বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম দার্শনিক, সৃষ্টিতত্ত্বমূলক ও প্রেমের লিরিক কবিতা হলো ‘আকাশ-সিন্ধু-মাঝে এক ঠাঁই’। এই কবিতায় বিশ্বসংসারের আবর্তন, ঘূর্ণি ও পরিবর্তনের মাঝেও প্রেমের ধ্রুব ও স্থির কেন্দ্রবিন্দু এবং ভুবনলক্ষ্মীর রূপরাশির অপূর্ব রূপক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | আকাশ-সিন্ধু-মাঝে এক ঠাঁই |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | উৎসর্গ |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক, সৃষ্টিতত্ত্ব ও প্রেমভিত্তিক লিরিক কবিতা (Philosophical and Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থটি তাঁর কাব্যজীবনের একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণের সৃষ্টি। এসময়ের কবিতায় ব্যক্তিমানসের আত্মবিশ্লেষণ, বিশ্বপ্রকৃতির পরিবর্তনশীলতা এবং তার মাঝে ধ্রুব সত্য বা প্রেমের অন্বেষণ লক্ষ্য করা যায়। ‘আকাশ-সিন্ধু-মাঝে এক ঠাঁই’ কবিতায় সমগ্র জগতের ঘূর্ণিপাক ও অবিরাম পরিবর্তনের বিপরীতে প্রেমের অচল ও স্থির রূপকে তুলে ধরা হয়েছে।
আকাশ-সিন্ধু-মাঝে এক ঠাঁই – সম্পূর্ণ কবিতা
আকাশ-সিন্ধু-মাঝে এক ঠাঁই
কিসের বাতাস লেগেছে–
জগৎ-ঘূর্ণি জেগেছে।
ঝলকি উঠেছে রবি-শশাঙ্ক,
ঝলকি ছুটেছে তারা,
অযুত চক্র ঘুরিয়া উঠেছে
অবিরাম মাতোয়ারা।
স্থির আছে শুধু একটি বিন্দু
ঘূর্ণির মাঝখানে–
সেইখান হতে স্বর্ণকমল
উঠেছে শূন্যপানে।
সুন্দরী, ওগো সুন্দরী,
শতদলদলে ভুবনলক্ষ্ণী
দাঁড়ায়ে রয়েছ মরি মরি।
জগতের পাকে সকলি ঘুরিছে,
অচল তোমার রূপরাশি।
নানা দিক হতে নানা দিন দেখি–
পাই দেখিবারে ওই হাসি।
জনমে মরণে আলোকে আঁধারে
চলেছি হরণে পূরণে,
ঘুরিয়া চলেছি ঘুরনে।
কাছে যাই যার দেখিতে দেখিতে
চলে যায় সেই দূরে,
হাতে পাই যারে পলক ফেলিতে
তারে ছুঁয়ে যাই ঘুরে।
কোথাও থাকিতে না পারি ক্ষণেক,
রাখিতে পারি নে কিছু–
মত্ত হৃদয় ছুটে চলে যায়
ফেনপুঞ্জের পিছু।
হে প্রেম, হে ধ্রুবসুন্দর,
স্থিরতার নীড় তুমি রচিয়াছ
ঘূর্ণার পাকে খরতর।
দ্বীপগুলি তব গীতমুখরিত,
ঝরে নির্ঝর কলভাষে,
অসীমের চির-চরম শান্তি
নিমেষের মাঝে মনে আসে।
Romanized Version
Akash-sindhu-majhe ek thnai
Kisher batash legechhe–
Jogot-ghurni jegechhe.
Zholki uthechhe robi-shoshangko,
Zholki chhutechhe tara,
Ojyuto chokro ghuriya uthechhe
Obiram matowara.
Sthiro achhe shudhu ekti bindu
Ghurnir majhane–
Seikhane hote shornokomol
Uthechhe shunnyopane.
Shundori, ogo shundori,
Shotodoldole vub-nolokkhi
Danraye royechho mori mori.
Jogoter pake shokoli ghuriche,
Ochol tomar ruprashi.
Nana dik hote nana din dekhi–
Pai dekhibare oi hasi.
Jonome morone aloke andhare
Cholechi horone purone,
Ghuriya cholechi ghurnone.
Kache jai jar dekhite dekhite
Chole jay sei dure,
Hate pai jare polok felite
Tare chhuye jai ghure.
Kothay thakite na pari khonek,
Rakhite parine kichhu–
Motto hridoy chhute chole jay
Phenpunjer pichhu.
He prem, he dhrobsundor,
Sthirotar nir tumi rochiyachho
Ghurnar pake khortor.
Dipguli tobo git-mukhorito,
Zhore nirzhor kolbhase,
Oshimer chiro-chorom shanti
Nimesher majhe mone ashe.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- জগতের ঘূর্ণি ও স্থির বিন্দু:
“স্থির আছে শুধু একটি বিন্দু / ঘূর্ণির মাঝখানে– / সেইখান হতে স্বর্ণকমল / উঠেছে শূন্যপানে।”— বিশ্বসংসারের এই অন্তহীন ঘূর্ণিপাক ও পরিবর্তনের মাঝেও কেন্দ্রে রয়েছে এক অবিচল স্থির বিন্দু, যেখান থেকে সৌন্দর্যের স্বর্ণকমল বিকশিত হয়েছে।
- পরিবর্তনশীলতার মাঝে ধ্রুব প্রেম:
“হে প্রেম, হে ধ্রুবসুন্দর, / স্থিরতার নীড় তুমি রচিয়াছ / ঘূর্ণার পাকে খরতর।”— পার্থিব জীবনের এই চঞ্চল আবর্তন ও জন্ম-মৃত্যুর লীলার মাঝে একমাত্র ‘প্রেম’ বা ‘ধ্রুবসুন্দর’ই সমস্ত খরতর ঘূর্ণির মধ্যে স্থিরতার নীড় রচনা করে দেয়।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।