ধরে মানুষের সমাজে পাপ-পুণ্য, সুখ-দুঃখ এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণার যে অবিরাম লড়াই চলছে, তা যেন সেই সমুদ্রমন্থনেরই নামান্তর। কবির বিশ্বাস, এই দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক মন্থনের শেষ হবে সেদিনই, যেদিন মানবসমাজের অন্তর থেকে সমস্ত দ্বন্দ্ব জয় করে পরম সত্য বা ‘অন্তরলক্ষ্মী’ অমৃতের পাত্র হাতে উঠে আসবেন এবং পরম স্রষ্টার সাথে মিলিত হবেন।

হে জনসমুদ্র, আমি ভাবিতেছি মনে – সম্পূর্ণ কবিতা

হে জন-সমুদ্র, আমি ভাবি-তেছি মনে

কে তোমারে আন্দোলিছে বিরাট মন্থনে

অনন্ত বরষ ধরি। দেবদৈত্যদলে

কী রত্ন সন্ধান লাগি তোমার অতলে

অশান্ত আবর্ত নিত্য রেখেছে জাগায়ে

পাপে-পুণ্যে সুখে-দুঃখে ক্ষুধায়-তৃষ্ণায়

ফেনিল কল্লোলভঙ্গে। ওগো, দাও দাও

কী আছে তোমার গর্ভে– এ ক্ষোভ থামাও।

তোমার অন্তরলক্ষ্মী যে শুভ প্রভাতে

উঠিবেন অমৃতের পাত্র বহি হাতে

বিস্মিত ভুবন-মাঝে, লয়ে বরমালা

ত্রিলোকনাথের কণ্ঠে পরাবেন বালা,

সেদিন হইবে ক্ষান্ত এ মহামন্থন,

থেমে যাবে সমুদ্রের রুদ্র এ ক্রন্দন।

 

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version

He jonoshomudro, ami bhabitechhi mone
Ke tomare andolichhe birat monthone
Ononto borosh dhori. Debdoityodole
Ki rotno shondhan lagi tomar otole
Oshanto aborto nityo rekhechhe jagaye
Pape-punye shukhe-dukkhe khudhay-trishnay
Phenilo kollolbhongge. Ogo, dao dao
Ki achhe tomar gorbhe– e khobh thamao.
Tomar ontorlokkhi je shubho probhate
Uthiben omriter patro bohi hate
Bishmito bhubon-majhe, loye boromala
Trilokonather konthe poraben bala,
Shedin hoibe khanto e mohamonthon,
Theme jabe shomudrer rudro e krondon.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • মানবসমাজের অনন্ত সমুদ্রমন্থন:
“হে জনসমুদ্র, আমি ভাবিতেছি মনে / কে তোমারে আন্দোলিছে বিরাট মন্থনে / অনন্ত বরষ ধরি… অশান্ত আবর্ত নিত্য রেখেছে জাগায়ে / পাপে-পুণ্যে সুখে-দুঃখে ক্ষুধায়-তৃষ্ণায়”
— মানুষের এই বিশাল সংসার বা সমাজকে কবি ‘জনসমুদ্র’ বলেছেন। পুরাণে দেব-দানব মিলে যেমন সমুদ্র মন্থন করেছিল, তেমনি মানবসমাজেও পাপ ও পুণ্য, সুখ ও দুঃখ, ভালো ও মন্দের এক অন্তহীন মন্থন বা লড়াই চলছে। মানবমনের এই অশান্ত আবর্তই যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন (ফেনিল কল্লোলভঙ্গ)।
  • রত্নের প্রত্যাশা ও ক্ষোভ নিবারণ:
“ওগো, দাও দাও / কী আছে তোমার গর্ভে– এ ক্ষোভ থামাও।”
— সমুদ্রমন্থনে যেমন নানা রত্ন উঠে এসেছিল, কবি তেমনি এই জনসমুদ্রের কাছে প্রার্থনা করছেন যে, তার গর্ভে লুকিয়ে থাকা সেই পরম রত্নটি বা চরম সত্যটি এবার প্রকাশ করে সে যেন নিজের এই অনন্ত ক্ষোভ ও অশান্তিকে থামায়।
  • অন্তরলক্ষ্মীর উত্থান ও শান্তির প্রতিষ্ঠা:
“তোমার অন্তরলক্ষ্মী যে শুভ প্রভাতে / উঠিবেন অমৃতের পাত্র বহি হাতে… সেদিন হইবে ক্ষান্ত এ মহামন্থন, / থেমে যাবে সমুদ্রের রুদ্র এ ক্রন্দন।”
— সমুদ্র থেকে যেমন দেবী লক্ষ্মী ও অমৃত উঠে এসেছিল, মানবসমাজের এই দীর্ঘ লড়াই ও মন্থন শেষেও একদিন মানবাত্মারূপী ‘অন্তরলক্ষ্মী’ অমৃত হাতে আবির্ভূত হবেন। সেই শুভ প্রভাতে তিনি যখন পরমেশ্বরকে (ত্রিলোকনাথ) বরণ করে নেবেন, কেবল সেদিনই পৃথিবীর সমস্ত দ্বন্দ্ব, সংঘাত এবং ক্রন্দন চিরতরে শান্ত হবে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে যাচাই করে আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের অনাকাঙ্ক্ষিত হাইফেনগুলো যেমন ‘জন-সমুদ্র’, ‘ভাবি-তেছি’, ‘কবি-তার’ ইত্যাদি পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন